শিরোনাম
◈ টানা বৃষ্টি-ঝড়ে বিপর্যস্ত উত্তর প্রদেশ, তিন দিনে ৫৬ জনের মৃত্যু ◈ আবাসনে এডিবির ১০ কোটি ডলার ঋণ : বাড়ি নির্মাণে সুবিধা পাবে ৪০ হাজার পরিবার ◈ সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা: মূলহোতাসহ গ্রেফতার ৪ ◈ হাম উপসর্গে আরও ৯ শিশুর মৃত্যু ◈ কৃষকরাই দেশের শ্রেষ্ঠ মানুষ ও দেশ গড়ার যোদ্ধা: রাষ্ট্রপতি ◈ এক দিনে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তির রেকর্ড, মৃত্যু ৬ ◈ অক্টোবর-নভেম্বরে তিন দেশ সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ◈ লঞ্চ-জাহাজ চলা বরিশালের সেই নদীগুলো এখন পরিণত হচ্ছে মরা খালে ◈ সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় যে ক্ষতি হয়েছে, সেজন্য দুঃখিত: জ্বালানি মন্ত্রী ◈ চলতি অর্থবছরে রাজস্ব বাড়াতে এনবিআরের ‘থ্রি আর’ কৌশল

প্রকাশিত : ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:৩৯ বিকাল
আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:৫৫ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

টানা বৃষ্টি-ঝড়ে বিপর্যস্ত উত্তর প্রদেশ, তিন দিনে ৫৬ জনের মৃত্যু

ভারতের উত্তর প্রদেশে টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টি ও ঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শুক্রবার থেকে বৃষ্টি ও ঝড়জনিত বিভিন্ন ঘটনায় রাজ্যটিতে অন্তত ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ৪৬ জন। কয়েকটি জেলায় নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে ওঠায় বন্যাসদৃশ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

রবিবার রাজ্য সরকারের কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানিয়েছেন।

তিন দিনের টানা বৃষ্টির পর রবিবার রাজ্যের ওপর অবস্থানরত নিম্নচাপটি দুর্বল হয়ে ‘সুস্পষ্ট নিম্নচাপে’ পরিণত হয়েছে। এতে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

তবে বিভিন্ন এলাকায় এখনও জলাবদ্ধতা ও বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। আটকে পড়া মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে জলমগ্ন এলাকাগুলোতে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে বিভিন্ন উদ্ধারকারী দল।

advertisement

৬০ ঘণ্টায় ৫৬ মৃত্যু: রাজ্যের ত্রাণ কমিশনারের কার্যালয়ের প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত প্রায় ৬০ ঘণ্টায় বৃষ্টি ও ঝড়জনিত ঘটনায় ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ৪৬ জন।

সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে সীতাপুর জেলায়। এরপর রয়েছে লখিমপুর খেরি, বাহরাইচ, বলরামপুর, অযোধ্যা ও গোরখপুর।

এই সময়ে অন্তত ১ হাজার ২১টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সরকারি হিসাবে জানানো হয়েছে।
ঝড়ো বাতাস ও ভারী বৃষ্টিতে বিভিন্ন এলাকায় গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে সড়ক ও গ্রাম। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাড়িঘর ও মাঠের ফসলও।

স্বাভাবিকের চেয়ে ২৫ গুণ বেশি বৃষ্টি: কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রবিবার শেষ হওয়া আগের ২৪ ঘণ্টায় উত্তর প্রদেশে গড়ে ৪৫ দশমিক ১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এ সময়ে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ যেখানে মাত্র ১ দশমিক ৮ মিলিমিটার, সেখানে এবারের বৃষ্টিপাত ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ২৫ গুণ।

ভারতের আবহাওয়া অধিদফতর (আইএমডি) জানিয়েছে, গত তিন দিনের টানা বৃষ্টির জন্য দায়ী আবহাওয়াব্যবস্থাটি উত্তর-উত্তর-পশ্চিম দিকে সরে গিয়ে রবিবার ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে দুর্বল হয়ে একটি সুস্পষ্ট নিম্নচাপ এলাকায় পরিণত হয়েছে।

এটি একই দিকে উত্তর প্রদেশের ওপর দিয়ে অগ্রসর হতে থাকবে এবং পরবর্তী ১২ ঘণ্টায় আরও দুর্বল হয়ে সাধারণ নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে।

আইএমডির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একটি নিম্নচাপ যখন ‘সুস্পষ্ট নিম্নচাপ’ পর্যায়ে দুর্বল হয়, তখন এর বাতাসের গতি কমে আসে। ফলে বৃষ্টির তীব্রতাও ধীরে ধীরে কমতে পারে।

গঙ্গা-ঘাঘরা-রাপ্তিতে বন্যার আশঙ্কা: ভারতের কেন্দ্রীয় জল কমিশন (সিডব্লিউসি) জানিয়েছে, ঘাঘরা ও রাপ্তি নদীর বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে। এতে নিচু এলাকাগুলোতে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বারাবাঁকির এলগিনব্রিজে রবিবার সকাল ৮টায় ঘাঘরা নদীর পানি ১০৬ দশমিক ১৪ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছিল। সেখানে বিপৎসীমা ১০৬ দশমিক ০৭ মিটার। অর্থাৎ পানি বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল। রবিবার রাতের মধ্যে নদীর পানি আরও বেড়ে ১০৬ দশমিক ৫৫ মিটার হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।

অযোধ্যায় ঘাঘরার পানি ছিল ৯২ দশমিক ৩৯ মিটার। সেখানে সতর্কতা সীমা ৯১ দশমিক ৭৩ মিটার। নদীর পানি আরও বেড়ে ৯২ দশমিক ৮৫ মিটারে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়।

পূর্ব উত্তর প্রদেশেও রাপ্তি নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। বলরামপুরে নদীর পানি ১০৪ মিটার উচ্চতায় পৌঁছেছে, যেখানে সতর্কতা সীমা ১০৩ দশমিক ৬২ মিটার। রবিবার সন্ধ্যার মধ্যে পানির উচ্চতা আরও বাড়তে পারে বলে জানানো হয়েছে।

সিডব্লিউসি জানিয়েছে, রবিবার সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় নদীগুলোর অববাহিকাজুড়ে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়েছে।

সড়ক ডুবে গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত মহাসড়ক: অতিবৃষ্টিতে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।

উন্নাওয়ের গঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের সোনিক টোল প্লাজায় বৃষ্টির পানি জমে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাম্প ব্যবহার করে পানি সরানো হয়।

গঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প ব্যবস্থাপক আর এস মিশ্র জানিয়েছেন, অতিবৃষ্টি সত্ত্বেও এক্সপ্রেসওয়ের যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। তবে উন্নাওয়ের একটি র‌্যাম্পে পানি জমেছিল।

তিনি জানান, ওই র‌্যাম্পের কাছে উচ্চক্ষমতার বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের উচ্চতা তুলনামূলক কম হওয়ায় সেখানে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্ষা মৌসুম শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে বিদ্যুৎ লাইনটি সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এদিকে, এক্সপ্রেসওয়েতে যান চলাচল নিরাপদ রাখতে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

কানপুর-ইটাওয়া মহাসড়কের প্রায় ২০০ মিটার অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

লখনৌতে জলাবদ্ধতা, ডুবে গেছে কৃষিজমি: রাজ্যের রাজধানী লখনৌতেও বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে। একানা স্টেডিয়ামের কাছে একটি সড়কের অংশ ধসে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। শহরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়েও পানি জমে যায়।

বকশি কা তালাব এলাকায় কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রবল বৃষ্টি ও ঝড়ো বাতাসে মাঠের ফসলও মাটিতে নুয়ে পড়েছে।

কানপুর, বারাণসী, প্রয়াগরাজ, গোরখপুর, বেরেলিসহ রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টির পাশাপাশি ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে ঝড়ো বাতাস বয়ে গেছে।

৭৫ জেলার ৫৬টিতেই অতিবৃষ্টি: আইএমডির তথ্যানুযায়ী, উত্তর প্রদেশের মোট ৭৫টি জেলার মধ্যে ৫৬টিতে স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে।

ফররুখাবাদে স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল সবচেয়ে বেশি- প্রায় ৭ হাজার ৩৮৫ শতাংশ বেশি। এরপর রয়েছে কনৌজ, শাহজাহানপুর, হামিরপুর ও মহোবা।
এই অস্বাভাবিক বৃষ্টিতে অনেক এলাকায় ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ও যোগাযোগব্যবস্থাও ব্যাহত হয়েছে।

মাঠে থাকার নির্দেশ কর্মকর্তাদের: রবিবার উত্তর প্রদেশের ত্রাণ কমিশনার ডা. হৃষিকেশ ভাস্কর যশোদ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম নিয়ে পর্যালোচনা বৈঠক করেন।

তিনি কর্মকর্তাদের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মাঠপর্যায়ে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি দুর্গত মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখা এবং দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কৃষিজমির ক্ষয়ক্ষতি দ্রুত নিরূপণ করে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। যেসব পরিবারকে বাড়ি ছাড়তে হয়েছে, তাদের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির পরিবারগুলোর কাছে দ্রুত সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নিরাপদে থাকার পরামর্শ: রাজ্যের ত্রাণ বিভাগ জানিয়েছে, জলাবদ্ধ ও বন্যাকবলিত এলাকায় আটকে পড়া মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে উদ্ধারকারী দলগুলো কাজ করছে।

দুর্যোগ পরিস্থিতিতে মানুষকে প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুতগতির নদী, খাল, নালা ও পানির স্রোতের কাছাকাছি না যাওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।

জরুরি সহায়তার জন্য উত্তর প্রদেশের ত্রাণ কমিশনারের কার্যালয়ের ১০৭০ নম্বর হেল্পলাইনে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস

 

  • সর্বশেষ