শিরোনাম
◈ ‌বিতর্ক আর্জেন্টিনার পিছু ছাড়ছে না, ইংল্যান্ডকে হারানোর পর ফকল্যান্ডস ব্যানার দেখিয়ে শাস্তির শঙ্কায় মেসিরা ◈ স্থানীয় নির্বাচনে কড়াকড়ি: ঋণখেলাপির জামিনদার হলেও বাতিল হবে প্রার্থিতা, নতুন বিধান আনছে ইসি ◈ যেকোনো সময় কাঁপতে পারে ঢাকা, ভয়াবহ ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা বিশেষজ্ঞদের ◈ জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর সেদিন কী ঘটেছিল? ◈ প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে পাঁচ ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতের বৈঠক ◈ '১২ কোটি শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিয়েছি' বলা ভাইরাল সুহিকে আগেই টিসি দেওয়া হয়েছিল, থানায় মাইলস্টোনের জিডি ◈ শেখ হাসিনাকে ফেরাতে ভারতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন: শামা ওবায়েদ ◈ বাংলাদেশে ‘কনে খোঁজার’ অবৈধ ঘটকালি নিয়ে চীনের সতর্কবার্তা ◈ অর্থ পাচার বন্ধ হলে অনেক সমস্যা সমাধান সম্ভব ছিল: প্রধানমন্ত্রী ◈ জিয়াউর রহমানকে সরাসরি গুলি করেন মোজাফফর, আত্মগোপনে ছিলেন ভারতে: ডিবি

প্রকাশিত : ১৬ জুলাই, ২০২৬, ০৭:৫২ বিকাল
আপডেট : ১৬ জুলাই, ২০২৬, ০৮:৪১ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

যেকোনো সময় কাঁপতে পারে ঢাকা, ভয়াবহ ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা বিশেষজ্ঞদের

ভূতাত্ত্বিকদের মতে, ৩০০ থেকে ৫০০ বছরের ভূমিকম্পের ‘রিটার্ন পিরিয়ড’ বা পুনরাবৃত্তির চক্র প্রায় পূর্ণ হওয়ায় ঢাকায় যেকোনো সময় ৭ থেকে ৭.৫ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার আশঙ্কা রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে উঠে এসেছে, এমন দুর্যোগ ঘটলে রাজধানী ভয়াবহ প্রাণহানি ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের মুখে পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল অবকাঠামো এবং পর্যাপ্ত দুর্যোগ প্রস্তুতির অভাব এ ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। সম্প্রতি ভেনিজুয়েলায় ৭.২ মাত্রার ভূমিকম্পের পর বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মতো ঢাকাতেও সম্ভাব্য ভূমিকম্প নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

জনমানুষের উদ্বেগটি বিশ্বাসযোগ্যতায় রূপ পাচ্ছে, গত ২১ নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এতে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় বড় কম্পন অনুভূত হয়। হেলে পড়ে অনেক ভবন। ওই ভূমিকম্পে সারা দেশে ১০ জনের প্রাণহানি ঘটে। সেসময় মৃত্যুর পাশাপাশি শত শত মানুষ আহত হন। এরপর নরসিংদীর চেয়ে কম মাত্রার একাধিক ভূমিকম্প হয়েছে। আবহাওয়াবিদ ও ভূতাত্ত্বিকদের মতে, ছোট ছোট এ কম্পন আসলে মাটির নিচে জমে থাকা বিশাল শক্তির বহিঃপ্রকাশ। যেকোনো মুহূর্তে একটি বড় ধরনের ভূমিকম্প ঢাকায় আঘাত হানতে পারে, ছোট কম্পনগুলো তারই আগাম বার্তা দিচ্ছে।

ভূতাত্ত্বিকরা বলছেন, বাংলাদেশ মূলত তিনটি সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের (ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মা প্লেট) সংযোগস্থলে অবস্থিত। ঢাকার অদূরেই রয়েছে মধুপুর ফল্ট এবং উত্তর-পূর্বে রয়েছে ডাউকি ফল্ট সিস্টেম (সিলেট সংলগ্ন)। শত বছরেরও বেশি সময় এ ফল্ট লাইনগুলোয় বড় কোনো শক্তি নির্গত হয়নি, যার অর্থ-সেখানে তীব্র চাপের সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী যুগান্তরকে বলেন, ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকা জলাশয় ভরাট করে গড়ে উঠেছে। বালু ও নরম পলিমাটি দিয়ে ভরাট করা এ অঞ্চলগুলো ভূমিকম্পের তীব্র ঝাঁকুনিতে নিজের শক্তি হারিয়ে তরল পদার্থের মতো আচরণ করবে। ফলে বহুতল ভবনগুলো মাটির নিচে দেবে যেতে পারে বা হেলে পড়তে পারে।

তিনি জানান, ভূমিকম্প কখন হবে, এটা বলা যায় না। এজন্য ভূমিকম্প আঘাত হানলে যাতে ক্ষয়ক্ষতি কম হয়, সে বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে। এতদিন এটার তেমন কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। কেননা, এটার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার হয়। যেটা আগের সরকারের মাঝে তেমনটা ছিল না। এ সরকারের কাছে প্রত্যাশা, তারা যাতে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়। কেননা ভূমির ৯০ শতাংশ ক্ষতি হয় ভবন ভেঙে, চাপে পড়ে। এজন্য ভবনগুলো ঠিক করতে হবে। ঢাকাসহ সারা দেশে ৪ থেকে ১০ তলা ভবন রয়েছে প্রায় ২০ লাখ। এ বিষয়টিকে উপেক্ষা করে চলা কোনোভাবেই উচিত হচ্ছে না। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান প্রকৌশলী মো. আমিনুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি হ্রাসে রুটিন কোনো কাজ করা হচ্ছে না। তবে ভবনগুলো যাতে মানসম্মতভাবে গড়ে ওঠে, সেটা নিশ্চিত করার চেষ্টা রয়েছে।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) মাস্টারপ্ল্যান ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) তথ্যমতে, ঢাকা মহানগরীতে (সিটি করপোরেশন এবং আশপাশের রাজউক এলাকায়) প্রায় ২১ লাখ স্থাপনা রয়েছে। ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানলে দুর্বল কাঠামোর প্রায় ৭২ হাজার ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়বে, স্বল্প সময়ে ৩ থেকে ৪ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটবে এবং পর্যায়ক্রমে তা বাড়বে। রাজধানীর ভবনগুলোর মধ্যে ৪ তলার ওপরে থাকা স্থাপনাগুলোর প্রায় ৪০ শতাংশই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া ঘিঞ্জি এলাকার টিনশেড ও কাঁচা ঘরবাড়ি ধসের ফলে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। বড় মাত্রার ভূমিকম্পে সাড়ে আট লাখ ভবন ভেঙে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

ঢাকার দুর্বলতা

বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা ঢাকার অবকাঠামো নির্মাণ, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এবং অপসারণ প্রস্তুতির ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। কী করতে হবে, তা জানা-বোঝার পরও কার্যকর উদ্যোগ নেই। প্রধান কারণগুলো হলো: ১. জলাশয় ভরাট ও দুর্বল মাটি : বুয়েটের এলপিআই (লিকুইফ্যাকশন পটেনশিয়াল ইনডেক্স) মানচিত্র অনুযায়ী, ঢাকার নতুন বর্ধিত এলাকাগুলোর মাটি সবচেয়ে দুর্বল, ২. বিল্ডিং কোড না মেনে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, ৩. অলিগলি ও উদ্ধারকাজের সীমাবদ্ধতা-পুরান ঢাকা ও নতুন ঢাকার বহু এলাকায় রাস্তাগুলো মাত্র ৩ থেকে ৫ ফুট চওড়া, যা উদ্ধারকাজে জটিলতা বাড়াবে; ৪. ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত জনসংখ্যা, এটি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে হবে; ৫. ভবনগুলোর ফিটনেস যাচাইয়ে তাদের রুটিন কার্যক্রম নেই, কোনো ভবন হেলে পড়লে বা ফেটে গেলে তখন তারা ছুটে যায়; ৬. চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর সংস্কার বা অপসারণের কোনো উদ্যোগ নেই; ৭. যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা গ্যাসলাইন বড় এলাকাজুড়ে অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে; ৮. পানি ও স্যুয়ারেজ লাইন বিস্ফোরণ ঘটে সড়কগুলো জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হবে এবং ৯. ঢাকার বিদ্যমান ভবনগুলো ভেঙে পড়লে সেসব উদ্ধারের সক্ষমতা ও সরঞ্জামও নেই।

ঢাকার করণীয়

ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা অসম্ভব; কিন্তু সঠিক প্রস্তুতি ও প্রকৌশলগত সতর্কতার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রাণহানি ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। জাপান ও চিলির মতো দেশগুলো এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এজন্য করণীয় বিষয় হলো: ১. নতুন ভবন নির্মাণে কঠোরতা ও বিএনবিসি বাস্তবায়ন করা এবং যে কোনো ভবন নির্মাণের আগে মাটির লিকুইফ্যাকশন পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে; ২. ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের রেট্রোফিটিং করা, পুরানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করে ‘রেট্রোফিটিং’ বা বিশেষ প্রকৌশল পদ্ধতিতে কলাম ও বিমের শক্তি বাড়ানো; ৩. ব্লু-গ্রিন নেটওয়ার্ক ও উন্মুক্ত স্থান রক্ষা করা; ৪. কমিউনিটি ভলান্টিয়ার ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, কেননা ভূমিকম্পের প্রথম গোল্ডেন আওয়ার বা প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; ৫. ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ ও স্যাটেলাইট সিটি; ঢাকার ওপর থেকে জনসংখ্যার চাপ কমাতে হবে; ৬. ভূমিকম্প ঝুঁকিগুলো বিষদভাবে বিশ্লেষণ করা; ৭. করণীয় নির্ধারণ করে তা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে এর বাস্তবায়ন শুরু করা; ৮. পুরান ঢাকার সড়কগুলো প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়া এবং ৯. পর্যাপ্ত খোলা জায়গা ও আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা।

সূত্র: যুগান্তর 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়