শিরোনাম
◈ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় বাংলাদেশিদের ভ্রমণ স্থগিত চেয়ে আইনি নোটিশ ◈ সংরক্ষিত নারী এমপিদের নির্দিষ্ট কোনো নির্বাচনী এলাকা নেই, তাদের দায়িত্ব পুরো বাংলাদেশ: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ◈ সংসদের ছাদ চুইয়ে পানি, ডেপুটি স্পিকারের ঘরেও ‘বাটি থেরাপি’! ◈ ঢাকাসহ সারা দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক বন্ধ নয়, নিয়ন্ত্রণে আসছে নতুন নীতিমালা: সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ◈ ‘আঙ্কেল, একটা ছবি তুলবো প্লিজ’—শিক্ষার্থীদের আবদারে থামলেন প্রধানমন্ত্রী, বললেন ‘আসো, আমি ছবি তুলে দিচ্ছি’(ভিডিও) ◈ সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের মাসিক ব্যয় অর্ধেক করছে সরকার ◈ প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক সূচনা, জুলাইয়ের ১২ দিনে এলো ১৩২ কোটি ডলার ◈ বিপৎসীমার কাছাকাছি আরও পাঁচ পয়েন্ট, বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা ◈ আর্থিক সংস্কার নিয়ে সরকারের অবস্থানে আইএমএফের পূর্ণ সমর্থন: অর্থমন্ত্রী ◈ শেখ হাসিনা যেখানেই আত্মসমর্পণ করুক তাকে আগে জেলে যেতে হবে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (ভিডিও)

প্রকাশিত : ১৩ জুলাই, ২০২৬, ০৮:৪৪ রাত
আপডেট : ১৩ জুলাই, ২০২৬, ০৯:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ফরিদপুরে নিজস্ব তিনতলা বাড়িতে নিঃসঙ্গ মৃত্যু, শেষ বিদায়ে এলেন না কোনো স্বজন

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর প্রতিনিধি: তিনতলা নিজের বাড়ি। নিচতলায় ভাড়াটিয়া, ওপরে একটি ফ্ল্যাটে একা থাকতেন তিনি। একসময় যে ঘরে বাবা-মায়ের স্নেহ, ভাই-বোনের হাসি আর সংসারের কোলাহল ছিল, সেই ঘরই ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছিল নিঃসঙ্গতার ঠিকানায়। শেষ পর্যন্ত সেই ঘর থেকেই অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হলো কোয়েল চৌধুরীকে (৫৪)। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক জানালেন, তিনি আর নেই।

আরও বেদনাদায়ক বিষয় হলো, মৃত্যুর খবর বিদেশে থাকা একমাত্র বোন ও আত্মীয়স্বজনকে জানানো হলেও কেউ শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে আসেননি। শেষ বিদায়ের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন প্রতিবেশী আর স্থানীয় মানুষজন। তাঁদের উদ্যোগেই বাবা-মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হন কোয়েল চৌধুরী।

রোববার (১২ জুলাই) সকালে ফরিদপুর শহরের পূর্ব খাবাসপুর এলাকার ‘চৌধুরী ভিলা’য় প্রতিদিনের মতো একজন ভাড়াটিয়া তাঁর জন্য খাবার নিয়ে যান। অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে প্রতিবেশীদের খবর দেওয়া হয়। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করা হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে।

পুলিশ দরজা ভেঙে কোয়েল চৌধুরীকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে। প্রথমে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল, পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০০০ সালের দিকে সরকারি চাকরিজীবী দম্পতি হাশমত আলী চৌধুরী ও আছিয়া খানম এই বাড়িটি কিনে বসবাস শুরু করেন। তাঁদের তিন সন্তানের মধ্যে একমাত্র মেয়ে পরবর্তীতে কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। দুই ছেলে—বাবু চৌধুরী ও কোয়েল চৌধুরী—দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন।

তবে তাঁদের নিয়ে মানুষের স্মৃতিতে ভয় বা বিরক্তি নয়, বরং রয়েছে মমতার গল্প।

শহরের অনেকেই এখনও মনে করতে পারেন, দুই ভাইকে প্রায় সব সময় একসঙ্গেই দেখা যেত। কখনো পাশাপাশি হাঁটছেন, কখনো একজন আরেকজনের হাত ধরে ধীর পায়ে শহরের রাস্তা পেরিয়ে যাচ্ছেন। যেন বাইরের পৃথিবীতে তাঁদের আর কেউ নেই—দুজনই ছিলেন একে অপরের সবচেয়ে কাছের মানুষ।

প্রায় দেড় বছর আগে বড় ভাই বাবু চৌধুরীর মৃত্যু হলে কোয়েল চৌধুরীর জীবন আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। বিশাল বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে একাই কাটত তাঁর দিন-রাত। নিজের দেখাশোনার মতো ঘনিষ্ঠ কেউ ছিলেন না। ভবনের ভাড়াটিয়ারাই নিয়মিত খাবার দিতেন, প্রতিবেশীরা খোঁজ নিতেন, প্রয়োজন হলে পাশে দাঁড়াতেন।

প্রতিবেশী আশিকুর রহমান খান বলেন, “সকালে ভাড়াটিয়া খাবার দিতে গিয়ে কোনো সাড়া না পেয়ে আমাদের খবর দেয়। আমরা ৯৯৯-এ ফোন করি। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে তাঁকে উদ্ধার করে। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।”

তিনি জানান, “কানাডায় থাকা তাঁর একমাত্র বোনকে মৃত্যুর খবর দেওয়া হলে তিনি দাফন করে দিতে বলেন। অন্য আত্মীয়দেরও জানানো হয়েছিল, কিন্তু কেউ আসেননি। পরে এলাকার মানুষ মিলে আলীপুর কবরস্থানে তাঁর বাবা-মায়ের কবরের পাশেই দাফনের ব্যবস্থা করেন। দাফনের পর দূরসম্পর্কের কয়েকজন আত্মীয় এসেছিলেন।”

এলাকায় একটি প্রচলিত কথা রয়েছে, ছোটবেলায় বাবা-মা কর্মস্থলে যাওয়ার আগে দুই সন্তানকে ঘুমের ওষুধ খাওয়াতেন, যা তাঁদের মানসিক অবস্থার অবনতির কারণ হয়ে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে কোনো সরকারি বা চিকিৎসাগত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহামুদুল হাসান বলেন, “৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাঁকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়।”

কোয়েল চৌধুরীর জীবনের শেষ অধ্যায় যেন নীরবে একটি প্রশ্ন রেখে গেল—রক্তের সম্পর্ক সবসময় কি সবচেয়ে কাছের সম্পর্ক? নাকি মানুষের সবচেয়ে কঠিন সময়ে প্রতিবেশী, ভাড়াটিয়া আর আশপাশের মানুষই হয়ে ওঠেন প্রকৃত আপনজন?

একটি তিনতলা বাড়ি ছিল তাঁর। ছিল স্মৃতিভরা একটি পরিবার। কিন্তু জীবনের শেষ সময়ে ছিল শুধু নিঃসঙ্গতা। আর শেষ বিদায়ে, স্বজনের বদলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছিলেন প্রতিবেশীরাই।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়