শিরোনাম
◈ মালয়েশিয়ায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, কুয়ালালামপুরে উষ্ণ অভ্যর্থনা ◈ সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা শুরু ◈ ডিগ্রি আছে, চাকরি নেই: বাংলাদেশে কেন বাড়ছে শিক্ষিত বেকার ◈ কাতারে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল ৫ বাংলাদেশির ◈ টি-‌টো‌য়ে‌ন্টি সি‌রি‌জে স্বাগ‌তিক বাংলাদেশকে হোয়াইটওয়াশ করলো অস্ট্রেলিয়া ◈ সিলেটের ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার ◈ এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী ও ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ দেবে সরকার: এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার ◈ মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ◈ বাজেট পারফেক্ট নয়, অর্থনৈতিক সংকট সমাধানে আরও দুই বছর প্রয়োজন: অর্থমন্ত্রী আমির খসরু ◈ একজনের প্রেমিকাকে ধর্ষণ করলেন তিন বন্ধু মিলে

প্রকাশিত : ২১ জুন, ২০২৬, ০৬:৫১ বিকাল
আপডেট : ২১ জুন, ২০২৬, ০৮:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ডিগ্রি আছে, চাকরি নেই: বাংলাদেশে কেন বাড়ছে শিক্ষিত বেকার

বাংলাদেশে স্নাতক পাস করা বেকারের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। ২০২৪ সালে লেবার ফোর্স সার্ভে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই সংখ্যার উল্লেখ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদধারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যেখানে কোনো পড়াশোনাই করেনি নেই এমন মানুষদের বেকারত্বের হার মাত্র ১ দশমিক ২৫ শতাংশ।

অর্থাৎ যত বেশি পড়াশোনা, বেকারত্বের হার তত বেশি। অন্তত ১৬ বছরের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম আর লাখো টাকা খরচের পরেও যদি এমন পরিস্থিতি দাঁড়ায়, তাহলে কি পড়ালেখা না করলেই ভালো হয়?

বিষয়টা ঠিক তেমন হওয়ার তো কথা না! আমাদের নিশ্চয়ই কোথাও একটা ভুল হচ্ছে এবং সেটাই আমাদের বোঝা দরকার।

বাংলাদেশ একটা তরুণ দেশ। জনসংখ্যার বড় একটা অংশ এখন পড়াশোনা শেষ করে কাজে ঢুকতে চাইছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, ভর্তির সুযোগ বেড়েছে, স্নাতকের সংখ্যাও বাড়ছে প্রতি বছর। এটা ভালো খবর।

কিন্তু তারপরও ২০২৪ ও ২০২৫ সালের শুরুটা চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বিশেষভাবে হতাশাজনক ছিল। এমনকি ২০২৬ সালও। সরকারি ও বেসরকারি উভয়খাতেই চাকরির বিজ্ঞপ্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বেসরকারিখাতে বিনিয়োগেও ধীরগতি।

এখন আমাদের আছে লাখো গ্র্যাজুয়েট, আর সংকুচিত চাকরির বাজার। মাঝখানে আটকে আছি আমরা।

যেসব কারণে পিছিয়ে পড়ছে যুবসমাজ
এই করুণ পরিস্থিতির জন্য যেসব বিষয়কে দায়ী করা যায় তার মধ্যে রয়েছে:

১. সনদ আছে, নেই দক্ষতা
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত সনদকে প্রাধান্য দেয়, দক্ষতাকে না। মুখস্থ করাকে গুরুত্ব দেয়, দক্ষতা তৈরিকে না। যার ফল বেশ অদ্ভুত।

নামকরা পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চমৎকার সিজিপিএ পাওয়া গ্র্যাজুয়েটরা নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রাথমিক বাছাই পরীক্ষা থেকেই ঝরে পড়ছে। একটু ভাবুন। ৪ বছর পড়াশোনা, দারুণ ফলাফল। তারপরও প্রথম রাউন্ড থেকেই বাদ। স্বপ্ন এখানেই চুরমার অনেকের।

২. বেড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়, বাড়েনি মান
গত ১৫ বছরে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৮২ থেকে বেড়ে ১৭৮ হয়েছে। কিন্তু এই সম্প্রসারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানের বিনিময়ে হয়েছে। সংখ্যা দিয়ে সমস্যার সমাধান হয় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সংখ্যা দিয়ে বরং সমস্যার সংখ্যা আরও বেড়েছে।

৩. বাজারে যা দরকার, তা পড়ানো হচ্ছে না
প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায় ১২ হাজার সিএসই গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে। অথচ বাজারে কাজ আছে মাত্র ৫ হাজার। এর ওপর নিয়োগকর্তারা বলছেন, আইটি বা সিএসই গ্র্যাজুয়েটদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ কোডিং, গণিত ও ইংরেজিতে বেসিক দক্ষতা পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হতে পারছেন না।

ফলে যেসব বিষয়ে পড়ানো হচ্ছে, তার কর্মক্ষেত্র কম। আর যেসবে কর্মক্ষেত্র আছে, তা পড়ানোই হচ্ছে না।

৪. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাঁদ
বিআইডিএস এর এক গবেষণা অনুযায়ী, জাতীয় বিশইবদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলো থেকে পাস করা ৬৬ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট বেকার। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী পড়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলোতেই।

৫. সমাজের চাপ: ‘ভালো চাকরি না হলে মানুষ কী বলবে?’
বাংলাদেশে শিক্ষা ক্রমশ বুদ্ধিবৃত্তিক বা পেশাদার বিকাশের উপায় হওয়ার বদলে সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠছে। পরিবারগুলো সন্তানদের ব্যাচেলর ও মাস্টার্স ডিগ্রির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এমনকি চাকরির বাজারে সেই ডিগ্রির কোনো প্রাসঙ্গিকতা না থাকলেও ডিগ্রি নিচ্ছে।

কর্মমুখী ভোকেশনাল শিক্ষাকে সমাজ এখনও ‘নিচু মানের’ বলে ধরে নেয়। ফলে একজন দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান হওয়ার চেয়ে একজন বেকার গ্র্যাজুয়েট হওয়া ‘সম্মানজনক’ মনে করে সমাজ।

যুবসমাজের ওপর প্রভাব
২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল ইউএনবিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তানভীর রহমান নামে এক যুবক জানান, তার বিজনেস ডিগ্রি আছে, স্বপ্নও ছিল বড়। কিন্তু ২ বছর ধরে চাকরি খোঁজার পরও প্রথম সুযোগের অপেক্ষায় আছেন তিনি।

এই ‘তানভীর’রা এখন একটা বিশেষ মনোজগতে বাস করছেন। মনোবিজ্ঞানীরা এটাকে বলছেন ‘অর্জিত অসহায়ত্ব’। সহজ ভাষায়, এই পরিস্থিতি তখনই আসে যখন বারবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পর কেউ ভাবতে শুরু করে যে চেষ্টা করে আর লাভ নেই। এই মানসিকতা একবার তৈরি হলে এর থেকে বের হওয়া কঠিন।

তার ওপর পরিবারের চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা, বন্ধুদের সাফল্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করার যন্ত্রণা তো রয়েছেই।

২০১৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়পড়া তরুণদের বেকারত্বের হার ছিল ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ দশমিক ৮ শতাংশ।

একটা দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার শিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু সেই সম্পদ যদি কাজে না লাগে, তাহলে সেটা আর সম্পদ থাকে না। বোঝা হয়ে যায়। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বেকারত্ব বাড়বে, সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হবে এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে।

আরেকটু সহজ করে বললে। লখো তরুণ যদি বছরের পর বছর অলস বসে থাকে, হতাশায় ডুবে থাকে, তাহলে সেই হতাশা একসময় রাস্তায় নামে। ইতিহাস বলে, দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষিত বেকারত্ব সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়ায়।

নতুন পথের খোঁজে
আমরা তরুণদের বলি, ‘পড়াশোনা করো, ভালো ভবিষ্যৎ পাবে।’ কিন্তু যে সিস্টেম তৈরি করেছি, সেটা কি সেই প্রতিশ্রুতি রাখার উপযুক্ত?

সমস্যাটা তরুণদের না। সমস্যাটা সিস্টেমের। এই সিস্টেম দশকের পর দশক ধরে গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে, কিন্তু সুযোগ তৈরি করছে না।

শিক্ষার্থীরা সনদ পাচ্ছে। কিন্তু বাজার চাইছে দক্ষতা, পরিবার চাইছে নিরাপত্তা, সমাজ চাইছে মর্যাদা। সবদিক থেকে টান পড়ছে তরুণদের ওপর এবং সে আটকে যাচ্ছে ঠিক মাঝখানে।

এই ভারটা কিছুটা সহজ করতে তরুণদের বড় একটা দল পাড়ি জমাচ্ছে প্রবাসে। কিন্তু তাও কি সহজ হয়? যাত্রাপথে প্রাণ হারান অসংখ্য মানুষ। অনেকের খোঁজ মেলে না। প্রবাসে পাড়ি দিয়েও হয়রানিতে পড়েন অনেকে।

প্রশ্ন হলো। আমরা কি তাদের জন্য একটা ভালো পরবর্তী অধ্যায় লিখতে পারব? যদি পারি, তাহলে কবে এবং কীভাবে? উৎস:ডেইলি স্টার।

 

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়