প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘যশোর রোডের গাছগুলোর বিস্তৃতি গোটা সুন্দরবনের এক চতুর্থাংশ’

ডেস্ক রিপোর্ট : যশোর শহর থেকে বেনাপোল পর্যন্ত সড়কের দৈর্ঘ্য ৩৮ কিলোমিটার। এই সড়কের দুই পাশে প্রায় আড়াই হাজার গাছ রয়েছে। এর মধ্যে শতবর্ষী গাছ রয়েছে কয়েকশ’। এগুলো ছাতার মতো আচ্ছাদিত করে রেখেছে সড়ক ও এর পাশের বেশ কিছু জায়গা। ডালপালা ছড়িয়ে থাকা এই গাছগুলোর বিস্তৃতি গোটা সুন্দরবনের প্রায় এক চতুর্থাংশ। স্থানীয়রা বলছেন, এ গাছগুলোর সঙ্গে ঐতিহাসিক অনেক ঘটনার স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ উপকারিতা ছাড়া এ গাছগুলোর সাংস্কৃতিক মূল্যও অনেক, যার সঙ্গে তাদের (স্থানীয়) আবেগ জড়িত। একই কথা জানিয়ে পরিবেশ বিজ্ঞানী ও পরিবেশবাদীরা বলছেন, এ গাছগুলো না থাকলে যশোর শহরের ভূ-গর্ভস্থ পানির রিজার্ভ ও মাইক্রো-অর্গানিজম নষ্ট হবে। সেজন্য এ গাছগুলো কাটা ঠিক হবে না।

রাস্তার উন্নয়ন কাজের কারণ দেখিয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবহনকারী যশোর রোডের ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী গাছ কেটে ফেলার সিদ্ধান্তে এসব কথা জানিয়েছেন যশোর শহরের বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীরা।

তবে জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, চলতি বছরেই যশোরে দু’টি অর্থনৈতিক জোন গড়ে তোলা হচ্ছে। ২০১৯ সাল থেকে মংলাবন্দরে ভারতীয় জাহাজ থেকে মালামাল লোড-আনলোড কার্যক্রম শুরু হবে। এক্ষেত্রে এই সড়কে প্রতিদিন শত শত ট্রাক চলাচল করবে। সেকারণে এ গাছগুলো কেটে রাস্তার উন্নয়নটা জরুরি।

যশোর-বেনাপোল সড়কের মালঞ্চী এলাকার বাসিন্দা বজলুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সড়ক প্রশস্ত করা যেমন জরুরি, তেমনি গাছগুলোর রক্ষণাবেক্ষণও প্রয়োজন। গাছগুলো রেখে প্রকৌশলীরা ঠিক করুক, রাস্তা কীভাবে ৪ বা ৬ লেন করা যায়।’

পরিবেশবাদী এমআর খায়রুল উমাম বলেন, ‘আমরা বলি, ঐতিহ্যবাহী যশোর রোড। আর এই ঐতিহ্য ধরে রাখার দায়িত্ব জনগণের। সরকার উন্নয়ন করে, ঐতিহ্য রক্ষা করে না। ঐতিহ্য বিনষ্টের ধারাবাহিকতায় আমরা ইতোমধ্যে যশোর জিলা স্কুল, যশোরের রেজিস্ট্রি অফিস হারিয়েছি। এই সড়কের গাছ আমাদের ঐতিহ্য; এগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও আমাদের।’ পরিবেশ নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে গাছ কাটার সিদ্ধান্ত বন্ধ করার আহ্বানও জানান তিনি।

গাছ রক্ষার দাবিতে আন্দোলন করছেন কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলন-সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবীর জাহিদ। তিনি বলেন, ‘এই সড়কের ২ হাজার ৩৩২টি গাছ কেটে ফোর লেন করার যুক্তি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। যারা এই সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহ দেখাচ্ছেন, তাদের বিশেষ কোনও মতলব রয়েছে। গাছ কাটার এই সিদ্ধান্ত কেবল পরিবেশবিরোধী নয়, গণবিরোধীও।’ তিনি গাছগুলো রেখে সড়ক প্রশস্তকরণের দাবি জানান।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের সহ-অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘কোনও অবস্থাতেই এতগুলো গাছ কাটা যাবে না। হয়ত গাছ থাকার ট্র্যাডিশনাল কোনও ভ্যালু নেই। কিন্তু গাছ আমাদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে নানা উপকার করে থাকে। সরাসরি লাভ হচ্ছে, আমরা গাছ থেকে কাঠ, পাতা, জ্বালানি, ঘরের ছাউনি ইত্যাদি পাই। পরোক্ষ লাভ হচ্ছে, যেখানে গাছ বেশি সেখানে ভূ-গর্ভস্থ পানি রিজার্ভ হয়। ভাঙনপ্রবণ এলাকায় গাছ বাঁধের কাজ করে। গাছের নিচে অনেক মাইক্রো-অর্গানিজম বসবাস করে। পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্য গাছ থাকাটা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনে গাছ বিশাল ভূমিকা রাখে। যশোর রোডের গাছের কালচারাল একটা ভ্যালুও রয়েছে। যেমন ধরেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গর্ব করে বলতে পারি, আমাদের সুন্দরবন আছে, সেখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে। যশোর রোডের গাছগুলোর জন্য এ নিয়েও আমাদের গর্ববোধ রয়েছে।’

শার্শা উপজেলার সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন বলেন, ‘রাস্তার ধারে যে গাছগুলো রয়েছে, এগুলোর অনেক বয়স হয়েছে। জীর্ণ-শীর্ণ গাছ ভেঙে পড়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হয় মানুষ। সেকারণে এগুলো কেটে রাস্তা ৬ লেন করা উচিৎ।’

শার্শা উপজেলা পরিষদের ভাইস-চেয়ারম্যান মেহেদি হাসান বলেন, ‘ভারতের বনগাঁ-চাকদহ সড়ক চার লেন করার সময় সেদেশের সরকার গাছগুলো কেটে ফেলে। তাদের তো কোনও সমস্যা হয়নি। তাহলে আমাদের এতো সমস্যা কেন হচ্ছে!’ তিনি গাছ কেটে দ্রুত রাস্তা প্রশস্ত করা এবং পরে পরিকল্পিতভাবে রাস্তার ধারে বৃক্ষরোপণের পরামর্শ দেন।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন বলেন, ‘এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজারের মতো যানবাহন চলাচল করে। রাস্তার যে করুণ অবস্থা তাতে যে কোনও সময় বন্দরের মালামাল পরিবহন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’ তিনি এসব পুরাতন গাছ কেটে অবিলম্বে ৬ লেনের মহাসড়ক নির্মাণের দাবি জানান। একইসঙ্গে সড়কের উন্নয়নের পর রাস্তার দুই ধারে তাদের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ করা হবে বলেও জানান।

ভারত-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট সাব-কমিটির চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান বলেন, ‘চলতি বছরেই যশোর অঞ্চলে গড়ে তোলা হচ্ছে দু’টি অর্থনৈতিক জোন। ২০১৯ সালে মংলা বন্দরে ভারতীয় জাহাজ থেকে মালামাল লোড-আনলোড হবে। সেকারণে রাস্তার সম্প্রসারণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।’

গাছ কাটলে যশোর রোড ঐতিহ্য হারাবে, একথার জবাবে তিনি বলেন, ‘উন্নয়নের স্বার্থে ঢাকা-ময়মনসিংহ রোড চার লেন করার সময় ভাওয়ালের বনও কেটে ফেলা হয়। চট্টগ্রাম মহাসড়ক করার সময়ও গাছ কাটা হয়েছে। শুধু শতবর্ষী গাছ নয়; আরও অনেক ঐতিহ্য আমাদের রয়েছে, সেগুলো সংরক্ষণ করা হোক।’

যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল ইসলাম মনির বলেন, ‘এসব গাছের আয়ুও নাই, ভ্যালুও নাই। বিশ্বের ২৫টি দেশ ঘুরেছি, কোথাও হাইওয়ের পাশে গাছ দেখতে পাইনি। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে যদি একটি গাছ কাটা হয়, তবে তিনটে গাছ সরকার লাগাবে। আমরা উন্নয়নের পক্ষে, আবার গাছ লাগানোরও পক্ষে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটি (রাস্তা উন্নয়ন) এশিয়ান হাইওয়ের প্যাটার্ন অনুসরণ করে হবে। পদ্মাসেতু হওয়ার পর এই মহাসড়কের অর্থনৈতিক গুরুত্ব যে কত হবে, তা কল্পনা করা যাচ্ছে না। রাস্তা করার ক্ষেত্রে কোর্ট বা পরিবেশবাদীরা বাধা দিলে উন্নয়নই বাধাগ্রস্ত হবে।’

যশোর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ বলেন, ‘যশোর রোডের ধারে শতবর্ষী যেসব গাছ রয়েছে, তার মধ্যে অনেক গাছই বিনষ্ট হয়ে গেছে বা যাচ্ছে। রাস্তা তৈরির পরও একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে ফের বৃক্ষরোপণের সিদ্ধান্ত সরকার অবশ্যই নেবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘১৩শ’ শতাব্দীতে রাস্তার ধারে গাছ লাগানো হতো। কেননা, সেসময় এতো অত্যাধুনিক যানবাহন ছিল না। তখন রাস্তার ধারে গাছ লাগানো হতো পথিকের ছায়ার নিচে বিশ্রাম নেওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে। কিন্তু এখন বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রে হাইওয়ে সংলগ্নে গাছ রাখা হয় না। কারণ গাছের শেকড় ও ডাল-পাতা রাস্তা বিনষ্টের অন্যতম কারণ।’

তিনি বলেন, ‘ভারতীয় কর্তৃপক্ষও হাইওয়ের কারণে সেখানকার গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি আসলে ভারত বা বাংলাদেশের বিষয় নয়। যশোর- বেনাপোলের এই সড়ক আন্তর্জাতিক সড়ক। সেকারণে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়েই এই মহাসড়কের প্রশস্ত করার কাজ সম্পাদন করা হচ্ছে। এটিকে পর্যায়ক্রমে চার থেকে ছয় লেনে উন্নীত করা হবে।’

দেশের অন্যতম বৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল থেকে হাজার হাজার টন মালামাল দেশের নানা জায়গায় যায়। তবে দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় এ বন্দর বর্তমানে জরাজীর্ণ। সেজন্য এটি পুনঃনির্মাণের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। ৭ দশমিক ৩ মিটার মূল পেভমেন্ট এবং দুই পাশে দেড় মিটার করে হার্ড শোল্ডার রেখে মহাসড়কটি সংস্কারের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের উভয় পাশের প্রায় ২৭শ’ গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

১৮৪০ সালে জমিদার কালি পোদ্দার বাবু তার মায়ের গঙ্গাস্নানের জন্য যশোর থেকে কলকাতা পর্যন্ত নির্মাণ করেন এ সড়ক। আর মায়ের নির্দেশ অনুযায়ী পথচারীদের সুবিধার জন্য রাস্তার দুই ধারে রোপণ করেন হাজার হাজার বট, অশত্থ, শিরীষ, মেহগনি গাছ।

১৯৭১ সালে হাজার হাজার নারী-পুরুষ-শিশু শরণার্থী হয়েছিলেন এই সড়ক দিয়েই। মিত্রবাহিনীও এসেছিল এই সুশীতল রাস্তা দিয়েই। সেকারণে চলতি বছরের জুন মাসে যশোরের রাজনীতিক, কবি, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা গাছগুলো রেখে তা সংস্কারের দাবি জানান।

তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার (১৮ জানুয়ারি) যশোর রোডে শতবর্ষী গাছ কাটার সিদ্ধান্ত ৬ মাসের জন্য স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে এই গাছ রক্ষায় সরকারের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি পৃথক আরেক রুলে যশোর রোডের পাশে থাকা ওই গাছগুলো রেখে চার লেন রাস্তা তৈরিতে কেন নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে না, তাও জানতে চেয়েছেন আদালত। দুই সপ্তাহের মধ্যে সেতু সচিব, সেতু বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী, পরিবেশ সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে জবাব দিতে বলা হয়েছে। বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও বিচারপতি ইকবাল কবিরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই নির্দেশ দেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। বাংলাট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত