মনিরুল ইসলাম: মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ বিকেলে এক সরকারি সফরে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। তার সঙ্গে রয়েছেন সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমান।
প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট বিকেলে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কুয়ালালামপুরের উদ্দেশে রওনা হন।
মালয়েশিয়া সফর শেষে তিনি চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং-এর আমন্ত্রণে সরাসরি চীন সফর করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই দুই দেশ (মালয়েশিয়া ও চীন) সফরের আগে গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), দুটি চুক্তি, একটি কর্মপরিকল্পনা এবং একটি প্রোটোকলসহ ১৫ থেকে ১৭টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ সময় বহু প্রতীক্ষিত তিস্তা প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হবে।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটিই প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর।
তিনি উল্লেখ করেন , মালয়েশিয়া ও চীনে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী প্রতিনিধিদল তুলনামূলকভাবে ছোট রাখা হয়েছে। এতে ২৭ থেকে ২৮ জন সদস্য রয়েছেন। আমরা এটিকে একটি যুক্তিসঙ্গত পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করেছি।
তিনি বলেন, এই সফরগুলোকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব শক্তিশালীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি বড় কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আগামী ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং-এর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করবেন। সরকারি সফরের অংশ হিসেবে তিনি ২৬ জুন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবেন।
চীন সফরকালে প্রধানমন্ত্রী লিয়াওনিং প্রদেশের দালিয়ানে ২৩ থেকে ২৫ জুন অনুষ্ঠেয় ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস’-এর ১৭তম বার্ষিক সম্মেলনে (সামার দাভোস ফোরাম) অংশ নেবেন।
‘ইনোভেটিং অ্যাট স্কেল’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ ফোরামে ৯০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলের ১ হাজার ৭০০-এর বেশি প্রতিনিধি অংশ নেবেন। সেখানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবণতা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং উদ্ভাবননির্ভর প্রবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা হবে।
সফরের মালয়েশিয়া পর্বে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, শ্রমবাজারে সহযোগিতা এবং বিনিয়োগের সুযোগ বৃদ্ধির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। অন্যদিকে, চীন সফরে অবকাঠামো, প্রযুক্তি, সংযোগ এবং উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয়ে বাংলাদেশের অঙ্গীকার তুলে ধরা হবে।
প্রধানমন্ত্রী আগামী শুক্রবার রাতে দেশে ফিরবেন।
জানা গেছে, সফরের প্রথম ধাপে মালয়েশিয়ায় প্রধানমন্ত্রী উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী ও শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণ এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং উৎপাদন খাতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে।
এছাড়া দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং যৌথ উদ্যোগে শিল্প কারখানা স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা হয়। মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে বাংলাদেশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে।
মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে যান, যেখানে অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বৃহৎ বিনিয়োগ প্রকল্প নিয়ে একাধিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়।
চীনের সঙ্গে বৈঠকে রেলপথ, সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)-এর আওতায় বাংলাদেশে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়েও আলোচনা হয়।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং রপ্তানি খাতে নতুন গতি আসবে। এছাড়া নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।
এই সফরকে বাংলাদেশর ‘লুক ইস্ট’ নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মালয়েশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা এবং বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার কৌশল স্পষ্ট হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সফর নয়, বরং এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করার একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর সুফল আগামী দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন খাতে প্রতিফলিত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।