বাংলাদেশি সাধারণ পাসপোর্টধারীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে লাওস। দেশটির রাজধানী ভিয়েনতিয়েনে বৃহস্পতিবার (১৩ এপ্রিল) বাংলাদেশ ও লাওসের মধ্যে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্র দপ্তর পরামর্শ বৈঠকে (এফওসি) বাংলাদেশ এ অনুরোধ জানালে লাওসের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া হয়।
১৯৮৮ সালে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর ৩৮ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম দুই দেশের মধ্যে পররাষ্ট্র দপ্তর পরামর্শ বৈঠক অনুষ্ঠিত হল। বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব রাষ্ট্রদূত আসাদ আলম সিয়াম এবং লাওসের পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী আনৌপার্ব ভংনোরকেও নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।
সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, সক্ষমতা বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কূটনৈতিক প্রশিক্ষণ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশবান্ধব পর্যটন, জলবায়ু পরিবর্তন, কনস্যুলার সহযোগিতা ও উচ্চশিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা।
কনস্যুলার সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাধারণ পাসপোর্টধারী নাগরিকদের জন্য লাওসের ভিসা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো সহজ করার অনুরোধ জানায় ঢাকা। এতে ইতিবাচক সাড়া দেয় ভিয়েনতিয়েন। দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও যাতায়াত বাড়াতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে আরো কর্মী নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়।
দুই দেশ শ্রম সহযোগিতার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) প্রক্রিয়া শুরুর ব্যাপারে একমত হয়েছে। এর মাধ্যমে লাওসে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এছাড়া সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বাড়াতে একটি সমঝোতা স্মারক করার বিষয়ে দুই পক্ষ সম্মত হয়েছে। জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো, তরুণ কূটনীতিকদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং পর্যটন সহযোগিতা জোরদারের বিষয়েও একমত হয়েছে দুই দেশ। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর মসৃণ রূপান্তরের কৌশল ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। দুই দেশই মনে করে, বর্তমানে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ সম্ভাবনার তুলনায় কম। তাই বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়াতে এবং পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়।
দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও একমত হয়েছে বাংলাদেশ ও লাওস। এ লক্ষ্যে দুই দেশের জাতীয় পর্যায়ের ব্যবসায়ী ও শিল্প চেম্বারগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও প্রতিনিধিদল বিনিময়ের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের ওষুধ ও কৃষিপণ্যের বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছে লাওস।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে লাওসের সমর্থনের জন্য দেশটির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিজ ভূমিতে মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে লাওসের অব্যাহত সমর্থন চাওয়া হয়।
বাংলাদেশের আসিয়ান খাতভিত্তিক সংলাপ অংশীদার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে (আরসিইপি) সদস্য হওয়ার উদ্যোগের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে লাওস।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দুই দেশ বাংলাদেশ ও লাওস এ বিষয়ে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো ও এর প্রভাব প্রশমনের কৌশল নিয়ে অভিজ্ঞতা ও সর্বোত্তম চর্চা বিনিময়ের বিষয়ে একমত হয়েছে উভয় পক্ষ।
বৈঠকের শেষে বাংলাদেশ ও লাওসের প্রতিনিধিদলের প্রধানরা একটি ফলাফলসংক্রান্ত দলিলে স্বাক্ষর করেন। পরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব ও তার প্রতিনিধিদলের সম্মানে লাওসের পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী নৈশভোজের আয়োজন করেন।