জাগো নিউস ২৪ : বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী। এই তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারলে তারাই দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু শুধু বই পড়া, পরীক্ষা দেওয়া আর সনদ অর্জন করলেই একজন শিক্ষার্থী কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত হয় না। প্রয়োজন বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও আত্মনির্ভর হওয়ার সক্ষমতা।
তাই কারিগরি শিক্ষাকে নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। কারিগরি স্কুল ও কলেজ, পলিটেকনিকসহ অন্যান্য কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শুধু ক্লাস ও পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পড়াশোনার পাশাপাশি প্রোডাকশনের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।
শিখবে এবং শিখতে শিখতেই তৈরি করবে
কারিগরি শিক্ষার মূল শক্তিই হলো হাতে-কলমে শিক্ষা। একজন শিক্ষার্থী যে বিষয়টি শিখছে, সেটি যদি বাস্তবে প্রয়োগ ও তৈরি করার সুযোগ পায়, তাহলে তার দক্ষতা অনেক বেশি কার্যকর হবে।
পোশাক প্রস্তুতকরণ বিভাগের শিক্ষার্থীরা স্কুল ইউনিফর্ম, অ্যাপ্রন, ল্যাব কোট বা ব্যাগ তৈরি করতে পারে। তড়িৎ বিভাগের শিক্ষার্থীরা প্রশিক্ষণ কিট বা ছোট বৈদ্যুতিক সামগ্রী তৈরির মাধ্যমে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। একইভাবে যন্ত্রকৌশল, বৈদ্যুতিন প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, পুরকৌশল ও কৃষিসহ বিভিন্ন ট্রেডে সংশ্লিষ্ট কাজ ও প্রোডাকশন চালু করা সম্ভব।
তবে শিক্ষার্থীদের সস্তা শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার নয়—প্রোডাকশন হবে শিক্ষারই অংশ। উৎপাদনের মাধ্যমে তারা কাঁচামাল, মাপজোক, ডিজাইন, উৎপাদন পদ্ধতি, কোয়ালিটি কন্ট্রোল, কস্টিং, সময় ব্যবস্থাপনা ও মার্কেটিং সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পাবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইন্ডাস্ট্রির দূরত্ব কমাতে হবে
কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রির সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করা জরুরি। ইন্ডাস্ট্রিগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষক, কাঁচামাল ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ দিতে পারে। শিক্ষার্থীরাও বাস্তব কর্মপরিবেশে গিয়ে কাজ শিখতে পারবে।
এভাবে একজন শিক্ষার্থী সনদ হাতে নিয়ে চাকরি খুঁজতে বের হওয়ার আগেই কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা সম্পর্কে পরিচিত হয়ে উঠবে।
এর পাশাপাশি একটি জাতীয় ‘ইন্ডাস্ট্রি লিংক’ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। সেখানে কোন প্রতিষ্ঠানে কোন ট্রেড আছে, কী ধরনের সুবিধা রয়েছে, কোন ইন্ডাস্ট্রিতে কোন দক্ষতার চাহিদা আছে, কোথায় ইন্টার্নশিপ ও চাকরির সুযোগ রয়েছে—এসব তথ্য থাকবে। এতে শিক্ষার্থী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি হবে।
ইন্ডাস্ট্রির বিনিয়োগ হতে পারে মানবসম্পদ উন্নয়নের শক্তি
কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে বড় ইন্ডাস্ট্রিগুলোর অংশগ্রহণকে নীতিমালার মাধ্যমে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করা যেতে পারে। কোনো পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পোশাক প্রস্তুতকরণ বিভাগের আধুনিকায়নে সহায়তা করতে পারে, তড়িৎ বা বৈদ্যুতিন প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ট্রেডে আধুনিক প্রশিক্ষণের সুযোগ দিতে পারে, তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের বাস্তব কাজ শেখাতে পারে।
সরকার চাইলে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে নির্দিষ্ট বিনিয়োগ বা অংশীদারত্বের ব্যবস্থাও বিবেচনা করতে পারে। তবে সবকিছু হতে হবে স্বচ্ছ নীতিমালা, মান নিয়ন্ত্রণ ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, উদ্যোক্তাও তৈরি করতে হবে
একজন শিক্ষার্থী যদি পড়াশোনার পাশাপাশি প্রোডাকশন, কস্টিং, কোয়ালিটি কন্ট্রোল, মার্কেটিং ও ব্যবস্থাপনা শেখে, তাহলে সে শুধু চাকরির জন্য অপেক্ষা করবে না; নিজের উদ্যোগও শুরু করতে পারবে।
একটি ছোট পোশাক কারখানা, বৈদ্যুতিক পণ্য তৈরির উদ্যোগ, যন্ত্র মেরামতের সেবা, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ কিংবা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা—ছোট উদ্যোগ থেকেই একদিন বড় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
এখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
কারিগরি শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য শুধু কতজন সনদ পেল, তা দিয়ে মাপা উচিত নয়। সাফল্য হলো—কতজন শিক্ষার্থী সত্যিকারের দক্ষ হলো, কতজন কর্মসংস্থানে গেল এবং কতজন নিজের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারল।
আমাদের সামনে পথটি হতে পারে—
পড়াশোনা → দক্ষতা → বাস্তব প্রোডাকশন → ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সংযোগ → চাকরি অথবা উদ্যোক্তা।
বাংলাদেশের তরুণদের হাতে শুধু একটি সনদ তুলে দিলে চলবে না। তাদের হাতে দিতে হবে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সক্ষমতা।
এমন একটি কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে একজন শিক্ষার্থী শুধু শিখবে না—শিখতে শিখতে তৈরি করবে, তৈরি করতে করতে আত্মনির্ভর হবে, আর একদিন নিজেই অন্যের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে।
লেখক: জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর
নাচোল সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ
নাচোল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।