শিরোনাম
◈ প্লাস্টিক দূষণ রুখতে বিশ্বকে বাংলাদেশের ‘সোনালি আঁশ’ পাটের দিকে তাকানোর আহ্বান ◈ বাড়ছে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রী এম‌পি‌দের সম্মানি ◈ আগামী পাঁচ বছ‌রে আন্তর্জা‌তিক ক্রিকেট সূচিতে বাড়বে টি-২০, কমবে দ্বিপাক্ষিক ওয়ানডে সিরিজ ◈ গাজায় মানবিক সহায়তা বন্ধ, নিষ্ক্রিয়তার জন্য সবার লজ্জিত হওয়া উচিত: ম্যাক্রোঁ (ভিডিও) ◈ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার চান এরদোগান, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির আহ্বান ◈ ব‌্যা‌টিং কোচ আশরাফুল বল‌লেন, আফগানিস্তানকে হারাতে সব ধর‌নের কৌশল প্রয়োগ কর‌বে বাংলাদেশ ◈ কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য: দেশে সক্রিয় ৩৮৬ গ্যাং, জড়িত ৪ হাজার ২৫০ কিশোর ◈ ‘৫ ম্যাচ ফিক্সিং করে ৩ কোটি নিয়েছি’: আইপিএলে গড়াপেটার অভিযোগ, চেন্নাইয়ের ক্রিকেটারের দিকে সন্দেহের তির ◈ মোংলা বন্দরে রাজস্ব আয়ে নতুন রেকর্ড, এক বছরে আয় ৩,৮৭৯ কোটি টাকা ◈ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিত : ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:০৪ দুপুর
আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:০৪ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

প্লাস্টিক দূষণ রুখতে বিশ্বকে বাংলাদেশের ‘সোনালি আঁশ’ পাটের দিকে তাকানোর আহ্বান

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর রয়টার্সে নিবন্ধ থেকে: প্লাস্টিকের ব্যবহার ও উৎপাদন কমানোর জন্য বছরের পর বছর ধরে নানা প্রচেষ্টা চালানো হলেও এখন পর্যন্ত সেগুলো ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে বিশ্ব ২০৬০ সালের মধ্যে প্লাস্টিক উৎপাদন তিন গুণ করার পথেই এগোচ্ছে। প্লাস্টিক দূষণ এবারের কপ–৩১ (COP 31) সম্মেলনের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়। এবং এই বিষয়টি নিয়েই কূটনীতিকেরা বৈশ্বিক প্লাস্টিক চুক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করতে থাইল্যান্ডের রাজধানীতে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। কিন্তু যত লক্ষ্য নির্ধারণ ও বিধিনিষেধই করা হোক না কেন, শত শত কোটি প্লাস্টিকের ব্যাগকে হঠাৎ অদৃশ্য করে দেওয়া সম্ভব নয়।

প্লাস্টিক নিজেই নিজের সাফল্যেরই ভুক্তভোগী। বাজারের পণ্য বহনের সময় এটি ছিঁড়ে যায় না এবং এই ব্যবহারিক সুবিধার কারণেই এটি এত জনপ্রিয়। কিন্তু সেই একই কারণেই আমাদের বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর প্রবালপ্রাচীর, উপকূলরেখা ও সমুদ্রসৈকতে প্লাস্টিক গিয়ে জমা হচ্ছে। কারণ, সেগুলো মাটির সঙ্গে মিশে যেতে পারে না।

advertisement

এর কারণ খুবই সহজ। একই কাজ একই কম খরচে করতে পারে, এমন কোনো বিকল্প এখনো বড় পরিসরে উৎপাদন করা সম্ভব হয়নি। তাহলে প্লাস্টিকের ব্যাগের বিকল্প কী হতে পারে? উত্তরটি হতে পারে—পাট। এটিকে বলা হয় ‘বাংলাদেশের সোনালি আঁশ।’ প্রক্রিয়াজাত করার পর এই উপাদানটি জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক প্লাস্টিকের মতোই আচরণ করে, তবে প্লাস্টিকের মতো পরিবেশগত ক্ষতিকর প্রভাব ছাড়াই। এটি বস্ত্র, প্যাকেজিং, নির্মাণ, কৃষি এমনকি ফ্যাশন শিল্পেও ব্যবহার করা যেতে পারে।

প্লাস্টিকের বিপরীতে পাট চাষ ও উৎপাদন কার্বন-নেগেটিভ। এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক হেক্টর জমিতে পাট চাষের সময় সর্বোচ্চ ১৫ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষিত হতে পারে এবং একই সময়ে ১১ টন অক্সিজেন নিঃসৃত হয়। পাট মাত্র তিন মাসের মধ্যেই জৈবিকভাবে মাটিতে মিশে যেতে পারে।

advertisement

এই ফসল ব্যবহার করে বাংলাদেশের একজন বিজ্ঞানী এমন এক ব্যাগ উদ্ভাবন করেছেন, যা বাজারের কাউন্টারে প্লাস্টিকের ব্যাগের মতো আচরণ করে, কিন্তু কম্পোস্টের স্তূপে গিয়ে একটি উদ্ভিদের মতো আচরণ করে। একইভাবে, পাট চাষ গম বা ভুট্টার মতো খাদ্যশস্যের সঙ্গে জমির জন্য প্রতিযোগিতা করে না, কারণ এটি বন্যাপ্রবণ ও অবক্ষয়িত জমিতে ভালোভাবে জন্মাতে পারে। পাট যখন বেড়ে ওঠে, তখন এর পাতা ঝরে পড়ে, যা মাটির জৈব উপাদান ও মাটির স্বাস্থ্য বাড়ায়।

এটি বন্যা ও খরার ঝুঁকিও কমাতে পারে, কারণ উর্বর মাটি স্পঞ্জের মতো কাজ করে এবং ক্ষয়িত জমির তুলনায় বেশি পানি শোষণ ও ধরে রাখতে পারে। এর পাশাপাশি, তুলা বা গম চাষের মতো পাট চাষে একই মাত্রায় কীটনাশক ও আগাছানাশকের ওপর নির্ভর করতে হয় না।

advertisement

বাংলাদেশে ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পাট চাষ হয়ে আসছে এবং একসময় এটি ছিল আমাদের প্রধান রপ্তানি পণ্য। কিন্তু এটি কেবল নস্টালজিয়ায় ভরা একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প নয়। পাটের সেই কুখ্যাত প্লাস্টিকের ব্যাগকে প্রতিস্থাপন করার পাশাপাশি মোটরগাড়ি, শিল্প ও কৃষি খাতে ব্যবহৃত প্লাস্টিক এবং জিওটেক্সটাইলেও প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশই একমাত্র পাট উৎপাদক দেশ নয়। ভারত, কেনিয়া, সুদান, নেপাল, উগান্ডা, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়াও পাট উৎপাদন করে। চাহিদাও বাড়ছে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানিতে ২২ দশমিক ২৬ শতাংশ ক্রমবর্ধমান প্রবৃদ্ধি হয়েছে। একক-ব্যবহারের প্লাস্টিকের ওপর নিষেধাজ্ঞা ক্রমেই কঠোর করায় ইউরোপীয় ইউনিয়নও প্যাকেজিংয়ের জন্য বিকল্প উপাদান সংগ্রহে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত একক-ব্যবহারের প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করার পর দেশগুলো সক্রিয়ভাবে বিকল্প উপাদান খুঁজছে।

বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথে পাট শিল্পকে বড় পরিসরে নিয়ে যেতে এখনো কাঠামোগত নানা বাধা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৬ সাল থেকে কার্যকর হওয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্যাকেজিং ওয়েস্ট রেগুলেশন অনুযায়ী, ইউরোপের বাজারে কোনো পণ্যকে জীবাণুবিয়োজ্য বা কম্পোস্টযোগ্য হিসেবে বাজারজাত করার আগে ইএন–১৩৪৩২ সনদ থাকা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের ভেতরেই এই সনদ দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করা, আদর্শভাবে ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে, আমাদের রপ্তানিকারকদের এসব মান পূরণ করতে সাহায্য করবে। পাট উৎপাদনকারী অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বে একটি যৌথ প্রতিষ্ঠান সনদ প্রদান ও পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ বা ট্রেসেবিলিটি প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। এমন একটি সনদ প্রদানকারী সংস্থা পাট উৎপাদনকারী দেশগুলোকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো মূল্যবান বাজারে প্রবেশাধিকার পেতে সহায়তা করতে পারে।

ছোট ও কম শিল্পায়িত দেশগুলোর জন্য ইউরোপীয় বা মার্কিন ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনায় নিজেদের দর-কষাকষির ক্ষমতা কাজে লাগানো অনেক কঠিন। কিন্তু সমন্বিত একটি জোট থাকলে তারা আরও বেশি সমন্বয়ের সঙ্গে শুল্ক ও সনদ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করতে পারবে।

সবশেষে, বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আমাদের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পাটভিত্তিক উদ্ভাবনগুলোর অনেকগুলো এখনো পরীক্ষামূলক বা আধা-বাণিজ্যিক পর্যায়ে উৎপাদিত হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে জুটিনের কথা বলা যায়। এটি পাটের তন্তুর সঙ্গে রেজিনের স্তর তৈরি করে বানানো হালকা, তাপ-নিরোধক ও মরিচা-প্রতিরোধী নির্মাণসামগ্রী। পাটকে এমন জিওটেক্সটাইলেও রূপান্তর করা যায়, যা মাটির ক্ষয় নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। এমনকি পাট থেকে জুট-ভিসকোজ মিশ্রণ তৈরি করা যায়, যা পোশাক তৈরিতেও ব্যবহার করা সম্ভব।

এসব উদ্ভাবন বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার প্রধান বাধা হলো মাঝারি আকারের প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনে প্রবেশাধিকার। শিল্প সক্ষমতা তৈরিতে উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স বা সমন্বিত অর্থায়ন পাট উৎপাদনকে প্রয়োজনীয় মাত্রায় নিয়ে যেতে সহায়তা করতে পারে।

আমার মতো দেশগুলোর কাছে ইতিমধ্যেই রয়েছে পাটের ফসল, উপযুক্ত মাটি ও পরিবেশগত পরিস্থিতি এবং বড় পরিসরে পাট রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমশক্তি। শিল্পভিত্তির পাশাপাশি আমাদের প্রয়োজন ক্রেতা দেশগুলোরও এমন সদিচ্ছা, যাতে তারা একক-ব্যবহারের প্লাস্টিকের একটি গুরুতর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পাটকে বিবেচনা করে।

কপ–৩১-এ বৈঠকে বসা কূটনীতিকেরা যদি আমাদের মহাসাগর, সৈকত ও রক্তপ্রবাহ থেকে প্লাস্টিক দূর করার বিষয়ে সত্যিই আন্তরিক হন, তাহলে প্লাস্টিকের জায়গায় আরও ভালো কিছু প্রতিস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিনিয়োগকারী ও ভোক্তাদের কাছ থেকে যথাযথ সহায়তা পাওয়া গেলে, পাট উৎপাদনকারী দেশগুলো, যাদের কেউ কেউ প্লাস্টিক দূষণের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত ক্ষতির শিকার, অবশেষে প্লাস্টিককে ইতিহাসে পরিণত করতে সহায়তা করতে পারে।

রয়টার্সে লিখিত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের নিবন্ধ থেকে অনূদিত করেছেন আজকের পত্রিকা

  • সর্বশেষ