শিরোনাম
◈ সাজেকে ১৪ দিনের অবরোধে চরম খাদ্যসংকট, পর্যটন ও পরিবহন খাতে শতকোটি টাকার ক্ষতির শঙ্কা: সমাধান করবে কে? ◈ শ্রমিক আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ নয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ ◈ জিগাতলায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১৮৪ ফ্ল্যাট নির্মাণের উদ্যোগ ◈ গাছতলায় ফেলে যাওয়ার ঘটনায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ, ৯৫ বছরের বাবাকে বাড়িতে নিলেন বড় ছেলে ◈ কিশোরগঞ্জে জামায়াত নেতা আখতারুজ্জামানের ছেলেকে ছুরিকাঘাত ◈ ১২ দেশে কর্মী পাঠাতে মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক, ছাড়পত্রে সরকারের কঠোর নির্দেশনা ◈ ৭ নভেম্বরের শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, পায়ে হেঁটে মানিকমিয়া এভিনিউ পর্যন্ত যাবেন ◈ জানুয়া‌রি‌তে বাংলাদেশ-ভারত সিরিজ? ◈ সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের মালিক গ্রেপ্তারে লাগবে আদালতের অনুমতি ◈ ভারত থেকে সার্ভারে প্রবেশের অভিযোগ, ডিজিপের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবস্থা

প্রকাশিত : ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৬ রাত
আপডেট : ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০১:৩৯ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

কুমিল্লায় নির্বাচন অফিসে সেবা নিতে গিয়ে রাষ্ট্রের কর্মচারীর হাতে মার খেলেন রাষ্ট্রের মালিক—এ কেমন রাষ্ট্রীয় সেবা?

শাহাজাদা এমরান: রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, আর সেই জনগণের সেবা করার দায়িত্বে নিয়োজিত প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা। অথচ কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসে ঘটেছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। সেবা নিতে আসা একজন নাগরিককে অফিসকক্ষে আটকে রেখে মারধরের যে অভিযোগ উঠেছে, তা শুধু একজন নাগরিকের ওপর শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা নয়; এটি জনপ্রশাসনের দায়িত্ববোধ, নাগরিক মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির ওপর সরাসরি আঘাত।

ঘটনার সূত্রপাত জাতীয় পরিচয়পত্রসংক্রান্ত একটি সেবা নিতে গিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, আদর্শ সদর উপজেলার পাঁচথুবি ইউনিয়নের পাঁচথুবি গ্রামের এক ব্যক্তি তাঁর বোনের এনআইডি-সংক্রান্ত কাজের জন্য একাধিকবার উপজেলা নির্বাচন অফিসে যান। প্রথমবার তাঁকে কিছু কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়।

সেসব কাগজ নিয়ে গেলে নতুন করে আরও কাগজপত্র চাওয়া হয়। এভাবে তিন-চারবার তাঁকে অফিসে আসতে বাধ্য করা হয়। সেবা গ্রহীতার অভিযোগ, কাজটি করে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীর পক্ষ থেকে দুই হাজার টাকা ঘুষ দাবি করা হয়েছিল। তিনি টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় একেকবার একেক ধরনের কাগজপত্র চেয়ে তাঁকে হয়রানি করা হচ্ছিল।

বুধবার (৪ নভেম্বর) দুপুর ১২টার পর তিনি আবারও চাহিদা অনুযায়ী ওয়ারিশ সনদ নিয়ে অফিসে যান। এবার তাঁকে জানানো হয়, সনদটি জাল। অথচ তাঁর দাবি, নির্বাচন অফিসের কম্পিউটারেও সনদটি দেখা যাচ্ছিল। তখন তিনি প্রশ্ন করেন, কম্পিউটারে সনদটি প্রদর্শিত হলে সেটি জাল হয় কীভাবে? আর প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্রের কথা একসঙ্গে না জানিয়ে বারবার তাঁকে হয়রানি করা হচ্ছে কেন?

Advertisement

এ নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, সেবা গ্রহীতা কর্মকর্তার অসৌজন্যমূলক আচরণের ভিডিও ধারণ করতে গেলে তাঁকে একটি কক্ষে আটকে দরজা বন্ধ করে বেধরক মারধর করা হয়। তাঁকে উদ্ধারে এগিয়ে আসা কয়েকজনকেও মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সেবা নিতে আসা এক নারীকে ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। ঘটনার প্রকৃত চিত্র জানতে সংশ্লিষ্ট অফিসের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা জরুরি।

এখানে আমার প্রশ্ন একেবারেই সরল, স্বচ্ছ ও পরিষ্কার। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। আর প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা জনগণের সেবায় নিয়োজিত। ইংরেজিতে তাঁদের বলা হয় ‘পাবলিক সার্ভেন্ট’। অর্থাৎ তাঁরা জনগণের সেবক, জনগণের শাসক নন। তাহলে সেই জনগণের একজন সদস্য সরকারি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে কর্মকর্তার হাতে মারধরের শিকার হবেন কেন? রাষ্ট্রের কর্মচারী কি রাষ্ট্রের মালিকের গায়ে হাত তোলার অধিকার রাখেন?
বিতর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, সেবা গ্রহীতা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন।

তবুও কি তাঁকে আটকে রেখে মারধর করার অধিকার ওই কর্মকর্তার রয়েছে? কোনো নাগরিকের আচরণ আপত্তিকর মনে হলে তাঁর বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা যেত, প্রয়োজন হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া যেত। এমনকি তাঁর আবেদন বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা সম্ভব না হলে লিখিতভাবে কারণ জানানো যেত। কিন্তু সরকারি দপ্তরকে ব্যক্তিগত ক্ষমতা প্রদর্শনের জায়গা বানিয়ে একজন নাগরিককে আটকে রেখে মারধর করার অভিযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আরও উদ্বেগের বিষয়, একজন নাগরিককে উদ্ধারে এগিয়ে আসা ব্যক্তিদেরও মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এর অর্থ, সরকারি অফিসে সেবা নিতে আসা মানুষ কি নিরাপদ নন? তাঁরা কি নিজেদের ন্যায্য দাবি তুলে ধরার অধিকারও হারিয়েছেন? সরকারি দপ্তরে গিয়ে নাগরিককে যদি ভয়, অপমান ও শারীরিক নির্যাতনের আশঙ্কা নিয়ে ফিরতে হয়, তাহলে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের অর্থ কী?

আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, সরকারি পদ কোনো ব্যক্তিগত ক্ষমতার লাইসেন্স নয়। চেয়ার, কক্ষ, সিল ও সরকারি পরিচয়—কোনোটিই কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দেয় না। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত একটি অফিসে জনগণের সঙ্গেই এমন আচরণের অভিযোগ উঠলে সেটিকে সাধারণ মারামারির ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এখানে প্রশ্ন শুধু একজন কর্মকর্তার আচরণের নয়; প্রশ্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি ও নাগরিকের নিরাপত্তার।

আমার দাবি, অবিলম্বে এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট অফিসের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ করে তা পরীক্ষা করতে হবে। অভিযোগে উল্লিখিত ঘুষ দাবির বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনতে হবে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভুক্তভোগীর অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য যাচাই করে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও প্রচলিত আইনে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, কোনো সরকারি কর্মচারী অপরাধ করলে তাঁকে রক্ষা করা নয়, বরং আইন অনুযায়ী জবাবদিহির আওতায় আনাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অন্যথায় এ ধরনের ঘটনা এক অফিসের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারি দপ্তর সম্পর্কে ভয়, অনাস্থা ও ক্ষোভ আরও বাড়াবে।

লেখাটি শেষ করার আগে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মিজ রোজী আক্তারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। জেলা প্রশাসক হিসেবে আপনি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে ঘটনার ব্যাখ্যা তলব করতে পারেন। একই সঙ্গে নিরপেক্ষ তদন্তের উদ্যোগ নিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা, ভুক্তভোগীর বক্তব্য গ্রহণ এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা করতে পারেন। প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করতে পারেন।

আমার প্রশ্ন, একজন সাধারণ নাগরিক সরকারি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে যদি মারধরের শিকার হন, তাহলে প্রশাসন কি বিষয়টি উপেক্ষা করতে পারে? জেলা প্রশাসকের কাছে প্রত্যাশা, বিষয়টি যেন ফাইলবন্দি কোনো অভিযোগে পরিণত না হয়। বরং দ্রুত তদন্ত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করুন—সরকারি অফিসে জনগণের মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রশাসন আপসহীন।

শেষ কথা হলো, জনগণ সরকারি কর্মচারীদের কাছে করুণা চাইতে যায় না; যায় নিজের প্রাপ্য নাগরিক সেবা নিতে। সেই সেবা দিতে ব্যর্থ হওয়ার অধিকার কারও থাকতে পারে না, আর সেবা নিতে আসা মানুষকে পেটানোর অধিকার তো কোনোভাবেই নেই। রাষ্ট্রের মালিকের গায়ে হাত তোলার এই অভিযোগের বিচার না হলে সরকারি দপ্তরে জনগণের মর্যাদা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি কেবল কাগজেই থেকে যাবে। মনে রাখতে হবে, জনগণের সেবা করার জন্যই সরকারি চেয়ার—জনগণকে শাসন, অপমান কিংবা নির্যাতন করার জন্য নয়।

লেখক : সম্পাদক, দৈনিক কুমিল্লার জমিন ও সাধারণ সম্পাদক, নাগরিক অধিকার ফোরাম, কুমিল্লা।

  • সর্বশেষ