রাজধানী ঢাকা এখন যানজটের নগরী। চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালকে কেন্দ্র করে যানজটের বাইরেও অবৈধভাবে রাস্তার ওপরই রয়েছে একাধিক বাস স্টপেজের নামে স্বঘোষিত বাস টার্মিনাল। যেমন নটর ডেম কলেজের বিপরীতের রাস্তা, রাজারবাগ পুলিশ লাইনের কাছে গ্রীন লাইনের বাস স্টপেজ, শ্যামলী, কল্যাণপুর ও আসাদগেটের কাছে বাস স্টপেজ। ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের দোলাইরপাড় চৌরাস্তায় বাস স্টপেজ। সব মিলিয়ে নগরজুড়েই রয়েছে বাস স্টপেজের নামে অসংখ্য বাস টার্মিনাল। আর চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে শৃঙ্খলা বলে কিছু নেই। এতে করে ওই সব এলাকার রাস্তাজুড়ে সকাল-সন্ধ্যায় লেগে থাকে তীব্র যানজট। আর নগর পরিবহন চলাচলে তো বাস স্টপেজ বলে কোনো অস্তিত্ব নেই। যেখানে সেখানে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো সব রুটের বাসের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। বিশেষ করে মালিবাগ থেকে রামপুরা হয়ে কুড়িল রোডে বাস স্টপেজ বলে কোনো নির্দিষ্ট স্থান নেই। যেখানেই যাত্রী সেখানেই থামে বাস। একইভাবে যাত্রীরা তাদের খেয়াল খুশিমতো নামতেও পারেন। এসব কারণে নগরজুড়ে যানবাহনের বিশৃঙ্খলা ঢাকাকে যানজটের শহর বানিয়ে ফেলেছে।
রাজধানীর যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ৪টি প্রধান আন্তঃনগর বাস টার্মিনাল অতিদ্রুত শহরের বাইরে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ১৫ জুন সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। চারটি আন্তঃনগর বাস টার্মিনাল হলোÑ ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান বাস টার্মিনাল, গাবতলী বাস টার্মিনাল, মহাখালী বাস টার্মিনাল এবং সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী বাস টার্মিনাল। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান বাস টার্মিনালটি কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর হবে। মহাখালী বাস টার্মিনাল অস্থায়ীভাবে যাবে পূর্বাঞ্চলে এবং পরে স্থায়ীভাবে টঙ্গীর কাছে স্থানান্তরিত হবে। গাবতলী আন্তঃনগর বাস টার্মিনাল হেমায়েতপুর এবং সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল যাবে কাঁচপুরে।
তবে সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া ছাড়া অন্য বাস টার্মিনাল আপাতত সরছে না রাজধানী থেকে। সায়েদাবাদ, গাবতলী ও মহাখালী টার্মিনাল থেকে আলাদা করা হচ্ছে বাস ডিপো। পূর্বাচল, নারায়ণগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জে প্রাথমিকভাবে পছন্দ করা হয়েছে ডিপোর জায়গা। প্রশ্ন উঠেছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা সত্ত্বেও কেন সরানো যাচ্ছে না বাস টার্মিনালগুলো? সড়ক পরিবহন ও সেতু, নৌপরিবহন এবং রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল ঢাকার বাইরে সরিয়ে নেয়া হবে। গত ১৮ জুন বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে গণমাধ্যম কেন্দ্রে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) আয়োজিত ‘বিএসআরএফ সংলাপে’ তিনি এ কথা বলেন। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা আপাতত বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তার মানে আগামী আড়াই বছরেও ঢাকার যানজট কমছে না। ইতোমধ্যে মহাখালী টর্মিনাল থেকে কিছু বাস পূর্বাচলে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সেখানেও যেতে অনিচ্ছুক চালকরা। তাদের যুক্তিÑ সেখানে খাবারের কোনো দোকান নেই, গাড়ি মেরামতের জন্য মেকানিক পাওয়া যায় না, গাড়ি পরিষ্কার করার মতো পর্যাপ্ত পানি সরবরাহসহ আরো কিছু ঘাটতি রয়েছে। মোটকথা মহাখালী বাস টার্মিনাল মূলত বাস ডিপো হয়েই আছে। দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে আসা বাসগুলো এখানেই বিরতি নেয়। বাসের রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত, রঙ করার মতো কাজগুলোও করা হয় টার্মিনালে। বাসের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করানোয় টার্মিনালগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। যাত্রী ওঠানামা টার্মিনালের ভেতরে না হয়ে চলে যায় ব্যস্ততম সড়কে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম ইনকিলাবকে বলেন, টার্মিনালগুলো ঢাকার বাইরে যাবেÑ এটাই সত্য। এজন্য আমরা জায়গা নির্ধারণের কাজ করছি। আপাতত বাসগুলো ডিপোতে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। হঠাৎ করে ঢাকার বাইরে যদি চট্টগ্রামের একজন যাত্রীকে কাঁচপুরে নামিয়ে দেয়া হয় তখন ওই যাত্রী কিভাবে ঢাকায় আসবে। একইভাবে উত্তরাঞ্চলের কোনো যাত্রীকে যদি পূর্বাচলে নামিয়ে দেয়া হয় তারা কিভাবে শহরে আসবে। এজন্য আমরা চাচ্ছি একটা টার্মিনালে যত রকমের সুযোগ-সুবিধা থাকা দরকার সেগুলো পরিপূর্ণ করেই সেখানে টার্মিনাল স্থানান্তর করতে।
এদিকে গণপরিবহনে চাঁদাবাজির অভিযোগ বহু পুরনো। দেশের সড়ক পরিবহন শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। সারা দেশে সংগঠনটির আওতাভুক্ত ইউনিয়নের সংখ্যা ২৫৩। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই সংগঠনটি কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন শাজাহান খান। তার নেতৃত্বাধীন সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন সারাদেশের ২৫৩টি সংগঠন থেকে উচ্চহারে চাঁদা আদায় করতো। হাসিনার পতনের পর এই সংগঠনের দায়িত্বে আসেন শিমুল বিশ্বাস। তিনি আসার পর শ্রমিক সংগঠনগুলোর চাঁদাবাজি বন্ধ করে দেন। তবে সংগঠন পরিচালনার জন্য সমঝোতার ভিত্তিতে নামমাত্র কিছু টাকা নেয়া হয়। যার পরিমাণ খুবই সামান্য।
একইভাবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি, বাংলাদেশ বাস ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ ট্রাক কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতি পৃথক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এসব সংগঠনের আওতায় আবার দেশের প্রতিটি জেলায় একাধিক সংগঠন আছে। এসব সংগঠনও নির্দিষ্ট হারে টাকা আদায় করে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম ইনকিলাবকে বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কেউ বলতে পারবে না আমরা মালিকদের কাছ থেকে চাঁদা নেই। তিনি বলেন, আমরা কোম্পানির অধীনে গাড়ি পরিচালনা করি। প্রতিটি কোম্পানির পৃথক অফিস আছে, স্টাফ আছে, অফিস ভাড়া আছে। একাধিক মালিক মিলে একেকটা কোম্পানি চলে। তারা নিজেরা মিলে অফিস চালানোর জন্য নিজেরাই টাকা দেয়। এটাকে অনেকেই অন্যভাবে ব্যাখ্যা করে। এ প্রসঙ্গে পরিবহন বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান বলেন, টার্মিনাল মানে হলো, সেখানে বাস এসে যাত্রী নিয়ে চলে যাবে, কিন্তু টার্মিনালগুলো এখন ডিপো হয়ে গেছে। ঢাকার বাইরে যেমন টার্মিনাল ডিপো হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে, বাইরে নিয়ে গেলেও টার্মিনালগুলো যাতে ডিপো হয়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
সূত্র : ইনকিলাব