ডিপ্লোম্যাট বিশ্লেষণ: পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে, এই অঞ্চলের মুসলিম ও রোহিঙ্গারা নিজেদের ভাগ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ফিসফিস করে কথা বলেন এবং দৃষ্টি আকর্ষণ না করার চেষ্টা করেন। কারণ তারা জানেন না কখন তারা ক্ষমতাসীনদের বিরাগভাজন করে মৌলিক মানবাধিকারের দাবি হারাবেন, কিংবা সীমান্তের ওপারে বিতাড়িত হবেন।
ভারতে ক্রমবর্ধমান মুসলিম-বিরোধী অপরাধে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বসবাসকারী ২১ বছর বয়সী মোহাম্মদ রিজওয়ান ক্ষুব্ধ। এই ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র বলেন, “আমি এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্টও করতে পারি না। আগে এমন ছিল না, আমি যাকে খুশি তাকে সমালোচনা করতে পারতাম।”
জনতা পার্টি (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গে অন্যতম বিতর্কিত রাজনৈতিক লড়াইয়ে জয়লাভ করে। মোদির সমর্থকেরা একে একটি “ঐতিহাসিক” জয় বললেও ১০ কোটিরও বেশি মানুষের সীমান্তবর্তী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের ওপর এক ভিন্ন ধরনের দমনপীড়ন দানা বাঁধতে শুরু করে।
কারসাজিপূর্ণ জনরায়
সমালোচকরা বিজেপির এই বিজয়কে প্রশ্নবিদ্ধ এবং নির্বাচনী কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন। ভারতের নির্বাচন কমিশনের পরিচালিত ভোটার তালিকার একটি অত্যন্ত বিতর্কিত বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এর পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে কমিশন নকল, মৃত বা অন্য কোনোভাবে “অযোগ্য” ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি করেছিল। এই প্রক্রিয়ার সময় পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে প্রাথমিকভাবে ৯০ লাখেরও বেশি নাম চিহ্নিত করে তালিকা থেকে বাদ বা যাচাই-বাছাইয়ের আওতায় আনা হয়।
বিজেপি, মুসলিম ও খ্রিস্টানদের মতো ভারতের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে প্রকাশ্যে লক্ষ্যবস্তু করে নিজেদের পরিচিতি তৈরি করেছে। গত ছয় বছর ধরে, আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক মার্কিন কমিশন (ইউএসসিআইআরএফ) ধর্মীয় স্বাধীনতার গুরুতর লঙ্ঘনের কারণে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে ভারতকে একটি “বিশেষ উদ্বেগের দেশ” (সিপিসি) হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য ধারাবাহিকভাবে সুপারিশ করে আসছে। যদিও পররাষ্ট্র দপ্তর সেই সুপারিশটি গ্রহণ করেনি, ইউএসসিআইআরএফ তা করে চলেছে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয় তার নিজস্ব কিছু সমস্যা নিয়ে এসেছে। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন বক্তৃতায় বিজেপি নেতারা মুসলমানদের “কীট,” “উপদ্রব,” “অনুপ্রবেশকারী,” এবং “বাংলাদেশী” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তারা মুসলমানদের ভারতীয় ভূখণ্ডে লেগে থাকা জোঁকের সাথে তুলনা করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী, বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশের একটি ইতিহাস রয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে, তিনি ভারতের “১০০ কোটি [১ বিলিয়নের সমান] হিন্দুকে” গাজার মতো “সবাইকে” একটি “শিক্ষা” দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। ৫ই মে, নির্বাচনে জয়লাভের একদিন পর, অধিকারী বলেন যে তিনি তাঁকে ভোট দেওয়া “হিন্দুদের জন্য” কাজ করবেন।
পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা-ভিত্তিক সমাজকর্মী ড. জেড. আয়েশা মনে করেন যে, নির্বাচনের ফলাফল বিজেপির পক্ষে যাওয়ার আশঙ্কায় পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা শঙ্কিত ছিলেন। আয়েশা বলেন, “বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে সংখ্যালঘুদের আগে থেকেই বিদ্যমান শোচনীয় অবস্থার কারণেই মূলত এমনটা হয়েছিল। তাই, তাদের এই বিজয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে (যৌক্তিক) ভয় এবং (ন্যায্য) অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে।
নির্বাচনের পর রাজ্যে মুসলমানদের লক্ষ্য করে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য তাঁর পক্ষপাতদুষ্ট মানসিকতাকে গভীরভাবে প্রতিফলিত করে এবং এই রাজ্যের সংখ্যালঘুদের মধ্যে ন্যায্য উদ্বেগ ও ভয়ের উদ্রেক করে। রাজ্যের মুসলমানরাও এসআইআর তালিকা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন কারণ বহু বৈধ নাম তা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে যারা এখন তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম দুর্দশা ও অস্থিরতায় পড়েছেন।”
একাধিক আদালতের শুনানিতে অংশ নেওয়া এবং তাঁদের দীর্ঘদিনের আইনি দলিলের সত্যতা প্রমাণের চেষ্টা করা সত্ত্বেও, চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম ছিল না।
আঞ্চলিক গোলযোগের পুনর্মূল্যায়ন
৪ জুন, বাংলাদেশ জানায় যে তারা জোর করে দেশে লোক ঢোকানোর জন্য ভারতের একাধিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশীর মধ্যে কথিত নথিবিহীন অভিবাসন নিয়ে বিবাদকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। বিজেপি রাজ্যটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পশ্চিমবঙ্গের এই প্রতিরোধের প্রভাব বাংলাদেশে অনুভূত হয়।
২০২৬ সালের এপ্রিলে, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ঘোষণা করে যে, নদীপথে ভারতে প্রবেশে বাধা দিতে তারা বাংলাদেশ সীমান্তের নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে কুমির ও বিষধর সাপ ছাড়ছে। এরপর, মে মাসে ক্ষমতায় আসার পর অধিকারী বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্তে বেড়া দেওয়ার জন্য ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফ-কে জমি হস্তান্তরের ঘোষণা দেন।
কলকাতা-ভিত্তিক সাংবাদিক ও লেখক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য বলেন যে, ২০১৪ সালে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দলটি পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীকে তিস্তা জল চুক্তি নিষ্পত্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর জন্য দায়ী করে আসছে। এই চুক্তিটি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত আন্তঃসীমান্ত নদী বিবাদ। কিন্তু এখন বিজেপি নিজেই এই চুক্তিতে রাজি হতে পারছে না, কারণ এতে উত্তরবঙ্গে তাদের নিজেদের ভোটাররা অসন্তুষ্ট হবেন। সুভেন্দু অধিকারী সম্প্রতি বলেছেন, লোকজনকে ডিটেনশন সেন্টারে রাখার পরিবর্তে তিনি তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর পক্ষে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, “সুতরাং এই বিবৃতিগুলো থেকে বোঝা যায় যে ভারত থেকে পুশব্যাক বাড়বে। গত কয়েকদিন ধরে সীমান্তে উত্তেজনা বেড়েছে, ভারত লোকজনকে বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে এবং বাংলাদেশ তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকার করছে। অনেকেই নো-ম্যান’স ল্যান্ডে আটকা পড়েছে।”
সীমান্তবর্তী রাজ্যে বিজেপির জয় প্রসঙ্গে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সিঙ্গাপুরের (এনইউএস) ইনস্টিটিউট অফ সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের (আইএসএএস) রিসার্চ ফেলো ড. অমিত রঞ্জন বলেন, “নতুন সরকারকে বুঝতে হবে যে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশিদের নিয়ে তাদের নিত্যনৈমিত্তিক রাজনীতি ভারতের স্বার্থের ক্ষতি করতে পারে। হাসিনার প্রস্থানের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এমনিতেই তিক্ত হয়ে আছে। তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশ তাদের সম্পর্ক নতুন করে শুরু করার চেষ্টা করছে। ঢাকার নতুন ক্ষমতাধর গোষ্ঠী হাসিনার আমলের গোষ্ঠীর চেয়ে আলাদা। এমনকি দেশের বাস্তব পরিস্থিতিও ভিন্ন।”
রঞ্জন আরো বলেন, “গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়ন এবং তিস্তা পানি চুক্তি চূড়ান্তকরণ উভয়ই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে নতুন রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত দীনেশ ত্রিবেদীর ভূমিকাও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভাগ্য নির্ধারণে তাৎপর্যপূর্ণ।” বাংলাদেশে, গবেষক ও লেখক আলতাফ পারভেজ বলেছেন যে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশে জোরপূর্বক অনুপ্রবেশের কার্যকলাপকে বাংলাদেশী জনগণের চোখে অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও এমনটা আগেও ঘটেছে, মানুষ এখন লক্ষ্য করছে যে এটি পশ্চিমবঙ্গের নতুন প্রশাসনের অধীনে ঘটছে। বাংলাদেশের সুশীল সমাজ আশঙ্কা করেছিল যে, কেন্দ্রীয় পর্যায়ের মতো ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতেও বিজেপি ক্ষমতায় এলে সীমান্ত উত্তেজনা বাড়বে। সেই আশঙ্কা সত্যি প্রমাণিত হয়েছে।”
দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলো নিয়ে পারভেজের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে যে, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরার মতো বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত থাকা ভারতের বেশিরভাগ রাজ্যে বিজেপি এখন ক্ষমতায় থাকায় বাংলাদেশের নাগরিকরা আরও জটিলতার আশঙ্কা করছেন। সুতরাং, দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের আশা ম্লান হয়ে আসছে।”
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দুর্দশা
কক্সবাজার শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া এক রোহিঙ্গা শরণার্থী মুহাম্মদ আলম আরজে বলেন, “আমরা ভারতে যাওয়ার স্বপ্নও দেখতে পারি না, বিজেপি কীভাবে কাজ করে তা আমরাও জানি। এমনকি আমাদের শিবিরেও আমরা সীমান্তের উত্তেজনা অনুভব করতে পারি। এই শিবিরটি বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবির এবং এটি বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর ঢাকার চেয়ে দেড় গুণেরও বেশি জনবহুল। রোহিঙ্গারা এই শিবিরের চার দেয়ালের বাইরে একটি ভবিষ্যতের আশায় এখানে বাস করে।
কিন্তু সাব্বের কিয়াও মিন, একজন রোহিঙ্গা শরণার্থী যিনি দুই দশক ধরে ভারতে বসবাস করছেন, ভারতের আরও অংশে বিজেপির শাসনের কথা ভেবে শিউরে ওঠেন। মিন, যিনি ‘রোহিঙ্গা হিউম্যান রাইটস ইনিশিয়েটিভ’ নামে একটি মানবাধিকার সংস্থা চালান, তার শরণার্থী জীবনের অর্ধেক সময় কলকাতায় কাটিয়েছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “গত বছর ভারত যখন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সমুদ্রে ফেলে দিয়েছিল, তখন কী ঘটেছিল তা আমরা দেখেছি।
২০১৪ সাল থেকে আমরা রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও হয়রানি দেখতে পাচ্ছি, যা বিজেপি উস্কে দিচ্ছে। বাংলাদেশ আয়তনে ভারতের দশ ভাগের এক ভাগ, কিন্তু তাদের হৃদয় অনেক বড়, আমাদের দেশের মানুষ সেখানে এসবের সম্মুখীন হয় না। বিজেপি অন্যান্য দেশগুলোকেও রোহিঙ্গাদের ঘৃণা করতে উদ্বুদ্ধ করছে। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া সবাই ভারতে দেখা এই ঘৃণাই ছড়াচ্ছে।”