মনিরুল ইসলাম : দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন ও অকার্যকর সংসদের অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও জনগণকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকারি দল। এ প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের ইতিবাচক অংশগ্রহণও নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
সংসদকে আইন প্রণয়ন, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, বাজেট পর্যালোচনা এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলোতে গঠনমূলক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার লক্ষ্যে নতুন ধরনের সংসদীয় সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্য তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে।
ত্রয়োদশ সংসদের শুরুতেই স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সহযোগিতামূলক চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি সংসদে বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানান।
ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, বর্তমান সংসদ ১৮ কোটি মানুষের প্রত্যাশার প্রতিনিধিত্ব করছে। তাই সংসদ সদস্যদের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা, গঠনমূলক সমালোচনা এবং যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। তিনি গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বিত ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম জানান, সংসদ কার্যকর করতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক বিদ্যমান। ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ও জ্বালানি সরবরাহসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সংসদে ঐক্যবদ্ধ আলোচনা হয়েছে। এমনকি সংসদ সদস্যদের সরকারি গাড়ি ও প্লট না নেওয়ার মতো সিদ্ধান্তেও ঐকমত্য হয়েছে, যা দায়িত্বশীলতার পরিচায়ক।
সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় স্বার্থে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার দরজা খোলা রাখার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও দেশের কল্যাণে ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব।
অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. মো. শফিকুর রহমান সংসদে ‘গঠনমূলক বিরোধী দলের’ ভূমিকা পালনের অঙ্গীকার করেছেন। তাঁর ভাষায়, সরকারকে অন্ধ সমর্থন নয়, আবার অযৌক্তিক বিরোধিতাও নয়—বরং জনকল্যাণ ও জবাবদিহিতার প্রশ্নে দায়িত্বশীল অবস্থানই হবে বিরোধী দলের নীতি।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকেও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ৫০টি কমিটির মধ্যে ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত এবং ১১টি সংসদীয় বিষয়-সম্পর্কিত। এসব কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। বিশেষভাবে সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটিতে বিরোধীদলীয় সদস্যকে সভাপতি করা উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংসদীয় কার্যক্রমকে তথ্যনির্ভর করতে বাজেট অধিবেশনের আগে ‘বাজেট হেল্পডেস্ক’ চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সংসদ সদস্যরা গবেষণাভিত্তিক তথ্য পেয়ে বাজেট আলোচনায় আরও কার্যকরভাবে অংশ নিতে পারছেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত এ সংসদের ইতোমধ্যে তিনটি অধিবেশন সম্পন্ন হয়েছে। প্রথম অধিবেশনে ৯৪টি বিল পাস, দ্বিতীয় অধিবেশনে বাজেটের ওপর দীর্ঘ আলোচনা এবং তৃতীয় অধিবেশনে মানবাধিকার, গুম প্রতিরোধ ও ব্যাংক সংশোধনসহ গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস হয়েছে।
সব মিলিয়ে আইন প্রণয়ন, প্রশ্নোত্তর, বাজেট আলোচনা ও কমিটি কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ ধীরে ধীরে একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। তথ্য সূত্র : বাসস