মনিরুল ইসলাম: জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করা ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর প্রথমবারের মতো যুগপৎ আন্দোলনের মিত্র রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নৈশভোজ ও শুভেচ্ছা বিনিময়ে মিলিত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আজ সোমবার ২০ জুলাই সন্ধ্যায় রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বার্তা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নৈশভোজ শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ বৈঠককে ‘অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে বলেন, দীর্ঘ ১৫-১৬ বছরের আন্দোলনে একসঙ্গে থাকা নেতৃত্বের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এই মতবিনিময় দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা। আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা, আন্দোলনের স্মরণ
ব্রিফিংয়ের শুরুতেই জুলাই ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, শহীদদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই দেশে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী আন্দোলনকারীদের অবদান জাতি চিরকাল স্মরণ করবে।
সরকারের পাঁচ মাস: কল্যাণমূলক উদ্যোগের চিত্র
সরকারের প্রথম পাঁচ মাসের কার্যক্রম তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ইমাম, পুরোহিত ও ফাদারদের ভাতা চালু, খেলোয়াড়দের ভাতা প্রদান এবং খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভেঙে পড়া রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের দায়িত্ব নিয়ে সরকার ইতোমধ্যে ব্যাংকিং খাতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে। ধাপে ধাপে এসব খাতকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
রাষ্ট্র সংস্কার ও ‘৩১ দফা’ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার
রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, যুগপৎ আন্দোলনের সময় ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচি অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে। একই সঙ্গে সব রাজনৈতিক দলের সম্মতিতে স্বাক্ষরিত ‘জুলাই সনদ’ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
তিনি জানান, জাতীয় ঐক্য ধরে রাখা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ভবিষ্যতেও মিত্র রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক ও মতবিনিময় করবেন প্রধানমন্ত্রী।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন: পরে সিদ্ধান্ত
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, বিদ্যমান আইনে দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে এখনই বিস্তারিত আলোচনা না করে পরবর্তীতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কারা এলেন, কারা অনুপস্থিত
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে ৪১টি রাজনৈতিক দলের মোট ১৮৪ জন নেতা এতে অংশগ্রহণ করেন। তবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ও জমিয়তে ইসলাম বৈঠকে অংশ নেয়নি।
রাজনৈতিক তাৎপর্য
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার গঠনের পর মিত্র দলগুলোর সঙ্গে এটি প্রথম আনুষ্ঠানিক বড় পরিসরের মতবিনিময়, যা রাজনৈতিক সমন্বয় জোরদার ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে রাষ্ট্র সংস্কার, জাতীয় ঐক্য এবং আগামী রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে একটি অভিন্ন অবস্থান তৈরির ইঙ্গিত মিলেছে এই বৈঠক থেকে।