শিল্প-সাহিত্যে শ্লীলতা-অশ্লীলতার সীমারেখা নিয়ে বিতর্ক যুগ যুগ ধরে। এটা ঠিক শ্লীলতা দেখায় সাধারণের চোখ আর শিল্পী-সাহিত্যিকের চোখ এক নয়। সাধারণে যা নগ্নতা, শিল্পীর তুলিতে বা সাহিত্যিকের কলমে তা হয়ে ওঠে সৌন্দর্য্য।
আবার শিল্পকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অশ্লীলতাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টাও কম নয়। কাটতি বাড়াতেও অনেকে নগ্নতা বা অশ্লীলতাকে শিল্পের আড়াল দেয়ার চেষ্টা করেন। ভারতে আবার শিল্পে শালীনতা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
এবার বিতর্কের কেন্দ্রে ’ড্যান্সিং গার্ল’। সিন্ধু সভ্যতার সবচেয়ে পরিচিত মুখ, চার ইঞ্চি উচ্চতার ব্রোঞ্জ মূর্তি ’ড্যান্সিং গার্ল’-এর কপালটাই খারাপ। চার হাজার বছর আগে মহেঞ্জোদারোর কোনো শিল্পী নিপুণ দক্ষতায় আপন মনের মাধুরি মিশিয়ে বানিয়েছিলেন তাকে। তারপর দীর্ঘ সময় মাটির নিচেই চাপা পড়েছিল সেটি।
ঠিক এক শ বছর আগে ১৯২৬ সালে পুরাতাত্ত্বিক খননের সময় মহেঞ্জোদারোর একটি সাধারণ বাড়ির ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার করা হয় ‘ড্যান্সিং গার্ল’কে।
আগের চার হাজার বছর আরামে ঘুমালেও উদ্ধারের পর থেকেই তার ঘুম হারাম। গত এক শ বছরে বারবার বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল ড্যান্সিং গার্ল। শালীনতার সীমা নিয়ে বিতর্ক তো আছেই, আছে মালিকানা বিতর্ক, ধর্মীয় বিতর্ক, এমনকি নামকরণ নিয়েও নানা মত আছে। বিতর্ক যতই হোক, তাতে কিন্তু ড্যান্সিং গার্লের সৌন্দর্য্যের কমতি হয় না।
চার হাজার আগে বানানো এমন নিখূঁত ভাস্কর্য বরং আধুনিক সময়ের শিল্পবোদ্ধাদেরও বিস্মিত করে। চার ইঞ্চি উচ্চতার ড্যান্সিং গার্লের দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে তিনটি বাঁক আছে, একেবারে ত্রিভঙ্গ মূর্তি। এর ডান হাতটি কোমরে রাখা এবং বাঁ হাতটি বাম উরুর ওপর আলতো করে নামানো। এর ডান পা সোজা এবং বাঁ পাটি হাঁটু থেকে সামান্য বাঁকানো। মূর্তির মাথাটি সামান্য পেছনের দিকে হেলানো এবং থুতনিটি আত্মবিশ্বাসের সাথে উঁচানো। এর চোখ দুটি বড় এবং নিচের দিকে অর্ধ-নিমীলিত। ঠোঁট দুটি বেশ চওড়া এবং নাকটি চ্যাপ্টা, যা আদি ভারতীয় উপমহাদেশের জনগোষ্ঠীর শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ইঙ্গিত দেয়।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো ড্যান্সিং গার্লের সাজসজ্জা। কাঁধ থেকে কবজি পর্যন্ত পুরো বাঁ হাতটি প্রায় ২৪-২৫টি চুড়ি বা বালা দিয়ে ঢাকা। ডান হাতে রয়েছে চারটি বালা—দুটি কনুইয়ের ওপরে এবং দুটি কবজিতে। তার গলায় রয়েছে তিন পাটির নেকলেস। মাথার চুলগুলো অত্যন্ত পরিপাটি করে বাঁধা ও খোঁপা করে ঘাড়ের একপাশে ঝুলানো। চার হাজার বছর আগে সমস্যা না হলেও আমাদের আধুনিক মানুষদের সমস্যা হলো ড্যান্সিং গার্লের গায়ে কোনো পোশাক নেই। এখানেই বারবার সামনে চলে আসে বিতর্ক।
ভারতে সাম্প্রতিক বিতর্ক উস্কে দিয়েছে পাঠ্যপুস্তকে নতুন স্টাইলের ড্যান্সিং গার্লের অন্তর্ভূক্তি। ভারতের ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং- এনসিইআরটি প্রণীত ষষ্ঠ শ্রেনীর সমাজবিজ্ঞান বইতে ‘ড্যান্সিং গার্ল’-এর ছবিতে বুক থেকে নিচের বেশকিছু অংশ ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এ নিয়েই বিতর্কের ঝড়।
অনেকেই বলছেন, ড্যান্সিং গার্ল চার হাজার পুরোনো চমৎকার একটি শিল্পকর্ম। এটিকে আধুনিক সময়ের শ্লীল-অশ্লীলের চশমায় দেখাই উচিত নয়। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই সমালোচনায় সায় দিচ্ছেন এনসিইআরটি-এর টেক্সটবুক ডেভেলপমেন্ট কমিটির প্রধান মাইকেল ড্যানিও নিজেই। তার মতে, নগ্নতা মানেই অশ্লীল, এই ভাবনা ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতার অংশ।
আমরা ঔপনিবেশিকতার থেকে ভারতীয় শিক্ষাকে মুক্ত করার কথা বলেও এই মূর্তিকে যদি যথাযথভাবে উপস্থাপন না করি, তাহলে বুঝতে হবে কোথাও একটা বড় সমস্যা রয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ক্লাস সিক্সের শিক্ষকদের সঙ্গে আমরা কথা বলেছিলাম। কারও মনে হয়নি এই মূর্তি অশ্লীল। তবু আমাকে বলা হয়েছিল এই মূর্তি ক্লাস সিক্সের বাচ্চাদের জন্য উপযুক্ত নয়, আমাদের টিমও এই কথার সঙ্গে একমত হতে পারেনি।’ বোঝাই যাচ্ছে বেচারা ড্যানিও ইচ্ছার বিরুদ্ধে চাপের মুখে ড্যান্সিং গার্লকে অবগুণ্ঠিত করেছেন।
বিতর্কের মূল প্রশ্ন হলো, পুরোনো প্রাচীন ভারতীয় শিল্পকলাকে আধুনিক নৈতিকতার মানদণ্ডে বিচার করা যায় কি না বা উচিত কি না। অনেকেই বলছেন, এটা ইতিহাসের সঙ্গে অন্যায়, স্পষ্ট ইতিহাস বিকৃতি। শালীনতার আধুনিক চশমায় সবকিছু বিচার করলে, খাজুরাহো, ইলোরাসহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রাচীন ভাস্কর্যকেও পাল্টে দিতে হবে বা আড়াল করতে হবে।
আগেই বলেছে, গত শত বছরে বারবার বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে আসে ড্যান্সিং গার্ল। ১৯২৬ সালে যখন মূর্তিটি উদ্ধার হয়, তখন ভারতবর্ষ ছিল অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারত। আবিষ্কারের পর প্রথমে এটিকে অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে রাখা হয়েছিল। দিল্লী তখন নতুন রাজধানী। তাই দিল্লিকে নতুন করে সাজাতে হরপ্প-মহেঞ্জাদারোয় উদ্ধার হওয়া পুরাকীর্তি দিল্লীতে এনে ঠাঁই দেয়া হয় জাতীয় জাদুঘরে।
কিন্তু ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর সিন্ধু সভ্যতার বেশিরভাগ এবং মূল অংশ পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হয়। তাই পাকিস্তান সিন্ধু সভ্যতার পুরাকীর্তি ফেরত চায়। দীর্ঘ আলোচনায় দুপক্ষ অর্ধেক অর্ধেক ভাগাভাগিতে সম্মত হয়। কিন্তু শালীনতার দোহাই দিয়ে পাকিস্তান ড্যান্সিং গার্লকে নেয়নি।
দেশভাগের পর লাখো মানুষকে ধর্মীয় কারণে দেশ ছাড়তে হয়েছে। শালীনতার দোহাইয়ে একটা ব্রোঞ্জ মূর্তিও ফিরে পায়নি তার শিকড়। পাকিস্তানের মহেঞ্জাদারো থেকে উদ্ধার হওয়া ড্যান্সিং গার্ল এখন দিল্লির জাতীয় জাদুঘরে!
২০১৭ সালে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক দাবি করেন, এই মূর্তিটি আসলে ‘দেবী পার্বতী’র রূপ। তবে মূলধারার ঐতিহাসিকেরা এই ধর্মীয় ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ড্যান্সিং গার্ল নিয়ে বিতর্কের আসলে শেষ নেই। ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক মিউজিয়াম মেলার আসর বসে ভারতে। ওই মেলার মাসকট ঠিক করা হয় ড্যান্সিং গার্লকে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ওই মাসকট উদ্বোধন করতেই নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। মাসকটে ড্যান্সিং গার্লকে পরানো হয়েছিল গোলাপী রংয়ের ব্লাউজ জাতীয় পোশাক।
আর নিম্নাঙ্গে ছিল গুজরাতি ঐতিহ্যবাহী নকশা সংবলিত একটি হলুদ ধুতির মতো পোশাক। সমালোচকেরা অভিযোগ করেন, বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক ধ্যানধারণার সাথে মেলাতে গিয়ে প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক সত্যকে বিকৃত ও জোরপূর্বক ‘শালীন’ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, ড্যান্সিং গার্লের নামকরণ নিয়েও আছে বিতর্ক। মহেঞ্জদোরোর উদ্ধার কাজে নেতৃত্ব দেয়া ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক জন মার্শাল উদ্ধারের পর এর নাম দিয়েছিলেন ‘ড্যান্সিং গার্ল’। তখন ব্রিটিশরা ভারতের নাচনেওয়ালীদের সাথে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন। আদর করে তারা নৃত্যপটিয়সী নারীদের নাম দিয়েছিলেন ‘নচ গার্ল’। হয়তো ‘নাচ’কেই ইংরেজি উচ্চারণে ’নচ’ বলা হতো। উদ্ধারের পর মার্শালের হয়তো মূর্তিটির ভঙ্গিকে নাচের মূদ্রা মনে হয়েছে, তাই তিনি নাচ গার্লদের সাথে মিলিয়ে নাম দিয়েছিলেন ‘ড্যান্সিং গার্ল’।
তবে আধুনিক গবেষকদের মতে, এটি কেবলই একজন আত্মবিশ্বাসী নারীর প্রতিকৃতি এবং আদিম সমাজে একে কোনো অশ্লীল দৃষ্টিকোণ থেকে তৈরি করা হয়নি। বিতর্ক যাই হোক নাম আর পাল্টায়নি।
আসলে আমরা যতই বিতর্ক করি, যতই শালীনতার চশমায় দেখি, ইতিহাস বদলানো যাবে না। অতীতকে বর্তমানের নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ঢেকে না রেখে, তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে বোঝার চেষ্টা করাই সভ্যতার জন্য মঙ্গলজনক। সূত্র: কালেরকন্ঠ