প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সৈয়দ জাহিদ হাসান: সামাজিক অস্থিরতা ও শিল্পীর দায়

সৈয়দ জাহিদ হাসান: একজন ‘শিল্পী’ মূলত সামাজিক যোদ্ধা। সামাজিক অন্যায়-অবিচার একজন শিল্পী তার শিল্পীসত্তার মাধ্যমে প্রতিহত করেন বলেই সমাজ শিল্পীকে শ্রদ্ধার আসনে বসিয়ে হৃদয় নিংড়ে পূজা করে। সকলের পক্ষে শিল্পী হওয়া সম্ভব নয়। কোনো শিল্পমাধ্যমে কাউকে প্রতিষ্ঠা পেতে হলে নরম বিছানায় ঘুমিয়ে নয়, দীর্ঘদিন সেই মাধ্যমে তাকে নিরলস শ্রম দিতে হয়। বিনিদ্র সাধনার মধ্য দিয়েই কেবল একজন প্রতিভাবান মানুষ শিল্পী হওয়ার অধিকার অর্জন করেন। ‘শিল্প’ সত্য ও সুন্দরের প্রতিচ্ছবি। একথা যদি সত্যি হয় তবে একজন শিল্পীকেও হতে হয় সত্যের আলোয় আলোকিত আদর্শবান মানুষ ও সৌন্দর্যের নির্মাতা।

বাংলাদেশের বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে কথাশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, চিত্রশিল্পী, কণ্ঠশিল্পীসহ অন্যান্য শিল্প মাধ্যমের প্রায় প্রত্যেকেই বর্ণনাতীত দুঃখ কষ্টের মধ্যে পরিবার-পরিজন নিয়ে দিনযাপন করছেন। মহামারী করোনার কষাঘাতে সমগ্র পৃথিবী যেখানে দিশেহারা, কিংকর্তব্যবিমূঢ়; সেই পরিস্থিতিতে শিল্পীরাও মেনে নিয়েছেন তাদের দুর্ভোগের লিখন। যে অনিবার্য সংকট কোনো একক ব্যক্তির নয় বরং সকলের, সেই সংকটে অস্থির না-হয়ে ধৈর্যধারণ করে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা করাই প্রত্যেকটি মানুষের প্রধান কর্তব্য। একজন শিল্পীকেও বৈশ্বিক সংকটে যথাসাধ্য ধৈর্য্যশীল হয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে, তার করণীয় নির্ধারণ করতে হয়।

বাংলাদেশ কাগজে কলমে উন্নত হওয়ার চেষ্টা করলেও বাস্তবে একটি গরিব দেশই বটে। এদেশে শিল্পের যতগুলো মাধ্যম আছে, সব মাধ্যমই এখন অবক্ষয়ের চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছেছে। শিল্প-সাহিত্য-নন্দনচর্চার পরিবেশ এখানে কখনোই সুস্থ ধারায় বিকশিত হয়নি। শিল্পের প্রতিটি পদক্ষেপেই এখানে রয়েছে সীমাহীন ঝুঁকি। তবু যারা এদেশের বুকে শিল্পচর্চা করে বাংলার শিল্পজগৎকে কিছুটা হলেও সম্মানজনক স্থানে উপনীত করেছেন সেই সম্মানের জায়গাটাও এখন হারিয়ে যেতে বসেছে কিছু শিল্পীনামধারী অশিল্পীর আপত্তিকর ও অশোভন আচরণে। বাংলাদেশের শিল্পজগৎ ২০০০ সালের পর থেকেই নিম্নদিকে ধাবিত হচ্ছে। এখানে এখন কবিরা বন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছেন, নাট্যকারের দ্রোহী সংলাপের পরিবর্তে শুনা যাচেছ অমার্জিত ভাঁড়ামি। শিল্পীর তুলি নত হয়ে আঁকছে পতিতার স্থূল ছবি। অভিনেতা ও অভিনেত্রীরাও অভিনয় নৈপুণ্যে দর্শকদের মনোরঞ্জন করতে না-পেরে বেছে নিচ্ছেন মাদকব্যবসা ও দেহব্যবসার ঘৃণ্য উপায়।

পত্র-পত্রিকায় দেখছি শত শত মডেল ও চিত্রনায়িকা গোয়েন্দা বাহিনীর নজরদারিতে। আমাদের সিনেমা শিল্প অনেকদিন আগে থেকেই দর্শক কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়েছে। আশির দশকে এমনকি নব্বই দশকেও এদেশের সিনেমা শিল্প বেশ গৌরবের সঙ্গে তার ভূমিকা পালন করেছে। তখন আমাদের পুঁজি ছিল অল্প, টেকনিশিয়ানরা ছিলেন যত্রপাতির সংকটে, শিল্পীরাও পেতেন উল্লেখ না করার মতো পারিশ্রমিক। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের টেলিভিশন সংক্রান্ত স্মৃতিচারণমূলক লেখাগুলো পড়লে বোঝা যায় তৎকালীন পরিস্থিতি কেমন নাজুক ছিল। কিন্তু এ কথা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, ওই সময়ের সিনেমা-নাট্য শিল্পের যা কিছু অবদান তা আমরা এই যুগে এসেও অতিক্রম করতে পারিনি।

পৃথিবীর কোনো সমাজই পরিপূর্ণ সুস্থ সমাজ নয়। বিকৃতি সব সমাজেই কম-বেশি দৃশ্যমান। একজন শিল্পী যেহেতু সামাজিক মানুষ, সুতরাং শিল্পীও কখনো কখনো বিকৃত রুচির পরিচয় দিতে পারেন। কিন্তু আজ আমাদের শিল্পজগতের বেশির ভাগ শিল্পীই সমাজবিরোধী ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত। এটা খুবই বেদনার ও নিন্দনীয় ব্যাপার। শিল্পের মূল লক্ষ্য অর্থ-উপার্জন নয়, মানবিক-বোধের চর্চা ও সেই চর্চার নির্যাস সমাজ মানসে প্রতিষ্ঠা। অর্থ-উপার্জন নানাভাবেই করা যায়। যারা মনে করেন, শিল্পী নামের তকমা লাগিয়ে যা-ইচ্ছে তা-ই করে বেড়াবেন তাদের বিরুদ্ধে। অবশ্যই সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার।

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘সংসারে যে হতভাগ্য শিশু খেলার জিনিস অপর্যাপ্ত পাইয়া থাকে তাহার খেলা মাটি হইয়া যায়।’ এ কথা বোধহয় আজ আমাদের প্রত্যেকটি ধনী শিল্পী ও শিল্পজগতের ধনী মানুষদের বেলায় প্রযোজ্য। আজ আমাদের কতিপয় শিল্পী পর্যাপ্ত অর্থ-বিত্তের মালিক হয়ে ভুলেই গেছেন, সমাজের প্রতি তাদের দায় আছে, সমাজের প্রতি তাদের অনেক কিছু করার আছে। সমাজের প্রতি যার দায় নেই, মানুষের শ্রদ্ধার প্রতি যার ভক্তি-বিশ্বাস নেই, সেই সব তথাকথিত শিল্পীদের প্রত্যাখ্যান করে তাদের মুখোশ উন্মোচন করাই বরং সবার জন্য মঙ্গল। অন্তরে উচ্চ ভাব না থাকলে শুধু গাঁজা-মদের নেশা মানুষকে অকর্মণ্য ও উ™£ান্ত করে তুলে। মাতাল হয়ে হয়তো মানুষ খুন করা যায়, কিন্তু যুদ্ধ করা যায় না। একজন শিল্পী হবেনÑ সত্য ও সুন্দরের পক্ষে শক্তিশালী যোদ্ধা। যেই যোদ্ধার নিরন্তর সংগ্রামে পৃথিবীতেই রচিত হবে স্বর্গের সুখ-শান্তি আর অনাবিল আনন্দ।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার।

সর্বাধিক পঠিত