মনিরুল ইসলাম : আশির দশকের রুপালি পর্দার মনোহরিণী, চঞ্চলা-চপলা রূপবতী চিত্রনায়িকা কাজরী—যার প্রকৃত নাম ফেরদৌস আরা মাহমুদ শেলি—বাংলা চলচ্চিত্রে স্বল্প সময়ের ক্যারিয়ারেই নিজের অভিনয় প্রতিভা ও সৌন্দর্যের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তবে তার ব্যক্তিজীবনের কিছু সিদ্ধান্ত ও পারিবারিক চাপে সেই উজ্জ্বল ক্যারিয়ার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশে বেড়ে ওঠা কাজরী চলচ্চিত্রে পা রেখেই নজর কাড়েন। “সুখ দুঃখের সাথী”, “রেশমি চুড়ি”, “কেউ কারো নয়”, “ঈদ মোবারক”, “কাজল লতা” ও “ফুলেশ্বরী”সহ একাধিক ছবিতে শাবানা, ববিতা, রোজিনা, সুচরিতা, নূতনদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
নায়ক রাজ রাজ্জাক তার প্রতিভা অনুধাবন করে “জোকার” সিনেমায় একক নায়িকা হিসেবে সুযোগ দেন। পরে “মৌচোর” ছবিতেও তিনি রাজ্জাকের নায়িকা হন। এছাড়া জাফর ইকবালের বিপরীতে “নয়নের আলো” ছবিটি তার ক্যারিয়ারে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলস্টোন হয়ে আছে।
১৯৮২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর কাজরীর জীবনে আসে বড় মোড়। চট্টগ্রামের চন্দনাইশের বাসিন্দা, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও ঠিকাদার মোহাম্মদ আবুল কাসেমের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।
প্রেমের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের হলেও বিয়েটি ছিল নাটকীয়। ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের একটি বাসায় পারিবারিক উপস্থিতিতে হঠাৎ করেই আংটি বদলের অনুষ্ঠান বিয়েতে রূপ নেয়। কনের পরিবার উপস্থিত থাকলেও পাত্রের পরিবার এই বিয়ে মেনে নেয়নি।
কাবিননামায় দেনমোহর ধার্য করা হয় ৫০ হাজার ১ টাকা, যার মধ্যে উসুল দেখানো হয় ২০ হাজার টাকা। সে সময় কাজরীর বয়স দেখানো হয় ২০ বছর এবং কাসেমের ৩৪ বছর।
বিয়ের আগে কাসেম শর্ত দিয়েছিলেন—কাজরীকে চলচ্চিত্র জগৎ ছাড়তে হবে এবং চট্টগ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে হবে। শুরুতে এ নিয়ে দ্বিধায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত পারিবারিক চাপে বিয়েতে সম্মত হন কাজরী।
তবে বিয়ের পরও তিনি অভিনয় ছাড়েননি। বরং জাফর ইকবালের বিপরীতে “নয়নের আলো” ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হন, যা নিয়ে স্বামী কাসেমের সঙ্গে বিরোধ চরমে পৌঁছায়। এ নিয়ে পারিবারিক সালিশ পর্যন্ত গড়ায় এবং সেখানে কাজরীকেই তিরস্কার করা হয়।
পরবর্তীতে স্বামী-সন্তান নিয়ে ঢাকায় স্থায়ী হন কাজরী। তাদের একমাত্র ছেলে সাকি বড় হয়ে ওঠার পর ব্যক্তিজীবনে আরেক নাটকীয় ঘটনার জন্ম দেন।
নিকুঞ্জে বসবাসের সময় প্রতিবেশী বুবলির সঙ্গে সাকির প্রেম গড়ে ওঠে। কিন্তু পারিবারিক আপত্তি সত্ত্বেও তারা গোপনে বিয়ে করেন। তবে সেই সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত তাদের বিচ্ছেদ ঘটে।
স্বল্প সময়ের ক্যারিয়ারে কাজরী ছিলেন দর্শকপ্রিয় ও সম্ভাবনাময় এক অভিনেত্রী। ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন, সামাজিক চাপ ও পারিবারিক সিদ্ধান্তের কারণে তার অভিনয় জীবন দ্রুত থেমে যায়। তবুও আশির দশকের বাংলা চলচ্চিত্রে তার অবদান ও উপস্থিতি আজও স্মরণীয় হয়ে আছে। তথ্য সূত্র : মিলি সুলতানা