শিরোনাম
◈ দিল্লিতে সিজেপি নেতাদের আটক, আগেই আন্দোলনের পরবর্তী নেতৃত্ব ঠিক করে রেখেছিলেন প্রতিষ্ঠাতা ◈ মালয়েশিয়ায় আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় যৌথ চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশের হিরা ◈ শেখ হাসিনার সঙ্গে মাঝেমধ্যে কথা হয়, তিনি দেশে ফিরতে চান: জি এম কাদের (ভিডিও) ◈ মানববর্জ্য ও কৃষিজ বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদন, গবেষকদের পাশে থাকার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর ◈ ‘ভোট চুরির প্রমাণ চেয়েছেন রাষ্ট্রপতি, আমাদের কাছে তা আছে’: রাহুল গান্ধী ◈ খুলনার চার থানায় বিশেষ অভিযান, পুলিশ সদস্যদের একা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা ◈ দিল্লিতে ধর্না থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আটক, কারণ জানাল পুলিশ ◈ ২০২৭ সালের হজ মিশন ভিসা পেতে ২৭০ এজেন্সিকে জরুরি নির্দেশ, তথ্য জমার শেষ সময় রোববার ◈ চুরির অপরাধে বাতিল হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা, স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি ◈ শেষ মুহূর্তে বরু‌শিয়া ডর্টমুন্ডের কা‌ছে হার এড়া‌লো ব্রেমেন

প্রকাশিত : ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৩:২২ দুপুর
আপডেট : ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৩:৩৬ দুপুর

প্রতিবেদক : মনিরুল ইসলাম

আমদানি কমানোর নতুন সম্ভাবনা

মানববর্জ্য ও কৃষিজ বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদন, গবেষকদের পাশে থাকার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর

মনিরুল ইসলাম: মানববর্জ্য, পয়ঃশোধনাগারের বর্জ্য, রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট এবং কৃষিজ অবশিষ্টাংশ থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের উদ্ভাবনী প্রযুক্তি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) গবেষকদের উদ্ভাবিত এ প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে সফল হলে দেশের জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

আজ শনিবার  ১০ অক্টোবর  রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের উদ্ভাবনী প্রকল্পের প্রদর্শনী পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী এ আশ্বাস দেন। এ সময় গবেষকরা তাঁদের প্রযুক্তি, গবেষণার অগ্রগতি এবং দেশে বাণিজ্যিকভাবে জ্বালানি তেল উৎপাদনের সম্ভাবনা তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) বিষয়টি জানান।

১০ বছরের গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি

Advertisement

কুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় প্রায় ১০ বছর ধরে বর্জ্য থেকে জৈব অপরিশোধিত তেল বা বায়োক্রুড উৎপাদনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন গবেষকরা।

এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘হাইড্রোথার্মাল লিকুইফ্যাকশন’ (এইচটিএল) প্রযুক্তি। এ প্রযুক্তিতে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে পানির উপস্থিতিতে জৈব বর্জ্যকে তরল জ্বালানিসদৃশ পদার্থে রূপান্তর করা হয়।

গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গবেষণাগারের পরীক্ষায় বর্জ্য থেকে ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বায়োক্রুড উৎপাদনের ফল পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ডিজেলসমৃদ্ধ বায়োক্রুড উৎপাদনেও সাফল্য এসেছে।

মানববর্জ্য, পয়ঃশোধনাগারের বর্জ্য, রান্নাঘরের বর্জ্য এবং কৃষিজ অবশিষ্টাংশকে সম্ভাব্য কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা গেলে একদিকে বর্জ্যের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে জ্বালানি উৎপাদনের বিকল্প উৎসও তৈরি হতে পারে।

তবে গবেষণাগারে পাওয়া উৎপাদনের হার এবং বাণিজ্যিক পর্যায়ে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানির পরিমাণ এক নয়। প্রযুক্তিটির প্রকৃত কার্যকারিতা, জ্বালানির গুণগত মান, উৎপাদন ব্যয় ও পরিবেশগত প্রভাব আরও যাচাই করতে হবে।

১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকায় পাইলট প্ল্যান্ট

প্রযুক্তিটির বাস্তব প্রয়োগ ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যাচাই করতে পরবর্তী ধাপে পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছেন গবেষকরা।

প্রস্তাবিত প্ল্যান্টে প্রতিদিন ১ থেকে ৩ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্ল্যান্টের মাধ্যমে বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের কার্যকারিতা, উৎপাদন ব্যয় এবং প্রযুক্তিটির বাণিজ্যিক উপযোগিতা যাচাই করা হবে।

গবেষকদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, পাইলট প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আনুমানিক ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।

প্রকল্পটির সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এখন প্রকল্পটির পরবর্তী ধাপে অর্থায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রযুক্তিগত যাচাইয়ের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বছরে সাশ্রয় হতে পারে হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা

গবেষকদের ধারণা, প্রযুক্তিটি সফলভাবে বাণিজ্যিক পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে।

তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, এ সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হলে বছরে আনুমানিক ৬ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতে পারে।

বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। ফলে দেশীয় উৎস থেকে বিকল্প জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলে আমদানির ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের এই হিসাব এখনো গবেষকদের প্রাথমিক সম্ভাব্যতা-সংক্রান্ত অনুমান। প্রযুক্তিটি বড় পরিসরে প্রয়োগের পর প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা, কাঁচামালের প্রাপ্যতা, প্রক্রিয়াকরণ ব্যয় এবং উৎপাদিত তেলের ব্যবহারযোগ্যতা যাচাই করেই এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষায় নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশে নগর বর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য এবং কৃষিজ অবশিষ্টাংশের কার্যকর ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এসব বর্জ্য যথাযথভাবে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করা না হলে পানি, মাটি ও পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের প্রযুক্তি সফল হলে বর্জ্যের একটি অংশকে মূল্যবান সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব হবে। এতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিকল্প পদ্ধতি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি দেশীয় জ্বালানি শিল্পেও নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে।

তবে প্রযুক্তিটির পরিবেশগত সুফল নিশ্চিত করতে বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াকরণে জ্বালানি ও পানির ব্যবহার এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের পর অবশিষ্ট পদার্থের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা বিবেচনায় নিতে হবে। উৎপাদিত বায়োক্রুডকে প্রচলিত জ্বালানি ব্যবস্থায় ব্যবহার করার আগে প্রয়োজনীয় পরিশোধন ও মান যাচাইও গুরুত্বপূর্ণ।

বাণিজ্যিক বাস্তবায়নই এখন বড় চ্যালেঞ্জ

গবেষণাগারে সাফল্য অর্জনের পর কোনো প্রযুক্তিকে শিল্পপর্যায়ে নিয়ে যেতে উৎপাদন ব্যয়, নিরবচ্ছিন্ন কাঁচামাল সরবরাহ, যন্ত্রপাতির সক্ষমতা এবং উৎপাদিত পণ্যের মান নিশ্চিত করতে হয়।

এ ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত পাইলট প্ল্যান্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্ল্যান্টের পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রযুক্তিটির বাস্তব উৎপাদন সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক কার্যকারিতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।

গবেষকদের প্রত্যাশা, সরকারি সহযোগিতা পেলে প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিক পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব হবে। এতে দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলা, আমদানিনির্ভরতা কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে অবদান রাখার সুযোগ তৈরি হবে।

প্রকল্পটি পরিদর্শনকালে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পাবলিক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সদস্য অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন, কুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাছুদ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

  • সর্বশেষ