ঢাকা, নরসিংদীসহ দেশের ছয় জেলায় বজ্রপাতে তিন মাদ্রাসাশিক্ষার্থীসহ ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে নরসিংদীতে তিনজন, সাভারে তিনজন, মানিকগঞ্জে দুইজন এবং নেত্রকোনা, জামালপুর ও কিশোরগঞ্জে একজন করে মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে ছয়জন কৃষক।
রবিবার (২১ জুন) বিকাল থেকে সন্ধ্যা রাত পর্যন্ত তীব্র ঝড়-বৃষ্টির সময় এ বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে।
জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর—
জামালপুর: মাদারগঞ্জ উপজেলায় গরুর জন্য ঘাস কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে মুসা ফকির (৬০) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে উপজেলার বালিজুড়ী ইউনিয়নের উত্তর চরবওলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত মুসা ফকির ওই এলাকার মৃত মহির উদ্দিনের ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রোববার বিকেলে গরুর জন্য মাঠে ঘাস কাটতে গেলে হঠাৎ বজ্রপাতে গুরুতর আহত হন মুসা ফকির। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে মাদারগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন বলে জানিয়েছেন মাদারগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. নাহিদুজ্জামান।
নরসিংদীতে তিন মাদ্রাসাছাত্রের মৃত্যু: নরসিংদীর মনোহরদীতে বজ্রপাতে তিন মাদ্রাসাছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। এসময় আরও এক ছাত্র গুরুতর আহত হয়েছে। রবিবার মাগরিবের নামাজের সময় উপজেলার পাঁচকান্দি মদিনাতুল উলুম মাদ্রাসায় এ ঘটনা ঘটে।
বজ্রপাতে মৃত শিক্ষার্থীরা হলো- জহিরুল হক (১৫), আবু রায়হান (১৪) ও আবু জাফর (১৫)। তাদের বাড়ি কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে। তারা সবাই ওই মাদ্রাসায় থেকে লেখাপড়া করত।
শিবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোসতানশির বিল্লাহ বলেন, ‘বজ্রপাতে আহত অবস্থায় হাসপাতালে চারজনকে আনা হলে আমরা তিনজনে মৃত অবস্থায় পাই এবং একজনকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
নেত্রকোণা: নেত্রকোণার বারহাট্টা উপজেলার বড়গাও গ্রামে মাঠ থেকে গরু আনতে গিয়ে জাহাঙ্গীর আলম (৩৫) নামে বজ্রপাতে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। দুপুর আড়াইটার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত জাহাঙ্গীর আলম উপজেলার বড়গাও গ্রামের মৃত আব্দুর রাশিদের ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুপুরে বৃষ্টির সময় মাঠ থেকে গরু আনতে যান জাহাঙ্গীর আলম। এ সময় আকস্মিক বজ্রপাতে তিনি ঘটনাস্থলেই গুরুতর আহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শী রেনু বেগম বলেন, ‘আমি মাঠে গরু আনতে গিয়ে দেখি জাহাঙ্গীর আলম মাটিতে পড়ে আছেন। তাকে ডাকাডাকি করলেও কোনো সাড়া না পেয়ে চিৎকার করে আশপাশের লোকজনকে ডেকে আনি। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে বারহাট্টা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার ও এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেলিনা আক্তার বলেন, ‘খবর পাওয়ার পর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলে লোক পাঠানো হয়েছে। নিহতের পরিবারকে সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে।’
সাভারে বজ্রপাতে তিন কৃষকের মৃত্যু: ঢাকা জেলার সাভার উপজেলায় ফসলি জমিতে কৃষিকাজ করার সময় আচমকা বজ্রপাতে তিন শ্রমজীবী মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আজ বিকেলে উপজেলার বনগাঁও ইউনিয়নের কোন্ডা এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।
নিহতদের মধ্যে দুজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন- দ্বীন ইসলাম (৪৫) ও দুলাল (৬০)। অপর নিহত ব্যক্তির (আনুমানিক বয়স ৩৫) পরিচয় এখনও শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিকেলে আকাশ মেঘলা থাকায় কোন্ডা এলাকার একটি ফসলি জমিতে দ্রুত কাজ সারছিলেন দ্বীন ইসলাম ও দুলালসহ তিনজন। বিকেল ৫টার দিকে হঠাৎ করে তাদের ওপর প্রচণ্ড শব্দে বজ্রপাত পতিত হয়। এতে ঘটনাস্থলেই দুলাল ও অজ্ঞাতপরিচয় ওই ব্যক্তি প্রাণ হারান।
বজ্রপাতের শব্দ শুনে আশেপাশের লোকজন ও নিহতের স্বজনরা মাঠে ছুটে যান। সেখানে দ্বীন ইসলামকে গুরুতর আহত অবস্থায় ছটফট করতে দেখে দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই পথে তার মৃত্যু হয়
খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে সাভার মডেল থানা পুলিশ। সাভার মডেল থানার ভবানীপুর পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ইমরান হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
কিশোরগঞ্জ: সন্ধ্যা ৭টার দিকে নিকলী উপজেলায় হাওরে বজ্রপাতে এক নৌকার মাঝির মৃত্যু হয়েছে। তার নাম বাবুল সরকার (৪৫)। সদর ইউনিয়নের উলাবাইরা চর হাওর এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত বাবুল নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার নারাজ গ্রামের বাসিন্দা। তিনি একটি স্টিলবডি নৌকার মাঝি হিসেবে কাজ করতেন।
স্থানীয় সূত্র ও উপজেলা প্রশাসন জানায়, বাবুল সরকারসহ কয়েকজন যাত্রী স্টিলবডি নৌকাযোগে আশুগঞ্জ থেকে ধান বিক্রি করে নিজ এলাকায় ফিরছিলেন। পথে বৃষ্টি ও বজ্রপাত শুরু হলে নৌকায় থাকা অন্যান্য যাত্রীরা পাটাতনের নিচে আশ্রয় নেন। তবে নৌকা চালানোর দায়িত্বে থাকায় বাবুল সরকার নৌকার ওপরেই অবস্থান করছিলেন।
একপর্যায়ে বজ্রপাতের আঘাতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে নৌকার গতিবিধিতে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করে অন্য যাত্রীরা ওপরে উঠে তাকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। পরে নিশ্চিত হওয়া যায় যে তিনি মারা গেছেন।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেহানা মজুমদার মুক্তি জানান, বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মানিকগঞ্জ: জেলার সিংগাইর উপজেলায় বজ্রপাতে দুই কৃষকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। রোববার সন্ধ্যায় উপজেলার জামিত্তা ইউনিয়নের কাঞ্চননগর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন— কাঞ্চননগর গ্রামের নেওয়াজের ছেলে কবির হোসেন (৩০) এবং রফি মিস্ত্রির ছেলে শহিদুল ইসলাম (২৫)। তারা দুজনই কৃষিকাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিকেলে কবির হোসেন ও শহিদুল ইসলাম মাঠে কৃষিকাজ করছিলেন। এ সময় হঠাৎ আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে বজ্রসহ বৃষ্টি শুরু হয়। বৃষ্টির মধ্যেই মাঠে কাজ করার সময় আকস্মিক বজ্রপাতে তারা গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা দ্রুত তাদের উদ্ধার করে সাভারের হেমায়েতপুরের জামাল ক্লিনিকে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দুজনকেই মৃত ঘোষণা করেন। উৎস: কালবেলা।