মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যেগুলোকে আমরা ‘তুচ্ছ’ মনে করি— একটি কলম, সামান্য কাগজ, চার্জার, সুই, কাঠি, এক চিমটি লবন, চিনি, এক গ্লাস পানি কিংবা সামান্য সময়; কিন্তু ইসলাম কোনো বিষয়কেই তুচ্ছভাবে দেখে না, যদি তা অন্যের অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। ইসলামে সম্পদের হেফাজত ও মালিকানার অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রশ্ন ওঠে— অন্যের খুব ছোট জিনিস হলেও কি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বৈধ?
১. অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ নিষিদ্ধ
ইসলামের মৌলিক নীতি হলো— অনুমতি ছাড়া অন্যের যত ক্ষুদ্র জিনিসই হোক না কেন, তা অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা কিছুতেই বৈধ নয়। আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্টভাবে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন— চাই বড় হোক কিংবা ছোট। আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না; তবে পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে হলে ভিন্ন কথা।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ২৯)
এ আয়াত প্রমাণ করে যে— মালের মালিকের অনুমতি ছাড়া কোনো সম্পদ ব্যবহার বা গ্রহণ বৈধ নয়, তা যত সামান্যই হোক।
২. অতি ক্ষুদ্র জিনিসও আত্মসাৎ করা হারাম
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুস্পষ্ট নির্দেশ হলো— রাসুলুল্লাহ (সা.) ক্ষুদ্র জিনিস চুরির ক্ষেত্রেও কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَعَنَ اللَّهُ السَّارِقَ يَسْرِقُ الْبَيْضَةَ فَتُقْطَعُ يَدُهُ، وَيَسْرِقُ الْحَبْلَ فَتُقْطَعُ يَدُهُ
‘আল্লাহ চোরকে অভিশাপ দিয়েছেন— সে একটি ডিম চুরি করে, ফলে তার হাত কাটা হয়; অথবা একটি দড়ি চুরি করে, ফলে তার হাত কাটা হয়।’ (বুখারি ৬৭৮৩, মুসলিম ১৬৮৭)
এ হাদিসের দিকনির্দেশনা ও শিক্ষা হলো— জিনিস ছোট বলে তা হালাল হয়ে যায় না। বরং চুরি নামক গুনাহের গুরুত্ব এখানেই তুলে ধরা হয়েছে।
৩. মুসলমানের সম্পদ তার সম্মান
অন্যের জিনিস অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা তার সম্মান ক্ষুণ্ন করার শামিল। হাদিসে পাকে এসেছে—
كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ: دَمُهُ، وَمَالُهُ، وَعِرْضُهُ
‘এক মুসলমানের জন্য আরেক মুসলমানের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান হারাম।’ (মুসলিম ৬৩০৯)
এ হাদিস স্পষ্ট করে দেয়— অন্যের মাল (সম্পদ) হালকাভাবে নেওয়া বা ব্যবহার করা ইসলামে অনুমোদিত নয়।
৪. আনন্দচিত্তে অনুমতি ছাড়া নেওয়াও নিষিদ্ধ
সম্মতি হতে হবে ‘طيب نفس তথা স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি’। শুধু নীরবতা বা অনুমান সম্মতির শামিল নয়। হাদিসে পাকে এসেছে—
لَا يَحِلُّ مَالُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ إِلَّا بِطِيبِ نَفْسٍ مِنْهُ
‘কোনো মুসলমানের সম্পদ তার অন্তরের সন্তুষ্টি ছাড়া হালাল নয়।’ (মুসনাদ আহমাদ ২০১৭২)
৫. আমানতের খেয়ানতও গুনাহ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ
‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও রাসুলের সঙ্গে খেয়ানত করো না এবং তোমাদের আমানতের সঙ্গেও খেয়ানত করো না।’ (সুরা আল-আনফাল: আয়াত ২৭)
৬. জাররা (অণু) পরিমাণ ভালো ও মন্দ কাজ
আল্লাহ তাআলা কুরআনের এই আয়াত সুস্পষ্ট করে দেন যে— আল্লাহর কাছে কোনো কাজই তুচ্ছ নয়; ভালো হোক বা মন্দ। আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের বিচার সম্পর্কে বলেন—
فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُۥ وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُۥ
‘অতঃপর যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ ভালো কাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে। আর যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে, সেও তা দেখতে পাবে।’ (সুরা আল-যিলযাল: আয়াত ৭–৮)
৭. আল্লাহর কাছে জাররা পরিমাণও ন্যায়ভিত্তিক বিচার হয়
إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ ۖ وَإِنْ تَكُ حَسَنَةً يُضَاعِفْهَا
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ অণু পরিমাণও জুলুম করেন না; আর যদি তা ভালো কাজ হয়, তিনি তা বহু গুণে বাড়িয়ে দেন।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৪০)
৮. নেক ও গুনাহের হিসাব: নিয়তসহ লিপিবদ্ধ হয়
নেক ও গুনাহ সম্পর্কিত একটি হাদিস আল্লাহর রহমতের বিস্ময়কর প্রকাশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الْحَسَنَاتِ وَالسَّيِّئَاتِ ثُمَّ بَيَّنَ ذَٰلِكَ
এরপর তিনি বিস্তারিত বলেন—
فَمَنْ هَمَّ بِحَسَنَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْهَا كَتَبَهَا اللَّهُ عِنْدَهُ حَسَنَةً كَامِلَةً، وَإِنْ هَمَّ بِهَا فَعَمِلَهَا كَتَبَهَا اللَّهُ عَشْرَ حَسَنَاتٍ إِلَىٰ سَبْعِمِائَةِ ضِعْفٍ إِلَىٰ أَضْعَافٍ كَثِيرَةٍ، وَإِنْ هَمَّ بِسَيِّئَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْهَا كَتَبَهَا اللَّهُ عِنْدَهُ حَسَنَةً كَامِلَةً، وَإِنْ هَمَّ بِهَا فَعَمِلَهَا كَتَبَهَا اللَّهُ سَيِّئَةً وَاحِدَةً
“আল্লাহ নেক ও গুনাহ লিখে রেখেছেন। কেউ নেক কাজের ইচ্ছা করে কিন্তু না করলে একটি পূর্ণ নেকি লেখা হয়। করলে ১০ থেকে ৭০০ গুণ বা তারও বেশি লেখা হয়। আর কেউ গুনাহের ইচ্ছা করে না করলে একটি নেকি লেখা হয়; আর করলে মাত্র একটি গুনাহ লেখা হয়।’ (মুসলিম ২৩৮ ইফা)
৯. হজরত ঈসা (আ.)-এর একটি সুন্দর ঘটনা
কারও জিনিস অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করাও আমানতের খেয়ানতের অন্তর্ভুক্ত। এ সম্পর্কে একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা রয়েছে; তাহলো—
একদিন হজরত ঈসা (আ.) একটি কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি আল্লাহর হুকুমে কবরের এক মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করলেন। লোকটি কবরের মাটি ঝেড়ে উঠে দাঁড়াল।
হজরত ঈসা (আ.)-এর অন্যতম প্রধান মুজেজা (অলৌকিক ক্ষমতা) ছিল, তিনি মহান আল্লাহর হুকুমে মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করতে পারতেন।
হযরত ঈসা (আ.) ওই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘দুনিয়াতে তোমার কাজ কী ছিল?’
লোকটি উত্তর দিল, ‘হে আল্লাহর নবী! আমি একজন কুলি ছিলাম। মানুষের বোঝা মাথায় বহন করতাম এবং তা দিয়েই জীবিকা নির্বাহ করতাম। আমার জীবনটি খুব সাধারণ ছিল।’
এবার হজরত ঈসা (আ.) জিজ্ঞাসা করলেন— ‘তবে তোমার কবরের অবস্থা কী? তোমার হিসাব-নিকাশ কেমন চলছে?’
লোকটি কাঁদতে কাঁদতে বলল— ‘একবার আমি এক ব্যক্তির এক বোঝা লাকড়ি (জ্বালানি কাঠ) মাথায় করে তার বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছিলাম। পথিমধ্যে আমার দাঁতের ফাঁকে কিছু একটা আটকে গিয়েছিল। আমি মালিকের অজান্তেই সেই লাকড়ির বোঝা থেকে একটি ছোট্ট কাঠি (খিলাল হিসেবে ব্যবহারের জন্য) ভেঙে নিলাম এবং তা দিয়ে দাঁত খিলাল করলাম।
এরপর যখন আমার মৃত্যু হলো, আল্লাহ তাআলা আমাকে বললেন— 'হে আমার বান্দা! তুমি কি জানতে না যে আমি তোমাকে আজ এই হিসাবের কাঠগড়ায় দাঁড় করাব? অমুক ব্যক্তি তার টাকা দিয়ে কাঠ কিনেছিল এবং তোমাকে মজুরি দিয়েছিল তা বয়ে নেওয়ার জন্য। তুমি সেই মালিকের অনুমতি ছাড়া কেন একটি কাঠি ভেঙে নিলে?’
হে আল্লাহর নবী, আল্লাহর কসম! আমি আজ ৪০ বছর ধরে এই একটিমাত্র খড়কুটোর হিসাব দিয়ে যাচ্ছি কিন্তু আজও মুক্তি পাইনি! দয়া করে আপনি আমার জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করুন।’
ভাবুন— আমরা অনেক সময় অন্যের অতি ক্ষুদ্র জিনিস অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করি। আমরা একে খুব তুচ্ছ মনে করি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আল্লাহর কাছে ‘আমানত’ অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। অন্যের হক যদি একটি খড়কুটোর সমপরিমাণও হয়, তবুও পরকালে তার কড়ায়-গণ্ডায় হিসাব দিতে হবে। সূত্র: আয যাহরুল ফাইহ; ইমাম ইবনুল জাওযি (রহ.)।
১০. ক্ষুদ্র মন্দ কাজ থেকেও সতর্কবার্তা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِيَّاكُمْ وَمُحَقَّرَاتِ الذُّنُوبِ، فَإِنَّهَا تَجْتَمِعُ عَلَى الرَّجُلِ حَتَّى تُهْلِكَهُ
‘ছোট ছোট গুনাহ থেকে সতর্ক থেকো; কারণ এগুলো একত্র হয়ে মানুষকে ধ্বংস করে দেয়।’ (মুসনাদ আহমাদ ২২৩৪৬)
১১. আল্লাহর কাছে জাররা পরিমাণও ন্যায়ভিত্তিক বিচার হয়
إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ ۖ وَإِنْ تَكُ حَسَنَةً يُضَاعِفْهَا
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ অণু পরিমাণও জুলুম করেন না; আর যদি তা ভালো কাজ হয়, তিনি তা বহু গুণে বাড়িয়ে দেন।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৪০)
ব্যতিক্রম: কখন অনুমতি ছাড়াই ব্যবহার করা বৈধ?
ইসলাম সীমিত বিষয়ে কিছু ব্যতিক্রম রেখেছে—
এই ক্ষেত্রেও পরে জানানো ও সম্ভব হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া উত্তম।
কুরআন ও হাদিস আমাদের সুস্পষ্ট শিক্ষা দেয়—জাররা পরিমাণ ভালো বা মন্দ কাজও আল্লাহর দৃষ্টিতে অবহেলিত নয়। মানুষের চোখে ছোট মনে হলেও, আখিরাতে তা পাহাড়সম হতে পারে। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে অন্যের সম্পদের পরিমাণ নয়, অধিকারই মুখ্য। একটি সূঁচ, একটি কলম কিংবা সামান্য সময়— সবই মালিকের অনুমতির সঙ্গে সম্পর্কিত। অনুমতি ছাড়া ক্ষুদ্র জিনিস ব্যবহার করাও গুনাহ হতে পারে। তাই একজন মুমিনের উচিত—
কারণ কিয়ামতের ময়দানে একটিমাত্র “জাররা” আমাদের নাজাত বা ধ্বংসের কারণ হতে পারে। আর এ চিন্তা চেতনা থেকেই সমাজে ন্যায়, আমানতদারি ও তাকওয়ার সংস্কৃতি গড়ে ওঠা জরুরি।
সূত্র: যুগান্তর