গরীব নেওয়াজ: এ পর্যন্ত বিভিন্ন লেখায় ভাষার উৎপত্তি, ধর্ম, বিকাশ ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করেছি। মাতৃভাষা এবং বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কেও বলেছি। আবার বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের অনীহা ও উদাসীনতা সম্পর্কে যেমন বলেছি, তেমন বাংলা ভাষার জটিলতা, দুর্বলতা এবং দুরবস্থা সম্পর্কেও লিখেছি। কীভাবে পণ্ডিতরা ভাষাটাকে ক্রমশ জটিল করে সাধারণ মানুষকে ভাষা বিমুখ করে তুলছেন, তাও দেখিয়েছি। বানানের সীমাহীন জটিলতা ও বিশৃঙ্খলা সম্পর্কে অনেক বিষয় আলোচনা করেছি। ভাষার দুরবস্থার কারণগুলো নিয়ে কথা বলেছি। এখন সে দুরবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে আলোচনা করা যাক। বাংলা ভাষার দুরবস্থার মূল কারণ এর বর্ণবাহুল্য এবং শব্দের জাত-পাত অনুসারে তার প্রয়োগ। বর্ণ কমানোর কথা বললেই পণ্ডিতরা ভাষার সৌন্দর্য, কৌমার্য নষ্ট হলো বলে হাহাকার করে ওঠেন। তাদের অবস্থা হচ্ছে, ঐসব মেয়েদের মতো, যারা ফিগারের সৌন্দর্য ঠিক রাখার নামে এমনভাবে খাদ্যগ্রহণ নিয়ন্ত্রণ (ডায়েট কন্ট্রোল) করে যে, শেষ পর্যন্ত শরীরই শেষ।
বর্ণ সংস্কার সম্পর্কে বলার পূর্বে বাংলা ভাষার বর্ণ নির্ধারণ, বর্ণের তালিকা প্রণয়ন ও সাজানো তথা বর্ণমালা সম্পর্কে কিছু বলা প্রয়োজন। এক সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের ড. বেগম জাহান আরা এ সম্পর্কে বিষদ আলোচনা করেছেন তাঁর সর্বস্তরে বাঙলা ভাষা এবং আমরা’ নামক বইতে। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু প্রসঙ্গে অনেক কথা বললেও এবং অনেক তথ্য দিলেও তাঁর মতো ভাষা পণ্ডিতের লেখায় এত বানান ভুল ও কিছু ক্ষেত্রে বাক্য গঠনের সামঞ্জস্যহীনতা আমাকে এই সিদ্ধান্তে আসতে বাধ্য করেছে যে, পণ্ডিতরা নিজেরাই সঠিক বানান কী তা জানেন না, কেউ শুদ্ধ বাংলা লিখতে জানেন না। জানা যায় স্বয়ং ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান নাকি একবার বলেছিলেন, বাংলা ভাষার বানানের জটিল সমীকরণ আমাকে হতাশ করে লিখতে গিয়ে ভয়ে থাকি।' বিখ্যাত বাংলা ভাষা গবেষক অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়ও এ ধরনের মন্তব্য ব্যক্ত করেছিলেন।
বাংলা ভাষার বর্ণ ও ধ্বনি সম্ভারকে নিশ্চিতরূপে চিহ্নিত করতে গিয়ে পণ্ডিত ব্যক্তিরা ব্যাকরণের সূচনাতেই স্বর ও ব্যঞ্জন বর্ণের সংখ্যা নিয়ে বিপাকে পড়েছিলেন। রামমোহন রায় তাঁর ব্যাকরণ বই, যা বাংলায় ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’ নামে প্রকাশিত হয় তাতে লিখেছিলেন, গৌড়ীয়রা সংস্কৃত ব্যাকরণানুসারে তাঁহাদের অক্ষর সকলকে ৩৪ হল বা বর্ণে এবং ১৬ স্বরে বিভক্ত রিয়াছেন, কিন্তু ইহাদের মধ্যে অনেক অক্ষর গৌড়ীয় ভাষাতে উচ্চারণে আইসে না, কেবল সংস্কৃত পদের ব্যবহার ভাষায় যখন করেন, তখন ঐ সকল অক্ষরকে লিখিবার প্রয়োজন হয়। তিনি আরও বলেছেন : ‘ণ, ষ, অন্তস্থ-ব, য, ঋ, ঋৃ (যুক্ত ঋ), ৯, ৯/৯ (যুক্ত লি), অং, অঃ—এই কয় অক্ষর সংস্কৃত পদ ব্যতিরেকে গৌড়ীয় ভাষায় প্রাপ্ত হয় না। দেখা যাচ্ছে, সেকালে স্বরবর্ণের সংখ্যা ছিল ১৬টি এবং ব্যঞ্জনবর্ণের সংখ্যা ছিল ৩৪টিঁ। এরপর ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা বর্ণমালাকে নতুন করে সাজিয়েছিলেন। তিনি যুক্ত-ঋ (ঋৃ), এবং যুক্ত-৯ (৯/৯) বাদ দিয়েছিলেন, কারণ এর প্রয়োগ ছিল না। আর তিনি ং (অনুস্বার), এবং ঃ (বিসর্গ)-কে ব্যঞ্জনবর্ণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন এবং ড়, ঢ়, য়, ঁ (চন্দ্রবিন্দু) এই চারটি বর্ণের প্রচলন করেছিলেন। অবশ্য ড় এবং তিনি প্রচলন করেছিলেন কিনা, না আগে থেকেই ছিল তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এতে স্বরবর্ণের সংখ্যা দাঁড়ালো বারটি।
অন্যদিকে রামমোহন রায় যে ৩৪টি ব্যঞ্জনবর্ণ সনাক্ত করেছিলেন তার সঙ্গে বিদ্যাসাগর ং, ঃ, ড়, ঢ়, য়, ঁ এই ছয়টি বর্ণ যোগ করে ৪০টি ব্যঞ্জনবর্ণের তালিকা প্রণয়ন করেন। পৌনে দুই শ বছর ধরে এই তালিকাই চলছে। অবশ্য কিছুদিন আগে স্বরবর্ণ হতে ৯ (লি) এবং ব্যঞ্জনবর্ণ হতে অন্তস্থ-ব বাদ দেওয়া হয়েছে। আজ পর্যন্ত ঋ স্বরধ্বনি না হওয়া সত্ত্বেও স্বরবর্ণ হতে তা বাদ দেওয়ার ব্যাপারে এবং ণ, ষ, য, ৎ, ঞ-সহ আরও কয়েকটি অনুপস্থিত ধ্বনি সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি, কিংবা এ্যা স্বরধ্বনির ব্যাপারে কোনো কিছু চিন্তা করিনি। ঁ(চন্দ্রবিন্দু)কে যে ব্যঞ্জন বলা যায় না, তাও ভাবিনি। অবশ্যই বলতে হয়, সেযুগে বাংলা গদ্যরীতির ভাষাকে পূর্ণরূপ দেওয়া-সহ বাংলা বর্ণমালার বিন্যাসের ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগর এক বিপ্লবী ভূমিকা রেখে গিয়েছেন। এছাড়া তিনি ল্যাটিন থেকে এনে বাংলায় কমা, সেমিকোলন ইত্যাদি যতি চিহ্নের প্রচলন করেন। উল্লেখ্য পূর্বে বাংলায় শুধু এক দাঁড়ি, দুই দাঁড়ি আর কোনো যতি চিহ্ন ব্যবহারে ছিল না।
বর্ণবাহুল্যের কথা নতুন নয়। আগেই বলেছি, প্রথম যুগের ব্যাকরণবিদ ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড বাংলা ভাষায় বিশৃঙ্খলার জন্য বর্ণবাহুল্য ও বানানের জটিলতাকেও দায়ী করেছেন। ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা একাডেমির তৎকালীন পরিচালক সৈয়দ আলী আহসানের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি কয়েকটি বর্ণ ও কার বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেন। পরবর্তীকালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-সহ গঠিত কমিটিও কয়েকটি বর্ণ, কার ও ফলা বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করে। এমনকি ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বানান সমিতি কতগুলো বর্ণ বাদ দেওয়ার কথা বলেছে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বানানের জটিলতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তা ঠিক করার জন্য কামাল পাশার মতো একজন শাসক কামনা করেছিলেন। এসব ব্যাপারে আগেই বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এককথায় বর্ণ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনেক আগে থেকেই, বিশেষ করে চলিত ভাষা ব্যবহার হওয়া থেকেই গভীরভাবে উপলব্ধি করা হয়ে আসছে। কিন্তু আমাদের পণ্ডিতরা যারা রবীন্দ্রনাথ বা ড. শহীদুল্লাহ্-এর চেয়েও বেশি জ্ঞানী, বাংলা ভাষাকে বেশি ভালোবাসেন, তাদের বিরোধিতার জন্য আজ পর্যন্ত বর্ণসংস্কার সম্ভব হয়নি। অথচ এর কারণে আজ বাংলা ভাষা মৃত্যুর সম্মুখীন। বর্ণসংস্কার নিয়ে এখন কোনো উচ্চবাচ্যও নেই। বর্ণবাহুল্যের কথা বলছিলাম। এরপর আমরা যে বর্ণগুলোর কারণে আমাদের ভাষায় এত জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে, যে বর্ণগুলো ধীরে-ধীরে আমাদের ভাষার শরীরে টিউমারে পরিণত হয়েছে এবং ভাষাকে মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, সে বর্ণগুলো নিয়ে আলোচনা করব। উল্লেখ্য এর পূর্বে এক লেখায় দেখিয়েছি, সংজ্ঞা/সূত্র অনুযায়ী ঈ ঊ ঋ ঐ ঔ-সহজ ১৩টি বর্ণ বাংলা ভাষার বর্ণই নয়। ৪-৬-২৪। ফেসবুক থেকে