মুতাররিফ বিন মুসআব (রহ.) বলেন, একদিন আমি খলিফা মানসুরের কাছে গেলাম। দেখলাম তিনি অত্যন্ত বিষণ্ণ ও শোকাতুর হয়ে বসে আছেন। তার কোনো এক প্রিয়জনকে হারানোর শোকে তিনি কথা বলাও বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তিনি আমাকে বললেন— মুতাররিফ! আমি এমন দুশ্চিন্তায় পড়েছি যা আল্লাহ ছাড়া কেউ দূর করতে পারবে না। তোমার কি এমন কোনো দোয়ার কথা জানা আছে যা পড়লে আল্লাহ আমার এই অস্থিরতা দূর করবেন?
মুতাররিফ (রহ.) বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন! আমি আপনাকে বসরা শহরের এক ব্যক্তির ঘটনা শোনাই। সেই লোকটির কানে একটি মশা ঢুকে একদম ভেতর পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। ব্যথায় সে ছটফট করছিল এবং কিছুতেই ঘুমাতে পারছিল না। তখন তাকে এক ব্যক্তি পরামর্শ দিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবি হজরত আলা ইবনুল হাদরামি (রা.)-এর সেই দোয়ার মাধ্যমে প্রার্থনা করতে, যে দোয়ার বরকতে আল্লাহ তাকে মরুভূমি ও সমুদ্রে রক্ষা করেছিলেন।
খলিফা মানসুর কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন— সেই দোয়াটি কী?
তখন মুতাররিফ (রহ.) বললেন, অসম্ভবকে সম্ভব করার সেই দোয়া হলো—
يَا حَلِيمُ يَا عَلِيمُ يَا عَلِيُّ يَا عَظِيمُ
উচ্চারণ: ইয়া হালিমু, ইয়া আলিমু, ইয়া আলিয়্যু, ইয়া আজিমু।
অর্থ: হে পরম সহনশীল, হে সর্বজ্ঞ, হে সর্বোচ্চ মর্যাদাশীল, হে মহান।
এই দোয়াটি মূলত আল্লাহ তাআলার চারটি মহিমান্বিত আসমা উল হুসনা (সুন্দর নাম) দ্বারা তাকে ডাকার একটি জিকির। কুরআনে আল্লাহ বলেন—
وَلِلّٰهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَىٰ فَادْعُوهُ بِهَا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম; সেগুলোর মাধ্যমে তোমরা তাঁকে ডাকো। (সুরা আল-আরাফ: আয়াত ১৮০)
কেন এটি অসম্ভবকে সম্ভব করার দোয়া
কঠিন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ও প্রশান্তির জন্য
গুনাহের পর আল্লাহর হিলম (সহনশীলতা) কামনায়
জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য
আল্লাহর মহত্ত্ব স্মরণ করে বিনয়ী হওয়ার জন্য
বিশেষ করে বিপদ, মানসিক চাপ, ভয় বা অনিশ্চয়তার সময়ে এই জিকির হৃদয়ে প্রশান্তি আনে— কারণ এতে আল্লাহর সহনশীলতা, জ্ঞান, উচ্চতা ও মহিমা একসাথে স্মরণ করা হয়।
সাহাবি হজরত আলা ইবনুল হাদরামি (রা.)-এর সেই ঘটনাটি কী?
‘হযরত আলা ইবনুল হাদরামি (রা.) একবার বাহরাইন অভিযানের সময় বিশাল এক মরুভূমি পাড়ি দিচ্ছিলেন। সাথে ছিল তাঁর ৪০০০ সৈন্যের বাহিনী। পথে তারা প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লেন এবং পানির অভাবে সবার মৃত্যুর উপক্রম হলো। তখন তিনি দুই রাকাত নামাজ পড়ে হাত তুলে এই দোয়াটি করলেন—
يَا حَلِيمُ يَا عَلِيمُ يَا عَلِيُّ يَا عَظِيمُ
উচ্চারণ: ‘ইয়া হালিমু, ইয়া আলিমু, ইয়া আলিয়্যু, ইয়া আজিমু।’
অর্থ: ‘হে পরম সহনশীল, হে সর্বজ্ঞ, হে সর্বোচ্চ মর্যাদাশীল, হে মহান।’
আমাদের তৃষ্ণা মেটান
দোয়া শেষ হতে না হতেই পাখির ডানার মতো একখণ্ড মেঘ উড়ে এল এবং প্রবল বৃষ্টি শুরু হলো। তারা নিজেদের সব পাত্র ও মশক পূর্ণ করে নিলেন।
এরপর তারা একটি উপসাগরের পাড়ে পৌঁছালেন। সেখানে পার হওয়ার মতো কোনো নৌকা ছিল না। তিনি আবারও দুই রাকাত নামাজ পড়ে দোয়া করলেন—
يَا حَلِيمُ يَا عَلِيمُ يَا عَلِيُّ يَا عَظِيمُ
উচ্চারণ: ‘ইয়া হালিমু, ইয়া আলিমু, ইয়া আলিয়্যু, ইয়া আজিমু।’
অর্থ: ‘হে পরম সহনশীল, হে সর্বজ্ঞ, হে সর্বোচ্চ মর্যাদাশীল, হে মহান।’
আমাদের নদী পার করে দিন
এরপর তিনি তার ঘোড়ার লাগাম ধরলেন এবং বাহিনীকে বললেন, ‘বিসমিল্লাহ বলে পার হও!’
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি, আমরা ৪০০০ অশ্বারোহী সৈন্য সেই সমুদ্রের ওপর দিয়ে হেঁটে গেলাম! আমাদের ঘোড়ার খুর কিংবা আমাদের পা কিছুই ভিজেনি!’
মুতাররিফ রহ. বলেন, ‘সেই বসরার লোকটিও যখন এই দোয়াটি পড়ল, সঙ্গে সঙ্গে তার কান থেকে এক ধরনের গুণগুণ শব্দ করে মশাটি বেরিয়ে এলো এবং সে সুস্থ হয়ে গেল।’
এ ঘটনা শোনার পর খলিফা মানসুর সঙ্গে সঙ্গে কিবলামুখী হয়ে বসে পড়লেন এবং একাগ্রচিত্তে এই ৪টি শব্দ দিয়ে দোয়া করতে লাগলেন—
يَا حَلِيمُ يَا عَلِيمُ يَا عَلِيُّ يَا عَظِيمُ
উচ্চারণ: ‘ইয়া হালিমু, ইয়া আলিমু, ইয়া আলিয়্যু, ইয়া আজিমু।’
অর্থ: ‘হে পরম সহনশীল, হে সর্বজ্ঞ, হে সর্বোচ্চ মর্যাদাশীল, হে মহান।’
কিছুক্ষণ পর তিনি মুতাররিফ (রহ.)-এর দিকে হাসিমুখে ফিরে তাকালেন এবং বললেন— ‘হে মুতাররিফ! আল্লাহর শুকরিয়া, আমার হৃদয়ের সমস্ত অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা এক নিমিষেই দূর হয়ে গেছে।’
আল্লাহর এই চারটি গুণবাচক নাম (পরম সহনশীল, সর্বজ্ঞাত, সমুন্নত ও সুমহান) অত্যন্ত শক্তিশালী। যখন কোনো বান্দা পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে এই নামে আল্লাহকে ডাকে, তখন অসম্ভব বিষয়ও সম্ভবে পরিণত হতে সময় লাগে না। (সূত্র: মিন আজাইবিদ দুআ,আদ দুআউল মাসুর ওয়া আদাবুহু)
সূত্র: যুগান্তর