স্পোর্টস ডেস্ক : লর্ডস টেস্টের উত্তাপ তখন মাঠের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। পাকিস্তান-ইংল্যান্ডের ম্যাচের মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে হঠাৎই পর্দায় ভেসে উঠলেন পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ইমরান খানের দুই ছেলে। আর সেই সাক্ষাৎকার প্রচার হতেই ক্ষোভে ফুঁসে উঠল পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। এমনকি সাক্ষাৎকার বন্ধ না হলে বিরতির পর মাঠে না নামার হুমকিও দিয়েছিল তারা। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সাক্ষাৎকারও প্রচার হয়েছে, পাকিস্তানও মাঠে নেমেছে।
২০১৮ সালে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) ক্ষমতায় এলে প্রধানমন্ত্রী হন ইমরান। তবে, ২০২২ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর একের পর এক মামলায় গত তিন বছর ধরে কারাগারেই রয়েছেন পাকিস্তানের বিশ্বকাপজয়ী এই অধিনায়ক। -- ডেইলি ক্রিকেট
ব্রিটিশ গণমাধ্যম স্কাই স্পোর্টসে সম্প্রচারিত ওই সাক্ষাৎকারে ইমরান খানের কারাবাস, শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসা এবং পাকিস্তান সরকারের আচরণ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন কাসিম খান ও সুলাইমান খান। ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান ধারাভাষ্যকার মাইকেল আথারটনের নেওয়া সাক্ষাৎকারটি ধারণ করা হয়েছিল লর্ডসের প্যাভিলিয়নে। পরে ১৮ মিনিটের একটি ক্লিপ সম্প্রচার করে স্কাই। ইমরান খানের দুই ছেলে জানিয়েছেন, ২০২২ সালের নভেম্বরের পর থেকে বাবার সঙ্গে তাদের সরাসরি দেখা হয়নি। সর্বশেষ গত মার্চে তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন তারা।
ইমরানের বর্তমান শারীরিক ও মানসিক অবস্থা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দুই ভাই। তাদের দাবি, ইমরানের এক চোখের দৃষ্টিশক্তি প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। প্রতিদিন ২৩ ঘণ্টারও বেশি সময় তাকে ছোট একটি কক্ষে একাকী থাকতে হচ্ছে। গরমের সময় কক্ষটির শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও যথেষ্ট নয় বলে দাবি তাদের। দীর্ঘদিনের এই বিচ্ছিন্নতার প্রভাব তার রক্তচাপেও পড়ছে বলে জানিয়েছেন সুলাইমান। ইমরানকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন কাসিম।
তার ভাষায়, ‘তারা (পাকিস্তান সরকার) এখন আর কোনো কৌশল অনুসরণ করেও কাজ করছে না। তারা কী করছে, সেটাই খুব একটা পরিষ্কার নয়। সেখানে স্পষ্ট তাকে হত্যা করার চেষ্টা করছে। যতটা সম্ভব তাকে আটকে রাখা এবং তার কণ্ঠ রুদ্ধ করে রাখাই যেন তাদের উদ্দেশ্য।
বাবার সঙ্গে সর্বশেষ যোগাযোগের প্রসঙ্গ টেনে কাসিম আরও বলেন, 'পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভয়াবহ। শেষবার যখন সে আমাদের খালা ও অন্য কারও সঙ্গে কথা বলতে পেরেছিল, তখন সে বলেছিল, সম্প্রতি পরিস্থিতি মারাত্মকভাবে খারাপ হয়েছে। সে বিষয়টি অন্য রাজনৈতিক বন্দিদের সঙ্গে তুলনা করেছে, যারা কারাগারে নিহত হয়েছেন বা মারা গেছেন। এই মুহূর্তে পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে খারাপ। তাকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে প্রতিদিন ২৩ ঘণ্টারও বেশি সময় একটি কক্ষে রাখা হচ্ছে। ইমরানের চিকিৎসা নিয়েও গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন তার দুই ছেলে। কাসিমের মতে, কঠিন পরিস্থিতিতেও সবসময় শান্ত থাকা বাবাকে এবার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মনে হয়েছে।
এই মুহূর্তে তার সঠিক চিকিৎসা পাওয়াটা আমাদের জন্য সত্যিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার চোখের সমস্যার কারণে চোখে প্যাচ লাগানো ছিল, তাকে দৃশ্যতই মানসিক চাপে মনে হচ্ছিল। বিষয়টি আমাদের জন্য মেনে নেওয়া খুব কঠিন, কারণ আমরা যতবারই তাকে দেখেছি, এমনকি বন্দুকের মুখোমুখি হওয়ার সময়ও, তিনি সবসময় খুব শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী একজন মানুষ।’
বাবার স্বভাব বোঝাতে একটি পুরোনো ঘটনা সামনে কাসিম বলেন, ‘একবার আমরা যে গাড়িতে ছিলাম, সেটি ছিনতাই হয়েছিল। তখনও গাড়ির ছিনতাইকারীদের মধ্যেও সবচেয়ে শান্ত মানুষটি ছিল সে।
ইমরানকে হাসপাতালে নেওয়ার বিষয়েও পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন তার ছেলেরা। গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইমরানকে ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তর এবং অন্তত ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। কারাবন্দি হওয়ার পর এটিই হওয়ার কথা ছিল কারাগারের বাইরে তার সবচেয়ে দীর্ঘ সময়। তবে সেই নির্দেশ অনুযায়ী তাকে শিফা হাসপাতালে না নিয়ে রাষ্ট্রীয় পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসে (পিআইএমএস) নেওয়া হয়। সেখানে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে আবার কারাগারে পাঠানো হয় বলে দাবি তার ছেলেদের।
ঘটনাটিতে হতাশা প্রকাশ করে সুলাইমান বলেন, ‘আমরা সতর্ক ও আশাবাদী ছিলাম। কিন্তু আমাদের আশঙ্কাই সত্যি হলো। তাকে যে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার কথা ছিল, সেখানে না নিয়ে কয়েক ঘণ্টার জন্য একটি সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। এরপর সরাসরি আবার কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। সরকারি হাসপাতালে কী ঘটেছিল, সেটিও বিস্তারিত জানিয়েছেন কাসিম।
তার ভাষ্য ‘বাস্তবে সরকারি কর্মকর্তারা এক ঘণ্টার মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেছিলেন, “দারুণ, তিনি ঠিক আছেন।” এরপর তারা বলেছিল, এখন আমরা তাকে স্বাধীন হাসপাতাল শিফায় পাঠাব। কিন্তু তারা সেখানে অপেক্ষমাণ সব চিকিৎসককে, এমনকি আমাদের খালা যিনি নিজেও একজন চিকিৎসক, তাকেও অপেক্ষায় রেখে সরাসরি বাবাকে কারাগারে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
শুধু বাবার চিকিৎসা নয়, তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ না পাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেছেন ইমরানের দুই ছেলে। একাধিকবার পাকিস্তানে গিয়ে বাবার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করলেও ‘কারিগরি কারণ’ দেখিয়ে তাদের ভিসা আটকে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
ইমরানের প্রতি পাকিস্তান সরকারের আচরণ নিয়ে যেমন ক্ষুব্ধ দুই ভাই, তেমনি যুক্তরাজ্য সরকারের ভূমিকাতেও হতাশ তারা। বিশেষ করে বাবার বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের প্রতিক্রিয়াকে ‘দুর্বল’ বলে মন্তব্য করেছেন সুলাইমান।
তিনি বলেন, ‘আমরা বেশ হতাশ হয়েছি। যখনই আমরা পররাষ্ট্র দপ্তর বা আগের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, তখনই তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল দুর্বল। তারা বলেছে, “এটা শুনে খুব খারাপ লাগছে, আমরা সহানুভূতিশীল।” (গত সরকারের সময়) তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, বরং কোনো ধরনের সমর্থনই ছিল না।
পাকিস্তানে যাওয়ার ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে তাদের নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল জানিয়ে সুলাইমান বলেন, ‘তারা সক্রিয়ভাবে বলেছিল, আমাদের পাকিস্তানে যাওয়া উচিত নয় এবং আমরা গেলে তারা আমাদের কোনো সহায়তা করতে পারবে না। আমরা আশা করছি, নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডের সময়ে হয়তো আমরা সফল হব এবং বাবার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাব।