শিরোনাম
◈ মালয়েশিয়ায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, কুয়ালালামপুরে উষ্ণ অভ্যর্থনা ◈ সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা শুরু ◈ ডিগ্রি আছে, চাকরি নেই: বাংলাদেশে কেন বাড়ছে শিক্ষিত বেকার ◈ কাতারে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল ৫ বাংলাদেশির ◈ টি-‌টো‌য়ে‌ন্টি সি‌রি‌জে স্বাগ‌তিক বাংলাদেশকে হোয়াইটওয়াশ করলো অস্ট্রেলিয়া ◈ সিলেটের ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার ◈ এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী ও ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ দেবে সরকার: এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার ◈ মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ◈ বাজেট পারফেক্ট নয়, অর্থনৈতিক সংকট সমাধানে আরও দুই বছর প্রয়োজন: অর্থমন্ত্রী আমির খসরু ◈ একজনের প্রেমিকাকে ধর্ষণ করলেন তিন বন্ধু মিলে

প্রকাশিত : ২১ জুন, ২০২৬, ০৮:৩৫ রাত
আপডেট : ২১ জুন, ২০২৬, ০৯:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

লোকবল ঘাটতিতে বিপর্যস্ত রেলওয়ে, ব্যাহত সেবা

এম আর আমিন, চট্টগ্রাম : দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন ব্যবস্থা বাংলাদেশ রেলওয়ে বর্তমানে তীব্র জনবল সংকটে ভুগছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকায় রেলওয়ের পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও সেবা কার্যক্রমে নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।

জনবল সংকটের কথা স্বীকার করে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমরা অবগত আছি।আমরা ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, রেলওয়ের বিভিন্ন বিভাগে বিপুল সংখ্যক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। ফলে বিদ্যমান কর্মীদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, যা একদিকে কাজের চাপ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে সেবার গুণগত মানকেও প্রভাবিত করছে। অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নির্ধারিত সময়ের বাইরে কাজ করতে হচ্ছে, যা নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়িয়ে তুলছে।

জনবল সংকটের কারণে ট্রেন পরিচালনা ও সময়সূচি রক্ষা করাও চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।প্রয়োজনীয় কর্মী না থাকায় যাত্রীসেবায় বিঘ্ন ঘটছে। এছাড়া রেলপথ, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

 রেলসেবার পরিধি বাড়লেও সেই অনুপাতে জনবল বৃদ্ধি করা হয়নি। ফলে আধুনিক ও নিরাপদ রেলব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য অর্জনে জনবল সংকট একটি বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত শূন্য পদে নিয়োগ, দক্ষ জনবল তৈরি, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার এবং মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ রেলওয়ের সেবার মান আরও উন্নত হবে এবং যাত্রীরা আরও নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় সেবা পাবেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশ রেলওয়ে জনবল কাঠামো অনুযায়ী ৪৭ হাজার ৬৩৭ জন কর্মরত থাকার কথা থাকলেও আছে মাত্র ২৪ হাজার। অর্থাৎ ৫০ শতাংশ পদই শূন্য। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পদে নিয়োগ কার্যক্রম স্থবির থাকায় এই শূন্যতা তৈরি হয়েছে। আর এই শূন্য পদ নিয়ে বেকায়দায় আছে রেল। 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে লোকোমোটিভ/ইঞ্জিন মেইনটেন্যান্স সেকশন। এই শাখায় ৭৫ শতাংশ পদ শূন্য, আছে মাত্র ২৫ শতাংশ। এমন শূন্যতা রেলের অনেক দপ্তরেই আছে। এর অন্যতম কারণ বিদ্যমান নিয়োগবিধি সংশোধনের প্রক্রিয়া। আবার কিছু ছোট পদের বিপরীতে শিক্ষিত প্রার্থী আহবান করায় কাজে দক্ষরা পরীক্ষায় টিকছে না আর যারা টিকছে তারা বেশিরভাগই অন্যত্র ভালো সুযোগ পাওয়ায় যোগদান করছে না। আবার যোগদান করেও অনেকে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোতে জনবল ঘাটতি দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে।

বিশেষ সৃত্রে জানা যায়, আগে ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী (খালাসি, ওয়েম্যান, পোর্টার) নিয়োগের ক্ষেত্রে ৮ম শ্রেণি পাস হলেই চলতো, লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হতো না, ভাইবাতে দেখা হতো শারীরিক পরিশ্রম করার দক্ষতা আছে কি না। সেই যোগতায় নিয়োগ দিলে তারা কাজ করতে পারতো। কিন্তু বর্তমানে এসব পদে এসএসসি পাস এবং লিখিত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে এই পদের জন্য উচ্চ শিক্ষিত লোকেরা আবেদন করছেন আর কম শিক্ষিত কিন্তু কাজে দক্ষ এমন লোকেরা তাদের সাথে পরীক্ষায় টিকতে না পেরে শিক্ষিতরাই লেবারের পদগুলো পেয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে শিক্ষিত ছেলেরা চাকরি পেলেও অনেকেরই যোগদান করতে আগ্রহ থাকে না, আবার যোগদান করলেও বেটার চান্স পেয়ে অনেকে চাকরী ছেড়ে চলে যাচ্ছে বলে শূন্যতা পুরণ করা যাচ্ছে না। ফলে রেলের বিভিন্ন দপ্তর থেকে অনেক খালাসি চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে সহকারী স্টেশন মাস্টার (এএসএম) পদের জন্য বিএ পাস, সহকারী লোকো মাস্টার (এএলএম) পদের জন্য বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস বাধ্যতামূলক আছে। কিন্তু বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা বেশি হওয়ায় উচ্চ শিক্ষিত প্রার্থীরা এসব পদে অংশ নিয়ে টিকে যান। ফলে নিয়োগপত্র পেয়েও অনেক প্রার্থী চাকরিতে যোগ দেননি। আবার যোগ দিয়েও অনেকে অন্যত্র আরো ভালো চাকরি নিয়ে চলে গেছেন বলে জানা গেছে।

বিগত ২০২২ সালে ৫৮৭ জন সহকারী স্টেশন মাস্টারকে (এএসএম) চুড়ান্ত নিয়োগ দিলেও যোগদান করেছে মাত্র ৩৫২ জন, যোগদান করেননি ২২৫ জন। আবার যোগ দিয়েও চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন আরো ১৬২ জন। অন্যদিকে ২০২৫ সালে ৩৫৩ জন সহকারী লোকো মাস্টারের (এএলএম) বিপরীতে যোগ দিয়ে চাকরি ছেড়েছে ৪৫ জন। পরে যদিও ৩ ধাপে ওয়েটিং লিস্টের বরাত দিয়ে আরো ৪৫ জনকে নিয়োগ দিয়েছে। শুধু এগুলোই নয়, রেলের বিভিন্ন দপ্তরে এমন ঘটনা অহরহ। ফলে তাদের নিয়োগ ও ট্রেনিং বাবদ রেলের সময় ও অর্থে অপচয় হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে ওয়েটিং লিস্টের নামে যাদের দেওয়া হচ্ছে সেখানে দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ ওয়েটিং লিস্ট কোথাও সংরক্ষণ করা হয়নি বলেও সূত্রের দাবি।  

বিশেষজ্ঞদের মতে,রেলওয়ের বিভিন্ন কারিগরি, অপারেশনাল এবং প্রশাসনিক পদে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী অবসরে যাচ্ছেন। কিন্তু তাদের স্থলাভিষিক্ত করার মতো নতুন জনবল সময়মতো নিয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অভিজ্ঞ কর্মীদের অবসরের কারণে যে শূন্যতা সৃষ্টি হচ্ছে তা পূরণ করা যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে একাধিক পদের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।নিয়োগবিধি সংশোধনের জটিলতা দ্রুত নিরসন, শূন্য পদে জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগ, অবসরপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ জনবলের বিকল্প তৈরির পরিকল্পনা এবং কর্মী ধরে রাখার কার্যকর কৌশল গ্রহণ না করলে আগামী দিনে রেলের জনবল সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও সিনিয়র লোকো মাস্টার এমআর মনজু বলেন, একজন কর্মীকে নিয়োগ দেওয়া থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং মাঠপর্যায়ে দক্ষ করে তুলতে উল্লেখযোগ্য সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। কোনো কর্মী অল্প সময়ের মধ্যে চাকরি ছেড়ে দিলে সেই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায় না। ফলে প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।

বিগত সরকারের আমলে চাপিয়ে দেওয়া ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগ বিধি ও পদ্ধতি -২০২০ এর মাধ্যমে পিএসসি কর্তৃক নিযুক্ত তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর বিভিন্ন পদে ওভার কোয়ালিফাইড লোক নিযুক্ত হওয়ার কারণে তাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ট্রেনিং  শেষ করে অথবা ট্রেনিং এর মধ্যবর্তী সময় চাকুরী ছেড়ে যাওয়ার কারণে দক্ষতার অপচয়, সরকারের আর্থিক অপচয়, লোকবল সংকট জারি থাকা সহ বহুবিধ সমস্য সৃষ্টি হচ্ছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনবল সংকটের কথা স্বীকার করে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়েতে জনবল সংকট রয়েছে, বিষয়টি আমরা অবগত আছি। জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের একটি সুস্পষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে এবং আমরা ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। জনবল ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী করতে প্রয়োজনীয় বিধি-বিধান সংশোধনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে এবং এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।”

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়