শিরোনাম
◈ পিকঅ্যাক্সে হামলার শঙ্কা, ইরান ঘিরে মার্কিন তৎপরতা : ৯ নভেম্বর কেন গুরুত্বপূর্ণ? ◈ বাংলাদেশের উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের নতুন কৌশল, গুরুত্ব পাচ্ছে কর্মসংস্থান ◈ চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কে বড় অবনতি, চাপে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ◈ প্রথম ধাপে দেশের ১ হাজার ৫০টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ◈ ২০২৭ সালে গোল্ডেন ভিসার আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করবে পর্তুগাল সরকার ◈ আমন মৌসুমে সাড়ে ৮ লাখ টন ধান-চাল কিনবে সরকার, ধানের দাম ৩৫ টাকা কেজি ◈ দুর্নীতির কারণে কার্যকারিতা হারিয়েছে অনেক সমবায় সমিতি, স্বচ্ছতা নিশ্চিতের তাগিদ রাষ্ট্রপতির ◈ সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ বাংলাদেশির মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক ◈ উৎপাদন এলাকায় কম, ঢাকায় কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে শীতের সবজি ◈ লিও‌নেল মে‌সি আবারও গোল্ডেন বুট জিতলেন

প্রকাশিত : ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০৭:৪৫ বিকাল
আপডেট : ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০৭:৪৭ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বালুখেকোদের লোভে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সৌন্দর্যের লীলাভূমি দ্বীপজেলা ভোলা 

দক্ষিণাঞ্চলের দ্বীপজেলা ভোলা। মেঘনা, তেঁতুলিয়া, ইলিশা ও কালাবদরসহ অসংখ্য নদী ঘিরে গড়ে উঠেছে এই জনপদের মানুষের জীবন, জীবিকা ও অর্থনীতি। অথচ আজ সেই নদীগুলোই ভোলার মানুষের কাছে আতঙ্কের নাম। বছরের পর বছর নদীভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি, বসতভিটা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার, মসজিদ ও পারিবারিক কবরস্থান। একটি নদীভাঙন শুধু কয়েক শতাংশ জমি কেড়ে নেয় না, কখনো কখনো একটি পুরো পরিবারকে নিঃস্ব করে দেয়।

যে পরিবার কয়েক পুরুষ ধরে একটি ভিটায় বসবাস করেছে, একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে তাদের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার মুখে। কৃষকের জমি নেই, ব্যবসায়ীর দোকান নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। সন্তানদের নিয়ে কোথায় যাবে, কীভাবে বাঁচবে—সেই অনিশ্চয়তায় কাটে তাদের জীবন। নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত এসব মানুষের কান্না কি রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কানে পৌঁছায় না?

প্রাকৃতিক কারণে নদীভাঙন ঘটে, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সেই ভাঙনের ঝুঁকির মধ্যে যদি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবৈধ বালু উত্তোলন যুক্ত হয়, তাহলে তা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজার দিয়ে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন নদীর স্বাভাবিক ভারসাম্য, স্রোতের গতিপথ ও তীরের স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ভাঙনপ্রবণ এলাকায় ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা এখন ভোলার অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন।

আওয়ামী লীগ আমলে অভিযুক্ত বালু খেকোদের দৌরাত্ম : 

Advertisement

ভোলায় অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ নতুন নয়। ২০২১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তদন্ত চিত্র-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ভোলা জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক জহুরুল ইসলাম নকীব এবং তাঁর ভাতিজা আনোয়ার হোসেন শামীম মোরাদারের বিরুদ্ধে মেঘনা নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন ও টেন্ডারবাজির অভিযোগ প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোলার বাসিন্দা রহমান মোস্তাফিজ ১৮ আগস্ট ২০২১ তারিখে দুদক চেয়ারম্যান বরাবর তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছিলেন।

একই বছরের ২৩ নভেম্বর বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা পোস্ট-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে কাচিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা বাবুল মিয়াজী অভিযোগ করেন, বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ করায় স্থানীয় চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম নকীব ও তাঁর সহযোগী শামীমের লোকজন তাঁর ওপর হামলা চালায়, বাড়িঘর ভাঙচুর করে এবং মালামাল লুট করে। তিনি আরও দাবি করেন, উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছিল। এগুলো ভুক্তভোগীর অভিযোগ; সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালতের চূড়ান্ত রায়ের তথ্য ওই প্রতিবেদনগুলোতে পাওয়া যায়নি।

বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়েও কি একই চিত্র?

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও ভোলার নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ থামেনি। ২০২৬ সালের ১০ ও ১১ মার্চ দৈনিক বাংলার কণ্ঠ, দৈনিক সংগ্রাম, বাংলাদেশ অবজারভার ও যুগান্তর-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে চরফ্যাশনের বাবুরহাট লঞ্চঘাটসংলগ্ন তেঁতুলিয়া নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠে আসে।

এসব প্রতিবেদনে নজরুলনগর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসানের নাম কথিত সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। তাঁর বড় ভাই ও স্থানীয় ইউপি সদস্য জাহিদুল শিকদারের বিরুদ্ধেও সহযোগিতার অভিযোগ প্রকাশিত হয়। একই সঙ্গে যুবদল নেতা রুবেল শিকদার ও তানজিবের নামও সংবাদে আসে।

২০২৬ সালের ৫ নভেম্বর WNews360-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বোরহানউদ্দিনের তেঁতুলিয়া নদী থেকে তিনটি ড্রেজার আটকের খবর আসে। সেখানে ড্রেজারের মালিক হিসেবে আল আমিন মোল্লা, নুরনবী ও ফাইজুল ইসলামের নাম উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে নুরনবী ও ফাইজুল ইসলামের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও স্থানীয়দের বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতের চূড়ান্ত রায়ের তথ্য ওই সংবাদে নেই।

এই ঘটনাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, ক্ষমতা পরিবর্তনের পর নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ের লোকজনের বিরুদ্ধে কেন একই ধরনের অভিযোগ আসছে? সরকার বদলাবে, জনপ্রতিনিধি বদলাবেন, কিন্তু নদী লুটের চরিত্র কি বদলাবে না?

আমার বক্তব্য পরিষ্কার—আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা অন্য কোনো দলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ জনগণের সম্পদ লুট করার অধিকার রাখে না। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী হলেই আইনের ঊর্ধ্বে থাকা যায় না। বরং ক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে আরও নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত হওয়া উচিত।

অভিযান ও আইনি পদক্ষেপ: স্থায়ী সমাধান কোথায়?

বিভিন্ন সময়ে প্রশাসন ও কোস্ট গার্ড অভিযান চালিয়েছে। ২০২৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তেঁতুলিয়া নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনায় আটজনকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালত এক মাসের কারাদণ্ড দেন। ৭ সেপ্টেম্বর মেঘনা নদীতে অভিযানে আটক ৩৮ জনকে ১৫ দিন করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ছয়টি ড্রেজার ও একটি বাল্কহেডও জব্দ করা হয়। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ও আজকের পত্রিকা এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

এ ছাড়া ৬ আগস্ট ২০২৬ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহিবুল্লাহ খোকন ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে আইনি নোটিশ পাঠান। সেখানে অবৈধ ড্রেজার ও বালুবাহী নৌযান জব্দ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কয়েকজন শ্রমিক আটক কিংবা কিছুদিনের জন্য ড্রেজার জব্দ করলেই কি সিন্ডিকেট বন্ধ হবে? প্রকৃত মালিক, অর্থদাতা ও রাজনৈতিক আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে এই ব্যবসা বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?

বালু উত্তোলনের সংবাদ করায় সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হুমকি

ভোলার অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করাও অনেক সময় সাংবাদিকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২১ সালের ৩ অক্টোবর দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে তদন্ত চিত্র-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের অভিযোগ তুলে ধরা হয়। সেখানে জহুরুল ইসলাম নকীবের বিরুদ্ধে ফোনে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ এবং ১৪ আগস্টের ফোনালাপের পর ১৬ আগস্ট ধানমন্ডি থানায় করা সাধারণ ডায়েরির তথ্য প্রকাশিত হয়।

একই প্রতিবেদনে ১০ সেপ্টেম্বর ২০২১ জাতীয় প্রেসক্লাবের বিপরীতে এক সাংবাদিককে মারধর ও অপহরণের চেষ্টা করার অভিযোগও প্রকাশিত হয়। অভিযোগে জহুরুল ইসলাম নকীব, আনোয়ার হোসেন শামীমসহ আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। এসব অভিযোগের চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তির তথ্য আমার কাছে নেই।

আমার নিজের সাংবাদিকতা জীবনেও ভোলার নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন এবং সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী মহলের কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশের কারণে বিভিন্ন সময়ে হামলা ও হুমকির অভিজ্ঞতা রয়েছে। জনস্বার্থে সত্য তুলে ধরতে গিয়ে সাংবাদিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হলে তা শুধু একজন সাংবাদিকের ওপর আঘাত নয়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জনগণের জানার অধিকারের ওপরও আঘাত।

আমি বিশ্বাস করি, সাংবাদিকের কলম থামিয়ে নদী লুটের হিসাব আড়াল করা যায় না। এ ধরনের হুমকি ও হামলার প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

সমাধান চাই, লোকদেখানো অভিযান নয়:

ভোলাকে রক্ষা করতে হলে প্রথমে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর তলদেশ, স্রোতের গতিপথ এবং ভাঙনপ্রবণ এলাকা নিয়ে বৈজ্ঞানিক জরিপ করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। অনুমোদিত বালুমহালের সীমানা, ইজারাদার ও উত্তোলনের পরিমাণ জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।

অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ড্রেজার মালিক, অর্থদাতা ও নিয়ন্ত্রকদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। নদীর তীর সংরক্ষণে টেকসই প্রকল্প গ্রহণ, প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। নদীভাঙনে বসতভিটা হারানো পরিবারগুলোর জন্য সরকারি খাসজমিতে পুনর্বাসন, নিরাপদ আশ্রয় ও জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে।

সবশেষে বালুখেকোদের প্রতি আমার তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার। আপনারা হয়তো কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছেন, কিন্তু আপনাদের লোভে যে পরিবারটি একদিনে নিঃস্ব হচ্ছে, তাদের কান্নার দায় কে নেবে? একটি পরিবারের বসতভিটা হারানো মানে শুধু জমি হারানো নয়; হারিয়ে যায় পূর্বপুরুষের স্মৃতি, সন্তানের শৈশব, জীবনের সঞ্চয় এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।

সরকারের প্রতি আমার জোরালো আহ্বান—আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি, যে দলেরই পরিচয় ব্যবহার করা হোক, অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের রেহাই দেওয়া যাবে না। রাজনৈতিক আশ্রয়, অর্থের দাপট কিংবা প্রশাসনিক প্রভাব যেন বিচারের পথে বাধা না হয়।

ভোলা কোনো বালুখেকো সিন্ডিকেটের সম্পত্তি নয়। ভোলা লাখো মানুষের জন্মভূমি। ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, এবার নদী লুটের সংস্কৃতিরও অবসান হোক। ভোলাকে বাঁচান, নদীকে বাঁচান, মানুষের বসতভিটা ও অস্তিত্ব রক্ষা করুন।

আবুল কালাম আজাদ
যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সাংবাদিক ও কলামিস্ট

  • সর্বশেষ