শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় রাতভর নাটকীয় অভিযানের পর অবশেষে গ্রেফতার হয়েছেন দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী নাভানা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সাজেদুল ইসলাম শুভ্র। মঙ্গলবার (২৩ জুন) দিবাগত রাত থেকে শুরু করে বুধবার (২৪ জুন) ভোর পর্যন্ত রাজধানীর বনানীর একটি ভবনে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল রাত ১১টার দিকে বনানীর ডি ব্লকের ১৫ নম্বর সড়কের ৫৪ নম্বর বাসভবনে যৌথ অভিযান শুরু করে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল ও বনানী থানা পুলিশ। পুলিশের কাছে গোপন তথ্য ছিল- আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে আসামি সাজেদুল ইসলাম শুভ্র ওই ভবনে আত্মগোপন করে আছেন।
তবে অভিযানের শুরুতেই তীব্র বাধার মুখে পড়ে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ভবনে প্রবেশ করতে গেলে ভবনের নিরাপত্তাকর্মীরা কোনো ধরনের সহযোগিতা করেননি। উল্টো সেখানে অবস্থানরত শুভ্রর কয়েকজন গাড়িচালক ও দেহরক্ষী উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের সাথে উশৃঙ্খল ও অসহযোগিতামূলক আচরণ শুরু করেন। গ্রেফতার এড়াতে সাজেদুল ইসলাম শুভ্র নিজে এবং তার লোকজন বিভিন্নভাবে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রায় দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই টানটান উত্তেজনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে পুলিশ রাতভর ভবনটি অবরুদ্ধ করে রাখে এবং চারপাশ নজরদারিতে নেয়। গভীর রাত থেকেই মূল ধারার বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমের কর্মীরাও ঘটনাস্থলে অবস্থান করেন। অবশেষে সব নাটকীয়তার অবসান ঘটিয়ে আজ বুধবার ভোরে ভবনটির ভেতর থেকে সাজেদুল ইসলাম শুভ্রকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
বুধবার সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ওসি মাহবুবুর রহমান জানান, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় দায়ের করা একটি শ্রম আইন সংক্রান্ত মামলায় সাজেদুল ইসলাম শুভ্রর বিরুদ্ধে আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) কার্যকর করতেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে সকালে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
তার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের এক ফেসবুক পোস্টে জানান, প্রথম শ্রম আদালতে দায়ের করা ‘বি,এল,এ (মজুরী) মামলা নং ১৫২/২০২০’—এর রায়ের নির্দেশনা প্রায় এক বছর ধরে অমান্য করে আসছিলেন নাভানা গ্রুপ ও আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান সাজেদুল ইসলাম শুভ্র, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম সুমন, চেয়ারম্যান শফিউল ইসলাম কামাল, ম্যানেজিং ডিরেক্টর খালেদা ইসলামসহ প্রতিষ্ঠানের আরও চারজন শীর্ষ কর্মকর্তা। ক্রমাগত আদালত অবমাননা ও রায় অমান্য করার প্রেক্ষিতে গত ৩ মে সংশ্লিষ্ট আদালত সাজেদুল ইসলাম শুভ্রসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে।
এখানেই শেষ নয়, নাভানা গ্রুপের এই শীর্ষ কর্তাদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে বিদেশে অর্থ পাচার ও নাগরিকত্ব চুরির গুরুতর অভিযোগও সামনে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে কানাডায় আত্মগোপনে থাকা নাভানা গ্রুপের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম সুমন এবং সদ্য গ্রেফতার হওয়া ভাইস চেয়ারম্যান সাজেদুল ইসলাম শুভ্র-এই দুজন ২০২০ ও ২০২২ সালে প্রায় ৪ লক্ষ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা কয়েক কোটি টাকা) বিনিয়োগ করে দ্বীপরাষ্ট্র অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের যথাযথ কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, দেশের বাইরে এভাবে বিদেশি নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করা সম্পূর্ণ অবৈধ। বাংলাদেশ ব্যাংক দেশে বসবাসকারী কোনো নাগরিককে এই ধরনের অর্থ পাচার বা বিনিয়োগের অনুমতি দেয়নি। ফলে এই দুই ব্যবসায়ী কর্মকর্তার বিদেশি পাসপোর্টে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে শ্রম আইন লঙ্ঘনের এই মামলায় সুনির্দিষ্টভাবে কোন প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। অন্যদিকে, সাজেদুল ইসলাম শুভ্রর গ্রেফতারের পর ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আলোচনার সৃষ্টি হলেও নাভানা গ্রুপের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সূত্র: ইনকিলাব