ইফতেখার আলম বিশাল, রাজশাহী প্রতিনিধি: সাড়ে তিন বছর আগে মারা যাওয়া এক ব্যক্তির নামে রাজশাহীর একটি গোরস্থানে সম্প্রতি একটি মরদেহ দাফন করা হয়েছে—এমন তথ্য ঘিরে তৈরি হয়েছে রহস্য। সরকারি নথিতে দাফন করা মরদেহের পরিচয় হিসেবে রাজশাহীর পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক সহকারী প্রকৌশলী হেফাজ উদ্দিনের নাম উল্লেখ রয়েছে। নথিতে বলা হয়েছে, তিনি ২০২৬ সালের ১০ জুলাই ভারতের কলকাতার একটি হাসপাতালে মারা যান।
তবে তার বাড়ির লোকজন, প্রতিবেশী ও সাবেক সহকর্মীদের বক্তব্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকা তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, হেফাজ উদ্দিনের মৃত্যু হয়েছিল ২০২৩ সালের মার্চে। এমনকি তার জানাজায় উপস্থিত থাকার কথাও জানিয়েছেন পারিবারিকভাবে পরিচিত একজন।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে—২০২৬ সালের ২৮ জুলাই রাতে টিকাপাড়া গোরস্থানে হেফাজ উদ্দিনের নামে দাফন করা মরদেহটি আসলে কার?
ঘটনাটি ঘটে গত ২৮ জুলাই রাত আনুমানিক ২টা ১০ মিনিটে রাজশাহী নগরীর টিকাপাড়া গোরস্থানে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যরাতে একটি অ্যাম্বুলেন্স ও দুটি দামি গাড়ি গোরস্থানের সামনে এসে থামে। অ্যাম্বুলেন্স থেকে একটি কফিন নামিয়ে কয়েকজন ব্যক্তি গোরস্থানের ভেতরে প্রবেশ করেন।
সে সময় গোরস্থানে ছিলেন নাইটগার্ড করিম ও স্থানীয় চায়ের দোকানি সিকান্দার আলী।
সিকান্দার আলীর ভাষ্য, এত রাতে মরদেহ দাফনের কারণ জানতে চাইলে সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা জানান, মরদেহটি ভারতের কলকাতা থেকে এসেছে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই ব্যক্তি মারা যান। পথে দেরি হওয়ায় রাতে দাফন করতে হচ্ছে।
তার দাবি, অ্যাম্বুলেন্সসহ তিনটি গাড়িতে মোট চারজন ছিলেন। গোরস্থানের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, বাদশা নামে এক ব্যক্তি আরও দুজনকে সঙ্গে নিয়ে কবর খুঁড়ছেন।
কবর খোঁড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বাদশা জানান, তিনি বিষয়টির বিস্তারিত জানেন না। তাকে কবর খুঁড়তে বলা হয়েছে, তাই তিনি কবর খুঁড়ছেন। এর আগেও ওই স্থানে দুটি কবর খোঁড়া হয়েছিল, তবে সেদিন মরদেহ আসেনি বলে জানান তিনি।
ঘটনার পর গোরস্থান কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দাফন করা মরদেহের পরিচয় হিসেবে হেফাজ উদ্দিনের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), সিটি করপোরেশনের তথ্য ফর্ম এবং সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ের সনদ জমা দেওয়া হয়েছে।
সিটি করপোরেশনের তথ্য ফর্মে হেফাজ উদ্দিনের মৃত্যুর তারিখ ১০ জুলাই ২০২৬ এবং মৃত্যুর স্থান হিসেবে ভারতের কলকাতার মনিপাল হাসপাতাল উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ফর্মে তার ছেলে তৌফিক তানভীর এবং আবু জাফর তমালকে ‘নাতি’ হিসেবে সনাক্তকারী উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে তৌফিক তানভীরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে বলেন, “এটা আমাদের পারিবারিক বিষয়। আপনাকে এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে আমি বাধ্য নই।”
তবে পরবর্তীতে যোগাযোগের সময় তিনি দাবি করেন, দাফন করা কফিনে তার বাবা হেফাজ উদ্দিনের মরদেহই ছিল।
অন্যদিকে, তথ্য ফর্মে সনাক্তকারী হিসেবে উল্লেখ থাকা আবু জাফর তমাল জানান, তিনি ওই রাতে উপস্থিত ছিলেন এবং তৌফিক তানভীর তার বন্ধু। তবে এর বাইরে তিনি কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি।
নথিতে হেফাজ উদ্দিনের মৃত্যুর তারিখ ২০২৬ সালের ১০ জুলাই উল্লেখ থাকলেও তার এনআইডিতে থাকা ঠিকানায় গিয়ে পাওয়া যায় ভিন্ন তথ্য।
বাড়ির গার্ড সাইফুল জানান, হেফাজ উদ্দিন প্রায় তিন-চার বছর আগে মারা গেছেন। তার পেটে ঘা হয়েছিল। ঢাকায় চিকিৎসা চলছিল এবং পরে তাকে ভারতে নেওয়ার কথা ছিল। তবে ভারতে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয় বলে জানান তিনি।
সাইফুলের ভাষ্য, হেফাজ উদ্দিনের স্ত্রী, দুই ছেলে এবং এক মেয়ে-জামাই বর্তমানে ঢাকায় বসবাস করেন। হেফাজ উদ্দিনের ব্যবহৃত একটি মোবাইল নম্বরও তিনি দেন, যা বর্তমানে তার স্ত্রী ব্যবহার করেন।
ওই নম্বরে পরপর দুই দিন একাধিকবার ফোন করা হলেও কেউ কল রিসিভ করেননি।
হেফাজ উদ্দিনের একাধিক প্রতিবেশী ও স্থানীয় দোকানদারও জানান, তিনি আনুমানিক চার থেকে পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন।
অনুসন্ধানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি পোস্টে হেফাজ উদ্দিনের মৃত্যুর তারিখ
১৭ মার্চ ২০২৩ উল্লেখ পাওয়া যায়।
বিষয়টি নিশ্চিত করতে তার পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক সহকর্মী এবং রাজশাহীতে তার বাড়ি দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা মিন্টুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
মিন্টু বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হননি। বরং তিনি বলেন, “এ বিষয় নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করলে আপনার বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।”
এরপর তিনি রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতা জামাত খানের সঙ্গে হেফাজ উদ্দিনের পারিবারিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন।
জামাত খানের সঙ্গে যোগাযোগ করে হেফাজ উদ্দিনের মৃত্যুর সময় জানতে চাইলে তিনি বলেন, “অনেকদিন আগে তিনি মারা গেছেন। আমি তার জানাজায় উপস্থিত ছিলাম।”
হেফাজ উদ্দিন তার আত্মীয় কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ঐরকমই কিছুটা।”
দাফনের প্রত্যক্ষদর্শী সিকান্দার আলীর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি নিজেই কফিন ধরে সহযোগিতা করেন এবং মাটি দেন। তবে মরদেহের সঙ্গে আসা ব্যক্তিদের কাউকে কফিনে হাত দিতে, মাটি দিতে কিংবা দোয়া পড়তে দেখা যায়নি বলে দাবি তার।
এ ছাড়া কফিনটির আকৃতি নিয়েও তার মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়। তার ভাষ্য, কফিনটি অনেকটা চা পাতার বাক্স বা মুরগির বাক্সের মতো দেখতে ছিল এবং ফাঁকা অংশ দিয়ে সাদা কাফনের কাপড় দেখা যাচ্ছিল।
তবে কফিনের ভেতরের মরদেহ তিনি সরাসরি শনাক্ত করতে পারেননি।
স্থানীয়দের ও সাবেক সহকর্মীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হেফাজ উদ্দিন রাজশাহীর পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক সহকারী প্রকৌশলী ছিলেন। অবসর গ্রহণের পর তিনি মারা যান বলে তারা জানিয়েছেন।
কিন্তু সরকারি নথিতে তার মৃত্যুর তারিখ ২০২৬ সালের ১০ জুলাই উল্লেখ করা হয়েছে। আবার স্থানীয়দের বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট এবং তার সাবেক পরিচিতদের বক্তব্যে উঠে এসেছে ২০২৩ সালে তার মৃত্যুর তথ্য।
এই দুই ধরনের তথ্যের মধ্যে পার্থক্যই পুরো ঘটনাকে রহস্যময় করে তুলেছে।
ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে হেফাজ উদ্দিনের মৃত্যুসনদ, ভারতের মনিপাল হাসপাতালের চিকিৎসা ও মৃত্যুসংক্রান্ত নথি, মরদেহ দেশে আনার কাগজপত্র, অ্যাম্বুলেন্সের নথি, সিটি করপোরেশনের তথ্য ফর্ম এবং টিকাপাড়া গোরস্থানের দাফন রেজিস্টার যাচাই করা জরুরি।
একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শনাক্তকরণও করা যেতে পারে।
কারণ মূল প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত ২০২৩ সালে মারা যাওয়ার তথ্য থাকা হেফাজ উদ্দিনের নামে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে টিকাপাড়া গোরস্থানে যে মরদেহ দাফন করা হয়েছে, সেটি আসলে কার?
নথিতে থাকা তথ্যের সঙ্গে স্বজন, প্রতিবেশী ও সাবেক সহকর্মীদের বক্তব্যের এই অসঙ্গতির নিরসন না হলে ঘটনাটি ঘিরে তৈরি হওয়া প্রশ্নের উত্তর মিলছে না।