মনিরুল ইসলাম: রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বড় বোনকে হারানো কিশোর তাহসিন আব্দুল্লাহর মুখে আবারও ফুটেছে হাসি—তবে সেই হাসির পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর বেদনার এক ইতিহাস। দীর্ঘদিনের নীরব কষ্ট পেরিয়ে যখন সে দেখা পেল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর, তখন যেন জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো তার জন্য।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে ঘটে যাওয়া ওই দুর্ঘটনায় অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসনিয়া প্রাণ হারায়। একই স্কুলে পড়লেও সেদিন আলাদা ভবনে ছিল দুই ভাইবোন। ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দে ছোট ভাই তাহসিন ছুটে যায় বোনকে খুঁজতে। কারও মুখে শুনেছিল আহতদের জন্য স্যালাইন ও পানির প্রয়োজন—তাই ছোট্ট দুই হাতে সেগুলো নিয়েই দাঁড়িয়ে ছিল সে, বোনের অপেক্ষায়। কিন্তু সেই অপেক্ষা আর পূরণ হয়নি।
এই এক ঘটনার পর বদলে যায় তাহসিনের জীবন। পরিবার জানায়, আগে যে ছেলেটি প্রাণখোলা হাসিতে ঘর ভরিয়ে রাখত, সে ধীরে ধীরে হয়ে পড়ে নিস্তব্ধ। এক হিলিং সেশনে তার লেখা একটি লাইন আজও কাঁদায় সবাইকে—“আমি আমার প্রিয় বোনকে হারিয়ে ফেলেছি… ওকে আমি অনেক মিস করি, ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।”
তবে গত ২৭ জুলাই বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়াম-এ এক অনুষ্ঠানে দেখা যায় ভিন্ন এক তাহসিনকে। প্রধানমন্ত্রী মাঠ প্রদক্ষিণ করার সময় কাছে আসতেই উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে তার মুখ। সেই নির্মল হাসির ছবি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে—অনেকেই সেখানে খুঁজে পান বেদনার মাঝেও জীবনের আশার প্রতিচ্ছবি।
পরে জানা যায়, সেই হাসির পেছনে রয়েছে এক হৃদয়বিদারক গল্প। বিষয়টি জানার পর প্রধানমন্ত্রী নিজেই তাহসিন ও তার পরিবারের খোঁজ নেওয়ার নির্দেশ দেন।
এর ধারাবাহিকতায় আজ বুধবার ২৯ জুলাই বাবাকে সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে তাহসিন।
সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী তার পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ স্বপ্ন এবং ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা জানতে চান। জবাবে তাহসিন জানায়, সে বড় হয়ে একজন সফল ব্যবসায়ী হতে চায়—যে কাজের মাধ্যমে মানুষের উপকার করা যায় এবং মানুষকে আকৃষ্ট করা যায়।
তাহসিনের এই স্বপ্নে উৎসাহ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা, নিয়মিত খেলাধুলা এবং লক্ষ্য অর্জনে কঠোর পরিশ্রমই তাকে এগিয়ে নেবে। প্রিয় খেলা ফুটবলের কথা শুনে নিজের সই করা একটি ফুটবল উপহার দেন তিনি—যা তাহসিনের জন্য হয়ে ওঠে এক অনন্য স্মারক।
সাক্ষাৎ শেষে উচ্ছ্বসিত তাহসিন জানায়, এই অভিজ্ঞতা তার কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল। “প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আবার দেখা হবে—এটা কখনো ভাবিনি,” বলে জানায় সে। বন্ধুবান্ধবদের কাছে এই গল্প শোনাতে সে এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
শুধু তাই নয়, তাহসিনের ভাষায়—প্রধানমন্ত্রী তার সঙ্গে পরিবারের একজনের মতোই কথা বলেছেন, তাই তার কোনো ভয় বা সংকোচ কাজ করেনি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কক্ষ ঘুরে দেখা, সেখানে থাকা গাড়ি ও জাহাজের রেপ্লিকা—সবই তাকে মুগ্ধ করেছে। এমনকি বাবার ফোনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটি সেলফিও তুলে নিয়েছে সে।
সন্তান হারানোর বেদনায় থাকা এই পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তাহসিনের গল্প যেন মনে করিয়ে দেয়—বেদনার গভীরতা যতই হোক, মানবিক স্পর্শ আর সহমর্মিতা কখনো কখনো নতুন করে বাঁচার সাহস জোগাতে পারে।
তাহসিনের সেই একটুখানি হাসি আজ শুধু একটি ছবি নয়—এটি এক শিশুমনের ভাঙা স্বপ্ন জোড়া লাগানোর শুরু, এবং মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।