প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ক্ষেতে ৮০ টাকার তরমুজ বাজারে ১৫০ থেকে ৬০০

ডেস্ক রিপোর্ট: কৃষকের কাছ থেকে ৮০ টাকায় মহাজন ও ব্যাপারির কেনা তরমুজ পাইকারি আড়তে বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ৩০০ টাকায়। আড়তদাররা ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ কমিশন নিয়ে বিক্রি করছেন খুচরা বিক্রেতার কাছে। পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ ধরে খুচরা বিক্রেতারা সেই তরমুজ বিক্রি করছেন ৪০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে, ১৫০ থেকে ৬০০ টাকায়। এতে পকেট কাটা যাচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের। কিন্তু এ টাকা পাচ্ছেন না কৃষক। লাভের গুড়ের পুরোটা যাচ্ছে ব্যাপারি ও মহাজনের ঘরে।

খরার কারণে গ্রীষ্ফ্মের ফল এখনও ওঠেনি। বাজারে মৌসুমি ফল বলতে আছে তরমুজ ও বাঙ্গি। রোজা ও দাবদাহের কারণে ইফতারে তরমুজের চাহিদা আকাশছোঁয়া। এ সুযোগে রোজই বাড়ছে তরমুজের দাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দামের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে চলছে নজিরবিহীন সমালোচনা। এসেছে তরমুজ বয়কটের ডাক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হচ্ছে।

এবার তরমুজের বাজার কেন এত চড়া- জানতে বুধবার দেশের তরমুজের সবচেয়ে বড় বাজার সেকশন, সোয়ারীঘাট ও বাদামতলী ঘুরে দেখা যায়, দাদন ব্যবসা ও চাহিদার তুলনায় জোগান কম থাকায় বেড়েছে তরমুজের দাম।

সেকশন বাজারের তরমুজের আড়তদার মো. লোকমান জানালেন তরমুজ ব্যবসার গোমর। তিনি  বলেন, তার আড়তে তরমুজ আসে খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের চরগুলো থেকে। ওইসব এলাকার চাষিরা ফাল্কগ্দুনের শেষ কিংবা চৈত্রের শুরুতে ক্ষেতে ফুল আসার পর মহাজনের কাছ থেকে চাষের জন্য দাদন নেন। এবার মহাজন, ব্যাপারিরা ক্ষেতে থাকা একশ তরমুজ দেড় থেকে দুই মাস আগে আট হাজার টাকা হিসাবে কিনেছেন। অর্থাৎ প্রতি তরমুজের দাম ৮০ টাকা। বাজারে যতই দাম থাক, কৃষক ৮০ টাকার বেশি পাবেন না। এক কেজি বা ১০ কেজি হোক, তরমুজপ্রতি ৮০ টাকাই পাবেন কৃষক।

আড়তদারের সঙ্গে কথা চলাকালেই খুলনা থেকে আসা একটি ট্রাক এসে থামে সেখানে। এবার শুরু হলো তরমুজ বাছাই ও আকার অনুযায়ী আলাদা করার কাজ। তিন কেজির কম ওজনের একশ তরমুজ ১২ হাজার টাকা, অর্থাৎ প্রতিটির দাম ১২০ টাকা। তিন থেকে পাঁচ কেজি ওজনের একশ তরমুজের দাম ১৮ হাজার টাকা। পাঁচ থেকে সাত কেজির একশ তরমুজ ৩০ হাজার টাকা; প্রতিটির দাম ৩০০ টাকা। সাত কেজির বেশি ওজন হলে ৩৩ হাজার টাকা। এক-দেড় কেজির কম, অর্থাৎ একেবারেই ছোট তরমুজগুলো ফেলনা। আড়তদারা তা ১০-২০ টাকা পিস বিক্রি করেন। আর যেগুলো পরিবহনের সময় ফেটে যায়, সেগুলোও বাতিল। এ লোকসান ব্যাপারির।

মো. লোকমান জানালেন, গত বছর এবং এবার মৌসুমের শুরুতে বড় আকারের একশ তরমুজ ছিল ১৫ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা। এবার তা ৩০ হাজার টাকা হয়েছে। ব্যাপারিরা যে দাম ধরেন, সে দামে আড়তদাররা তরমুজ বিক্রি করেন খুচরা বিক্রেতার কাছে। এ জন্য আড়ত মালিক ব্যাপারির কাছ থেকে ৩ থেকে ৪ শতাংশ এবং খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে ১০ শতাংশ কমিশন পান। আড়তদারের লোকসান নেই। দাম বেশি থাকলে তাদের মুনাফা বেশি। দাম কম হলে কম মুনাফা। তবে ভাড়া, শ্রমিকের বেতন মিলিয়ে মো. লোকমানের মাসে খরচ প্রায় দুই লাখ টাকা।

ট্রাকে আসা ব্যাপারির প্রতিনিধি ফরিদপুরের সদরপুরের মো. আক্কাস জানালেন, এ বছর রোজা ও গরমের কারণে তরমুজের চাহিদা বেশি। খরার কারণে তরমুজের ফলন ভালো হলেও আম, লিচুসহ অন্যান্য ফল এবারের রোজায় আসেনি। তাই তরমুজই ভরসা। ব্যাপারি ও মহাজনরা চৈত্র মাসের শুরুতে কৃষকদের কোটি টাকা ঋণ দিয়েছেন। যে কৃষক যার কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন, তার কাছেই ক্ষেতের সব তরমুজ দুই মাস আগের ধরা দামে বিক্রি করতে বাধ্য। যারা দাদন না নিয়ে নিজের টাকায় চাষ করেছেন, তাদের তরমুজ মহাজন ও ব্যাপারিরা সহজে কেনেন না। ফলে ওই কৃষকরাও দাম পান না।

বাদামতলী ঘাট থেকে ১২ হাজার ধরে একশ মাঝারি আকারের তরমুজ কেনেন খুচরা বিক্রেতা নাসির উদ্দিন। তিনি ভ্যানে মোহাম্মদপুরে এই তরমুজ বিক্রি করবেন। নাসির জানালেন, সব মিলিয়ে তার খরচ ১৪ হাজার টাকা। প্রতি তরমুজের দাম পড়েছে ১৪০ টাকা। একেকটি তরমুজ সাড়ে তিন থেকে পাঁচ কেজি। লাভ করতে তাকে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে হবে। এতে হাজার বিশেক টাকা আসার কথা। কিন্তু একশ তরমুজের মধ্যে পাঁচ-সাতটি নষ্ট বের হবে। সেগুলোর ক্ষতিপূরণ তো আড়ত দেবে না। তাই ৫০ টাকা কেজি বিক্রি করলেও খুব একটা লাভ থাকবে না। অথচ গত মাসেই একশ বড় তরমুজ কিনেছেন ১৫ হাজার টাকায়। তখন বিক্রিও বেশি ছিল, লাভও ছিল ভালো।

তবে ক্রেতারা তরমুজের দামের ঊর্ধ্বগতিতে ক্ষিপ্ত। সেকশনের আড়ত থেকে ৫০ গজ দূরে খুচরা বাজারে ছোট তরমুজ ২৫০ এবং মাঝারি তরমুজ ‘এক দরে’ বিক্রি হচ্ছিল। বিক্রেতা উত্তর দিলেন না- ৫০ গজের ব্যবধানে দামের এত পার্থক্য কেন? ভিড় করে থাকা ক্রেতাদের একজন ম্যাটাডোর কোম্পানির কর্মী গোলাম রাব্বানী বললেন, যা ইচ্ছা তাই করা হচ্ছে। ৬০ টাকা কেজি চাইছে! এটা কোনো কথা? কেউ কি দেখবে না?

তরমুজের দাম স্থিতিশীল রাখতে গতকালও দেশের বিভিন্ন স্থানে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালিয়েছে।

সিলেট ব্যুরো জানায়, পিস হিসাবে কিনে ওজন করে বিক্রি করায় সিলেটের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে ৩৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। কদমতলীর ফলের আড়তে চারটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মূল্য তালিকা না থাকা, অতিরিক্ত দামে বিক্রির কারণে ১৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। নগরীর উপশহরে চেইনশপ ‘স্বপ্ন’র আউটলেটে প্রতি কেজি তরমুজ ৬৮ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছিল।

অভিযান পরিচালনা করেন ভোক্তা অধিকারের সহকারী পরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম ও শ্যামল পুরকায়স্থ। তারা জানান, একেকটি তরমুজ ৩০০ টাকা লাভে বিক্রি করা হচ্ছিল। পিস হিসাবে কিনে কেজি দরে বিক্রি করায় ‘স্বপ্ন’কে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, পিস হিসাবে পণ্য কিনে কেজি দরে বিক্রি দণ্ডনীয় অপরাধ। সূত্র: সমকাল

সর্বাধিক পঠিত