প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নয়াদিল্লিতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। আমন্ত্রণটি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক কূটনৈতিক সৌজন্যের সীমা পেরিয়ে এক ধরনের অস্বস্তিকর টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—নয়াদিল্লিতে এখনো অবস্থান করছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, ব্রিকসের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী আঞ্চলিক জোটগুলোর প্রধানদের যেমন আমন্ত্রণ জানানো হয়, তারেক রহমানকেও তেমনই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া দ্বিপাক্ষিক ভারত সফরের আমন্ত্রণও বহাল রয়েছে।
কাগজে-কলমে বিষয়টি স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্রনীতি কখনো কেবল কাগজে-কলমে চলে না। সময়, স্থান, ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট—সবকিছুরই অর্থ থাকে। এখানেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।
কেন এখন?
ভারত যদি কেবল বিমসটেক চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়ে থাকে, তাহলে সেটি একটি বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক আমন্ত্রণ। এ নিয়ে আপত্তির কারণ নেই। বরং বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজের অবস্থান তুলে ধরার এটি একটি সুযোগ।
কিন্তু একই সঙ্গে যদি দিল্লি দ্বিপাক্ষিক সফরের আমন্ত্রণও সামনে রাখে, তখন বিষয়টি ভিন্ন মাত্রা পায়।
কারণ, এই মুহূর্তে দিল্লি শুধু ভারতের রাজধানী নয়; সেটি শেখ হাসিনারও রাজনৈতিক আশ্রয়ের শহর। যিনি বাংলাদেশের ক্ষমতা থেকে উৎখাত হয়ে ভারতে অবস্থান করছেন এবং যাকে ঘিরে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের সবচেয়ে বড় অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
তার ওপর ভারতের সাবেক হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলির সাম্প্রতিক বক্তব্যও গুরুত্বহীন নয়। তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে যাননি; নিরাপত্তার স্বার্থে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী তাকে ভারতে পৌঁছে দিয়েছে। ভারতে আসার কিছুক্ষণ আগেও তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং তিনি ভারতে এসেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের ও গভীর সম্পর্কের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এই বক্তব্যের রাজনৈতিক অভিঘাত স্পষ্ট।
ঢাকা শেখ হাসিনার অধ্যায়কে অতীত বলে বিবেচনা করতে চাইলেও দিল্লি যে এখনো সেই অধ্যায়কে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেখছে না, রিভা গাঙ্গুলির বক্তব্য অন্তত সেই ধারণাকেই শক্তিশালী করে।
তাহলে প্রশ্ন উঠবে—যে রাষ্ট্র বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীকে রাজনৈতিকভাবে এতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখে, সেই রাষ্ট্রের রাজধানীতে বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যাবেন কোন রাজনৈতিক বাস্তবতায়?
আমন্ত্রণের ভাষাও কখনো কূটনীতি
আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—আমন্ত্রণপত্রে তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে কি না।
এখানে সতর্ক হওয়া দরকার। আমন্ত্রণপত্রের পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশ্যে না থাকলে এ নিয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। কিন্তু কূটনীতিতে ভাষা কখনো নিছক ভাষা নয়। একটি শব্দ কখনো রাষ্ট্রের অবস্থান প্রকাশ করে, আবার একটি শব্দের অনুপস্থিতিও প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
যদি কোনো আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা না হয়, তাহলে সেটি নিছক প্রটোকলগত বিষয়, নাকি তার পেছনে কোনো রাজনৈতিক হিসাব আছে—সেটি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
আর যদি আমন্ত্রণটি কেবল বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেটিকে দ্বিপাক্ষিক সফরের সঙ্গে একাকার না করাই বাংলাদেশের জন্য বেশি বুদ্ধিমানের কাজ।
কারণ রাষ্ট্রীয় সফরের মর্যাদা ও উদ্দেশ্য নিয়ে সামান্য অস্পষ্টতাও ভবিষ্যতে নানা ব্যাখ্যার জন্ম দিতে পারে।
শেখ হাসিনা দিল্লিতে, তারেক রহমান নয়াদিল্লিতে
এখানেই সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়টি। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যদি দিল্লি সফরে যান, আর একই সময়ে শেখ হাসিনা দিল্লিতে অবস্থান করেন, তাহলে সেই সফরকে কেবল প্রটোকল দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। সফরের প্রতিটি ছবি, প্রতিটি বৈঠক, প্রতিটি বক্তব্যের রাজনৈতিক পাঠ তৈরি হবে।
আর যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে?
রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে আমাদের আশঙ্কা প্রকাশের অধিকার আছে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া ‘চক্রান্ত’ বলার অধিকার নেই। তাই প্রশ্নটি চক্রান্তের নয়; প্রশ্নটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার।
একজন রাষ্ট্রনায়ক কোথায় যাবেন, সেটি শুধু আমন্ত্রণের বিষয় নয়। তিনি কোন পরিস্থিতিতে যাবেন, সেখানে তাঁর নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত, সফরের রাজনৈতিক বার্তা কী হবে এবং কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তার কূটনৈতিক দায় কে নেবে—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করা বাংলাদেশের স্বার্থে নয়। কিন্তু সম্পর্ক রক্ষার অর্থ নিজের কূটনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করা নয়।
কূটনীতিতে বন্ধুত্ব মানে আত্মসমর্পণ নয়
বাংলাদেশের উচিত ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে—কিন্তু মাথা নত করে নয়। প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে, বাণিজ্য থাকবে, সীমান্ত সহযোগিতা থাকবে, নিরাপত্তা সহযোগিতা থাকবে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রশ্নে কোনো আপস থাকবে না।
ভারতেরও বুঝতে হবে, বাংলাদেশ আর আগের বাংলাদেশ নেই। বাংলাদেশের জনগণ এখন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে আবেগ দিয়ে নয়, স্বার্থ দিয়ে বিচার করবে।
তাই দিল্লির আমন্ত্রণকে প্রত্যাখ্যান করতেই হবে—এমন কথা নয়। বরং আমন্ত্রণের ধরন, সফরের উদ্দেশ্য এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গভীরভাবে পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই পরিণত রাষ্ট্রনীতির পরিচয়।
বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে তারেক রহমানের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য একটি বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক সুযোগ। সেটিকে দ্বিপাক্ষিক ভারত সফরের সঙ্গে জুড়ে ফেলার প্রয়োজন আছে কি না, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
ইতিহাস কখনো হঠাৎ দরজা খুলে দেয়
ইতিহাসের দিকে তাকালে রাষ্ট্রীয় সফরের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অভিঘাতকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ১৯১৪ সালের ২৮ জুন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের যুবরাজ আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোতে রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়ে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। একটি হত্যাকাণ্ডই পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে ইউরোপকে এমন এক যুদ্ধে ঠেলে দেয়, যার আগুন শেষ পর্যন্ত বিশ্বযুদ্ধের রূপ নেয়।
আজকের দিল্লি সারায়েভো নয়। আজকের ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কও ১৯১৪ সালের ইউরোপের মতো নয়। ইতিহাসকে তাই ভয় দেখানোর জন্য ব্যবহার করার কোনো অর্থ নেই। কিন্তু ইতিহাস সতর্ক করে—রাষ্ট্রীয় সফর কখনো কখনো ইতিহাসের খুব কাছে দাঁড়িয়ে যায়।
সুতরাং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরকে আমরা বন্ধুত্বের পরীক্ষা হিসেবে দেখি, কিন্তু অন্ধ আস্থার পরীক্ষা হিসেবে নয়। দিল্লির দরজা খোলা থাকুক; ঢাকার দরজাও খোলা থাকুক। তবে কে কখন কোন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে, সেটি নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ—অন্য কেউ নয়।
কারণ কূটনীতির প্রথম শিক্ষা হলো—বন্ধুত্ব করা যায়, কিন্তু রাষ্ট্রের চাবি অন্যের হাতে দেওয়া যায় না।
সূত্র: ইনকিলাব