সমুদ্রের নীল জলের নিচে বাস করে পৃথিবীর এক বিশাল ও বুদ্ধিমান প্রাণী তিমি। মানুষের মতোই তারা দলবদ্ধভাবে বাস করে এবং নিজেদের মধ্যে কথা বলে। এবার বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে এই সামুদ্রিক প্রাণীরা মানুষের মতোই আলাদা আঞ্চলিক উপভাষায় কথা বলতে পারে। বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন, ভূমধ্যসাগরের পূর্ব অংশে বসবাসকারী স্পার্ম তিমিরা পশ্চিম অংশের তিমির তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা এবং দ্রুতগতির এক কণ্ঠস্বর বা উপভাষা তৈরি করেছে। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে প্রাণীদের যোগাযোগব্যবস্থা এবং সংস্কৃতিও মানুষের ভাষার মতোই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিবর্তিত হতে পারে। প্রোসিডিংস অব দ্য রয়্যাল সোসাইটি বি সাময়িকীতে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। ভূমধ্যসাগরজুড়ে প্রায় দুই দশক ধরে সংগ্রহ করা শব্দ বা অ্যাকুইস্টিক রেকর্ডিংয়ের ওপর ভিত্তি করে এই নতুন তথ্য সামনে এসেছে।
গবেষকেরা স্পার্ম তিমির ৫ হাজার ২৯১টি কোডা বিশ্লেষণ করেছেন। কোডা হলো ক্লিকের মাধ্যমে তৈরি একধরনের ছন্দময় শব্দসমষ্টি, যা স্পার্ম তিমিরা নিজেদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করে। বছরের পর বছর ধরে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন যে ভূমধ্যসাগরের সব স্পার্ম তিমি একটি একক সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। কারণ, তারা সবাই একটি চিরচেনা ৩+১ কোডা ব্যবহার করত। এই শব্দে প্রথমে তিনটি ক্লিক এবং একটি বিরতির পর চতুর্থ ক্লিকটি করা হয়। তবে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের তিমিরা, বিশেষ করে গ্রিসের হেলেনিক ট্রেঞ্চের কাছাকাছি থাকা তিমিরা স্পেনের ব্যালেয়ারিক দ্বীপপুঞ্জের তিমির তুলনায় অনেক দ্রুতগতিতে একই ডাক তৈরি করে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পশ্চিমের তিমিরা সব সময় তাদের ঐতিহ্যবাহী উপভাষা ব্যবহার করলেও পূর্বের তিমিরা মাঝেমধ্যে তাদের ডাক পরিবর্তন করে পশ্চিমা সংস্করণে ফিরে যায়। গবেষকেরা জানান, এই আচরণ ইঙ্গিত করে যে পূর্বের তিমির দল এখনো তাদের পুরোনো কণ্ঠস্বরের ধারাটি ভুলে যায়নি। তারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে নিজেদের একটি নতুন বৈচিত্র্য তৈরি করছে। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন স্পার্ম তিমিরা প্রায় ২০ হাজার বছর আগে জিব্রাল্টার প্রণালি হয়ে প্রথম ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ করেছিল। এরপর তারা পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই তিমির জনসংখ্যা মূলত দীর্ঘ সময় ধরে একে অপরের থেকে আলাদা বা বিচ্ছিন্ন ছিল। এই কারণে তাদের কণ্ঠস্বরের ঐতিহ্যগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্বাধীনভাবে বিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানে বিপন্ন এই ভূমধ্যসাগরীয় তিমির সংখ্যা মাত্র কয়েক শ থেকে কয়েক হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
গবেষকেরা জানান, মানুষের বাইরে অন্য কোনো প্রজাতির মধ্যে সংস্কৃতি ও যোগাযোগ কীভাবে বিবর্তিত হয়, এই গবেষণা তার একটি বিরল ধারণা দেয়। তারা আশা করছেন ভবিষ্যতের আরও গবেষণা এটি পরিষ্কার করবে যে কেন পূর্বের তিমিরা দ্রুতগতির উপভাষা তৈরি করল এবং কেন তারা দুটি ভাষার মধ্যে পরিবর্তন করে কথা বলে। এটি প্রাণীদের ভাষা এবং সামাজিক আচরণের বিবর্তনের আরও গভীর রহস্য উন্মোচন করতে পারে।
সূত্র: এনডিটিভি