মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ফাঁসির রায় মাথায় নিয়ে ভারতে নির্বাসনে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ঝুঁকির বিষয়টি জেনেও তিনি দেশে ফিরতে বদ্ধপরিকর।
সম্প্রতি জাপানের বার্তা সংস্থা কিয়োডো নিউজকে দেওয়া এক লিখিত সাক্ষাৎকারে ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা বলেন, “আমি বাংলাদেশে ফিরে আসব। আমি আদালতে হাজির হব।”
এর আগে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, আগামী ডিসেম্বর নাগাদ তিনি দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করেছেন।
আর শুধু তিনি একা নন, নির্বাসিত জ্যেষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতারাও তার সঙ্গে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করবেন।
এবার কিয়োডো নিউজকে তিনি বলেছেন, “তারা আমাকে কারাগারে পাঠাতে পারে। এমনকি আমাকে ফাঁসিতেও ঝোলানোর চেষ্টা করতে পারে। আমি সেই ঝুঁকির কথা জানি।”
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ক্ষমতা হারিয়ে দেশ ছাড়ার পর গত প্রায় দুই বছর ধরে ভারতেই আছেন শেখ হাসিনা।
তার অনুপস্থিতিতে বিচার শেষে ২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ছাত্র আন্দোলন দমাতে প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
তবে নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। কিয়োডো নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মৃত্যুদণ্ডের ওই রায়কে তিনি ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলেছেন।
শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ভারত সরকারের কাছে প্রত্যর্পণের আবেদন করেছে বাংলাদেশ। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র সম্প্রতি বলেছেন, নয়াদিল্লি ওই আবেদন পেয়েছে এবং আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোকে বিষয়টি পর্যালোচনা করছে।
চলতি মাসের শুরুতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রসঙ্গে ১৪ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকার তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করবে।
২০২৪ সালের জুনে হাই কোর্ট সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরসূরিদের জন্য কোটা পুনর্বহালের রায় দিলে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন শুরু হয়। পরে তা সরকারবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনের রূপ নেয়।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকে অগাস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ওই আন্দোলন ঘিরে ব্যাপক সহিংসতা হয়। জাতিসংঘের হিসাবে, ওই অস্থির সময়ে ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হন বলে ধারণা করা যায়, যাদের বেশির ভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারান।
তবে শেখ হাসিনা হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, আন্দোলনটি ‘রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রভাবিত’ ছিল।
কিয়োডো নিউজকে তিনি বলেন, “স্বাধীন বিদেশি ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা যদি প্রত্যেক ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ এবং কোন অস্ত্র বা গুলি থেকে তা হয়েছে, তা পরীক্ষা করেন, তাহলে এখনো সত্য উদঘাটন করা সম্ভব।”
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, “একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, দক্ষিণ এশিয়া, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল, উন্নয়ন সহযোগী এবং জাপানের মত যেসব দেশ আমাদের উন্নয়নযাত্রায় আস্থা, সম্পদ ও বন্ধুত্বের বিনিয়োগ করেছে, তাদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।”
তিনি বলেন, “দেশের প্রয়োজন ক্ষত নিরাময়। তবে পুনর্মিলনের অর্থ দায়মুক্তি হতে পারে না। অপরাধের জন্য দায়ীদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।”
বাংলাদেশে এখন শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ, ফলে গত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি দলটি।
সে প্রসঙ্গ ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “আগামী এক দশক পুনরুদ্ধার ও নবায়নের দশক হতে পারে, তবে তা তখনই সম্ভব, যখন গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং জনগণকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করার সুযোগ দেওয়া হবে।”
সূত্র : বিডি নিউস ২৪, কিয়োডো নিউজ