শুভংকর পোদ্দার, হরিরামপুর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি: বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ’র) নামে নদীপথে অতিরিক্ত টোল আদায়ের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ তুলেছেন বাল্কহেড মালিক ও শ্রমিকরা। তাদের অভিযোগ, পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, শীতলক্ষ্যাসহ কয়েকটি নদীর একাধিক পয়েন্টে বিআইডব্লিউটিএ’র নামে অতিরিক্ত টোল আদায়ের পাশাপাশি বিভিন্ন পয়েন্টে অবৈধভাবে বাল্কহেড প্রতি ২০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত অবৈধভাবে চাঁদা নেওয়া হয়। চাঁদা দিতে না চাইলে বাল্কহেড শ্রমিকদের মারধর, ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ তাদের। এছাড়া, বিআইডব্লিউটিএর টোলের নামে টাকা নিলেও অনেক সময় স্লিপ দেওয়া হয়, আবার অনেক সময় কোনো স্লিপ দেওয়া হয় না। এ অবস্থায় নদীপথের টোল আদায় বন্ধ ও অবৈধ চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন তারা।
অতিরিক্ত টোল ও চাঁদাবাজি বন্ধে গত ১৫ জুলাই মুন্সীগঞ্জ লঞ্চঘাট এলাকায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে বাংলাদেশ বাল্কহেড মালিক সমিতির বিভিন্ন শাখা। এতে সংগঠনটির মুন্সীগঞ্জ জেলা, ডেমরা, রূপগঞ্জ, ধর্মগঞ্জ-নবীনগর, চরহোগলা-চরকিশোরগঞ্জ, গজারিয়া, মেঘনা এবং হরিরামপুর-লেছড়াগঞ্জ শাখার বাল্কহেড মালিক-শ্রমিকরা অংশ নেন।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, প্রতিদিন এভাবে অতিরিক্ত টোল ও চাঁদার কারণে হাজার হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। এভাবে অর্থ আদায় চলতে থাকলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। দ্রুত এ পরিস্থিতির অবসান না হলে ঢাকায় বিআইডব্লিউটিএ কার্যালয় ঘেরাও এবং নদীপথ অচল করে দেওয়ার মতো কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দেন তারা।
বাংলাদেশ বাল্কহেড মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ও মুন্সীগঞ্জ বাল্কহেড মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জামান খান বলেন, বিআইডব্লিউটিএ’র নামে অহরহ চাঁদবাজি চলছে। যমুনার থেকে লোড করে আসার সময় একটা বাল্কহেডের তিন জায়গায় টোল দিতে হয়। আগে যেখানে ২০০ টাকা নিতো, এখন সেখানে ২ হাজার টাকা নেয়। মুন্সীগঞ্জে একটা বাল্কহেড পৌছাঁতে ৮-১০ হাজার টাকা নিয়ে যাচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএর নামে চাঁদা এবং কিছু অসাধু লোক এই চাঁদাবাজি করছে। শরিয়তপুর, চাঁদপুর মোহনা, পদ্মা সেতুর পরে চাঁদাবাজি চলছে। এছাড়া, আমাদের মুন্সীগঞ্জে লৌহজং চ্যানেলে বিআইডব্লিউটিএর নামে চাঁদাবাজি চলছে। আগে ১০০ টাকা করে নিতো, এখন নেয় ১০০০ টাকা। হরিরামপুরে লেছড়াগঞ্জ বিআইডব্লিউটিএ’র নামে চাঁদাবাজি করছে। আমরা এসব বিষয়ে মানববন্ধন করেছি। সরকার, বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান ও প্রশাসনের কাছে আমাদের চাওয়া বিআইডব্লিউটিএর নামে টাকা তোলাসহ চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। আমরা বাল্কহেড মালিকরা খুব অশান্তিতে আছি। আমাদের ব্যবসা নাই, খুব খারাপ পরিস্থিতিতে আছি। নাহলে আমরা আগামী সপ্তাহের মধ্যে আবার আন্দোলনে যাবো।
সরজমিনে বুধবার (২২ জুলাই) পদ্মায় গিয়ে কথা হয় বাল্কহেড চালক এবং শ্রমিকদের সাথে তারা জানান, বিআইডব্লিউটি’এর নামে টাকা তোলা ছাড়াও হরিরামপুর উপজেলার সেলিমপুর, কাঞ্চনপুর, পাটুরিয়া ঘাট ও দোহার, নারায়ণগঞ্জ সম্ভুপুরা, মাওয়ায় ব্রিজ পার হওয়ার আগে-পরেসহ আরও বেশ কয়েকটি জায়গায় ট্রলারে করে একদল ব্যক্তি জোরপূর্বক ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করছে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা ভয়ভীতি, হুমকি ধামকি এবং মারধরের চেষ্টা করে বলেও জানান তারা।
ফারুক নামের এক বাল্কহেড শ্রমিক বলেন, আমরা দাউদকান্দি থেকে হরিরামপুর আন্ধারমানিক বালু নিতে আসি। যাওয়ার পথে মাওয়া ব্রিজের ওখানে ২-৩ জায়গায় ৪০০-৫০০ টাকা করে এবং মাওয়া ব্রিজ পার হয়ে গেলে নড়িয়ার ওদিকে ২০০-৩০০ টাকা করে চাঁদা নেয়। তারা মাস্ক পড়ে আসে। জোরপূর্বক ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা নেয়। না দিলে আমাদের হুমকি ধামকি দেয়। এতে আমাদের অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে, আমরা কষ্টে আছি। সরকারের কাছে আমাদের আবেদন আমরা যাতে সুষ্ঠভাবে শান্তিমতো নৌপথে চলাচল করতে পারি।
রাসুল আমার নেতা বাল্কহেডের শ্রমিক মো. মিরাজ বলেন, আমরা দাউদকান্দি থেকে যমুনায় যাই বালু আনার জন্য। পথে বিভিন্ন জায়গায় চাঁদা দিতে হয়। হরিরামপুর, নারিশ্যাসহ বিভিন্ন জায়গায় ২০০, ৫০০, ১০০০ করে চাঁদা দিতে হয়। ট্রলার নিয়ে মুখে মাস্ক পড়ে একদল লোক এসে চাঁদা চায়। চাঁদা না দিলে আমাদের মারধোর করে। এছাড়া, বিআইডব্লিউটিএর কথা বলে টাকা নেয়। অনেক সময় স্লিপ দেয়। আবার অনেক সময় স্লিপ দেয় না। আমরা গরিব মানুষ, এতে আমাদের খরচ অনেক বেড়ে যায়। আমরা যেন নদীতে শান্তিতে থাকতে পারি তার জন্য এগুলো বন্ধ করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাই।
চাঁদাবাজির বিষয়ে কোতয়ালী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, আমি এখানে কয়েকদিন হলো যোগদান করেছি। টোল আদায় বা চাঁদাবাজির কোনো বিষয়ই আমার জানা নেই। তবে, এরকম কোনো বিষয় যদি থাকে তাহলে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।