প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সরোজ মেহেদী : বিসিএসের জন্য স্নাতক কেন শর্ত!

সরোজ মেহেদী : স্নাতক পাসের সঙ্গে বিসিএসের সম্পর্ক কোথায়? বিসিএস দিয়ে যদি বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্সের মেধাবী শিক্ষার্থী পুলিশ বনে যায় তাহলে এ পাঁচ বছর সে কেন এতো কষ্ট করে পড়ল? রাষ্ট্র কেন তার পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করল? মেডিকেল পড়ুয়া দেশের সবচেয়ে মেধাবী একজন তরুণের পেছনে রাষ্ট্র এতো টাকা খরচ করে কী সে বিসিএস দিয়ে এসি ল্যাণ্ড হবে বলে। আমাদের দেশে উচ্চমাধ্যমিক ও মাধ্যমিকের পাঠ্যক্রম থেকে বিশ^বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম কোন দিক দিয়ে আলাদা? কেন আলাদা? লেখাটা শুরু করলাম দুটি প্রশ্ন দিয়ে। বিশ^বিদ্যালয়ে পড়তে এসে বা পড়া শেষে এমন হাজারো প্রশ্ন হাজারো শিক্ষার্থীর মাথায় ঘুরপাক খায় বলেই মনে হয় আমার। হয়তো মুখ ফোটে করা হয় না, বা করার সুযোগ দেওয়া হয় না। কিন্তু চুপ থাকলেই কী কাজের কাজ কিছু হয় বা সমস্যার সমাধান নীরবে দুয়ারে এসে কড়া নাড়ে? গত চার দশকে এসেছে কি? দেশীয় বিশ^বিদ্যালয়গুলোর মান কি বাড়ছে? বা বাড়ার কোনো সম্ভাবনা কি দেখা যাচ্ছে?

বিশ^বিদ্যালয় নামক শিক্ষার যে চর্চা একজন তরুণের জীবন থেকে ৫ থেকে ৭ কিংবা ৮ বছরের একটি সোনালি অধ্যায় কেড়ে নেয়, বিনিময়ে তাকে আসলে কী দেয়? একটা সার্টিফিকেট, কিছু গর্ব আর ছলাকলাময় অভিনয়ে নিজেকে সুখী দেখানোর আনাড়ি বালখিল্যতা। এর বাইরে বিশেষ আর কি? মানবিকতা, মনুষত্ব্যবোধ। এমন কোনো দক্ষতা বা বিশেষ জ্ঞান কী আছে যা দিয়ে সে সারাজীবন কলেজ পড়ুয়া একজন থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে? এ দেশের একটি বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা আমারও আছে। দেশের বাকি বিশ^বিদ্যালয়গুলো যদি সে বিশ^বিদ্যালয় থেকে একেবারে ভিন্ন না হয়ে থাকে তাহলে পাঁচ-ছয় বছর পড়াশোনা শেষে একজন শিক্ষার্থীর অদক্ষই থেকে যাওয়ার কথা। আমিও অদক্ষই আছি। কলা, সমাজবিজ্ঞান প্রভৃতি অনুষদে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের কমবেশি একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়ার কথা। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা কী ভিন্ন রকম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বিশ^বিদ্যালয় জীবন শেষ করে? আমরা বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর পড়া মুখস্থ করি, পরীক্ষা দিই, পাস করি। যেমনটা স্কুলে করতাম, কলেজে করেছি। শিক্ষকরা পড়ান, সাজেশন দেন।

বিশ^বিদ্যালয় পাস করতে করতে আমরা স্কুলে ও কলেজে যা মুখস্থ করেছিলাম, তা ভুলে যাই। পাস দিয়ে আবার সেসব পড়া শুরু করি। সেই স্কুলে যা পড়েছি, কলেজে যা পড়েছিলাম। কারণ এবার বিসিএস মহাযজ্ঞের পালা। বিশ^বিদ্যালয়ের সঙ্গে বিসিএস পরীক্ষার একটা পার্থক্য হলো, বিসিএসে আবার স্কুল, কলেজের পড়ায় ফিরে যেতে হয়। বিশ^বিদ্যালয়ের পড়া মুখস্থ করতে করতে সেসব মুখস্থ বিদ্যা ভুলে বসে অধিকাংশ শিক্ষার্থী। তারপর আবার চলে সেই ভুলে যাওয়া বা ভুলতে বসা বিদ্যাকে ঝালাই করার পালা। এভাবেই আমরা খুঁজে নিই, আমাদের দেশটা পরিচালনার জন্য, আমাদের দেশকে বিশ^ দরবারে তুলে ধরার জন্য যোগ্য ও দক্ষ আমলা। তাদের নানা সুযোগ-সুবিধা দিই। এতেই আমরা খুশি। কিন্তু কেউ কখনো প্রশ্ন তুলি না, এটা কোন পদ্ধতি যেখানে লর্ড ক্লাইভের প্রথম বউয়ের নাম মুখস্থ রেখে নিজেকে মেধাবী প্রমাণ করতে হয়। ক্লাইভের বউয়ের সঙ্গে একজন শিক্ষার্থীর মেধার সম্পর্কটা কোথায়। একটি দেশ পরিচালনায় এ মেধা কোথায় খরচ হয়।

শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের যদি চাকরির জন্য সেই স্কুলের সিলেবাসে ফিরে যেতে হয় তাহলে বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষার মাহাত্ম্য কোথায়? এ শিক্ষা কি তাহলে চাকরি জীবনে অচল? যদি অচল না হয় তাহলে কেন বিসিএস-সহ বিভিন্ন চাকরি পরীক্ষায় বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষা কোনো কাজে লাগে না। যদি কাজে না লাগে তাহলে বিসিএস দেওয়ার শর্ত হিসেবে বিশ^বিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস কেন থাকবে? স্নাতক পাসের সঙ্গে বিসিএসের সম্পর্ক কোথায়? বিসিএস দিয়ে যদি বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্সের মেধাবী শিক্ষার্থী পুলিশ বনে যায় তাহলে এ পাঁচ বছর সে কেন এতো কষ্ট করে পড়ল? রাষ্ট্র কেন তার পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করল? মেডিকেল পড়ুয়া দেশের সবচেয়ে মেধাবী একজন তরুণের পেছনে রাষ্ট্র এতো টাকা খরচ করে কী সে বিসিএস দিয়ে এসি ল্যাণ্ড হবে বলে। এই যে এতো বছর পড়িমরি করে সে দক্ষতা অর্জন করল সেই দক্ষতা তাহলে কাজ লাগল কোথায়? নাকি আমাদের বিশ^বিদ্যালয়গুলো একেবারেই ব্যর্থ দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে? এর চেয়ে এমন ভাবনা কী অধিক গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, বিসিএসের জন্য স্নাতক পাসের শর্ত তুলে দেওয়া হোক। পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর হওয়ার জন্য স্নাতক পর্যন্ত অপেক্ষার কোনো মানে হয় না। আমি জানি অনেকেই হয়তো বলবেন, এইচএসসির বাচ্চা ছেলে-মেয়ে বিসিএস ক্যাডার হয়ে চাপ সামলাতে পারবে না। ঠিকঠাক মতো কাজ হবে না। রাষ্ট্রে অস্থিরতা ও অচলাবস্থা দেখা দেবে। তাদের সবিনয়ে একটা প্রশ্ন করি।

এখন যারা অনার্স শেষ করে, বই মুখস্থ করতে করতে বয়স ৩০ পার করে, আমার মতো আধা বুড়ো হয়ে, বিসিএস ক্যাডার হয়ে আমলা সেজে বসে আছেন, তারা কি দেশটা ঠিকঠাকমতো চালাতে পারছেন? আমাদের কোনো কিছুই কী আসলে ঠিকমতো চলছে? আমার বিশ^াস, বিশেষায়িত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে এই ছোট ছোট বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলোই তাদের পূর্বসূরিদের চেয়ে অনেক ভালোভাবে অর্পিত দায়িত্ব সামলাবে। তাহলে আর পাঁচ বছর ধরে এমবিবিএস পড়া একজনকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজ করতে হবে না, রসায়নের ছাত্রকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ফাইল সামলানোর দৃশ্য দেখতে হবে না। এ ক্ষেত্রে আমরা সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা নিয়োগ প্রক্রিয়াকে উদাহরণ হিসেবে নিতে পারি। এইচএসসি পাস করার পর একজন শিক্ষার্থী একই সঙ্গে বিশ^বিদ্যালয় ও বিসিএস ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হবে। ভর্তি পরীক্ষা নিতে হবে খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে। যেন তাদের নতুন করে প্রস্তুতি নিতে না হয়। এতে একদিকে যেমন কোচিং-বাণিজ্যের লাগামে টান পড়বে, অন্যদিকে কমে আসবে নষ্ট প্রতিযোগিতা। হয় না। ফ্রেশার নিলেও বেতন দেওয়া হয় না।’ এমনটা করা গেলে আর কিছু না হোক, কয়েক বছরের ব্যবধানে দেশ পেতে শুরু করবে যোগ্য আমলা ও দক্ষ জনশক্তি। ঈষৎ সংক্ষেপিত। পুরো লেখাটি পড়ুন সারাক্ষণ ডটকমে। লেখক : বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষক ও মিডিয়া বিশ্লেষক, সম্পাদক- মেরহাবা ।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত