মনিরুল ইসলাম : সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে বারবার মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা রোধ করতে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এসব সমস্যা নিরসনে প্রকল্প প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত নিবিড় তদারকি, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাসহ বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
আজ বুধবার ৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব কথা বলেন। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
অধিবেশনে কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান— বারবার প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা রোধে সরকারের নির্দেশনা আছে কি না এবং থাকলে সেগুলো বাস্তবায়নে মনিটরিংয়ের কী পরিকল্পনা রয়েছে।
এই প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, "বাংলাদেশে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণত একটি মাত্র কারণে হয় না। বরং প্রকল্প প্রণয়ন, অনুমোদন, ভূমি অধিগ্রহণ, অর্থায়ন, ক্রয় প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনার একাধিক দুর্বলতা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই সমস্যা তৈরি করে।"
তিনি আরও বলেন, বিষয়গুলো বর্তমান সরকারের দৃষ্টিগোচর হওয়ার পর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট কারণগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— দুর্বল ফিজিবিলিটি স্টাডি, ব্যয়ের সঠিক প্রাক্কলন না হওয়া, প্রকল্প এলাকা নির্বাচনে দুর্বলতা, ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরে বিলম্ব, ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, যথাসময়ে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না দেওয়া এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাব।
সমস্যা নিরসনে সরকারের ১৩ দফা পদক্ষেপ:
প্রকল্পের এই দীর্ঘসূত্রিতা ও অপচয় রোধে সরকারের নেওয়া উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলো সংসদে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। সেগুলো হলো:
১. নতুন প্রকল্প গ্রহণের পূর্বে নির্ভুল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) প্রণয়ন নিশ্চিত করা।
২. প্রকল্প অনুমোদনের পর বাস্তবায়ন প্রস্তুতি ত্বরান্বিত করা।
৩. প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন সংক্রান্ত বিদ্যমান নির্দেশিকা সময়োপযোগী করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
৪. চলমান প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি মনিটরিং জোরদার করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগে ড্যাশবোর্ড স্থাপন।
৫. নিয়মিত প্রকল্প পর্যালোচনা ও মাঠপর্যায়ে নিবিড় তদারকি বৃদ্ধি করা।
৬. ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তর দ্রুত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা।
৭. নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ না হলে, বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণ নিরূপণ করে দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ।
৮. যেসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৩০ শতাংশের কম, সেগুলোর উপযোগিতা ও কার্যকারিতা বিবেচনা করে পুনর্বিন্যাস, স্কোপ পরিবর্তন বা চলমান রাখার বিষয়ে মন্ত্রণালয়/বিভাগ কর্তৃক যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ।
৯. বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প গ্রহণ না করে সমন্বিত কর্মসূচির অধীনে গুচ্ছ প্রকল্প গ্রহণের নির্দেশনা।
১০. সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ই-জিপি (e-GP) ব্যবহারের সম্প্রসারণ।
১১. প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে পেশাগত যোগ্যতা, দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান এবং দায়িত্বের ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণ। এ লক্ষ্যে বিদ্যমান নীতিমালা হালনাগাদ করা হচ্ছে।
১২. সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) মডেলের প্রকল্প গ্রহণের বিষয়ে গুরুত্ব প্রদান।
১৩. সরকারি ক্রয় অধিকতর প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহিতামূলক করতে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুল ২০২৫’ হালনাগাদ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।