প্রথম বিদেশ সফরে আজ মালয়েশিয়া যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে দুই দিনের সরকারি সফরে আজ দুপুরে কুয়ালালামপুরের উদ্দেশে রওনা হবেন তিনি। পরে সোমবার সন্ধ্যায় চার দিনের সফরে মালয়েশিয়া থেকে চীনে যাবেন তারেক রহমান। সফরকালে তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। এসব বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি অন্তত ২০টি সমঝোতা চুক্তি সই হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর প্রথম জোড়া বিদেশ সফর ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে গতকাল সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, দুই দিনের সরকারি সফরে রবিবার মালয়েশিয়া যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর ২৩-২৬ জুন তিনি চীন সফর করবেন।
এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়া ও চীনের বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর ও বিস্তৃত হবে। সফরসঙ্গী প্রতিনিধিদল তুলনামূলকভাবে ছোট রাখা হয়েছে, যার সদস্যসংখ্যা ২৭ থেকে ২৮ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। উচ্চপর্যায়ের এই প্রতিনিধিদলে থাকছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ আরও কয়েকজন।
তিনি বলেন, মালয়েশিয়া সফরকালে আগামীকাল দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করবেন তারেক রহমান। পরে দুই দেশের সরকারপ্রধানের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। আলোচনায় গুরুত্ব পাবে বাণিজ্য, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা, হালাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এবং কৃষি, শিক্ষা ও জনযোগাযোগ। এসব ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে অধিকতর সহযোগিতা স্থাপন নিয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি মালয়েশিয়ার বিভিন্ন সেক্টরে নতুন বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া, আসিয়ানে বাংলাদেশের যোগদান, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মালয়েশিয়ার সমর্থন চাইবে বাংলাদেশ। এ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর সফরে মালয়েশিয়ার সঙ্গে সংস্কৃতিবিনিময় আর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দুটি দলিল সইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
চীন সফর নিয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকালে দুই দেশের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বা চুক্তি সই হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি, একটি কর্মপরিকল্পনা এবং একটি প্রটোকল সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
চীনে প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মালয়েশিয়া সফর শেষে আগামীকাল সোমবার সন্ধ্যায় চীনের বন্দরনগরী দালিয়ানে পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী। পরদিন মঙ্গলবার বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক করার কথা রয়েছে। ডব্লিউইএফের বার্ষিক সভা সামার দাভোসে অংশগ্রহণকারী কাজাখস্তান, মঙ্গোলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর সরকারপ্রধানদের সঙ্গে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করার কথা রয়েছে।
পররাষ্ট্র সচিব আরও জানান, চীন সফরের প্রথম দিন বিকালে ডব্লিউইএফ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’ শীর্ষক একটি অধিবেশনে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেবেন। সন্ধ্যায় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং আয়োজিত স্বাগত নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী যোগ দেবেন। বুধবার সকালে প্রধানমন্ত্রী সামার দাভোসের ১৩তম বার্ষিক সভার মূল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। দুপুরে প্রধানমন্ত্রী ট্রেনে বেইজিংয়ের উদ্দেশে যাবেন। বেইজিংয়ে তিনি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে থাকবেন। বৃহস্পতিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী ও চীনের এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করবেন। দুপুরে বেইজিংয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’ শীর্ষক বিনিয়োগ সম্মেলনে বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে চীনের ব্যবসায়ীদের সামনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ ও সম্ভাবনা তুলে ধরবেন এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানাবেন। বিকালে চীনের গ্রেট হলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে যোগ দেবেন তারেক রহমান। সেখানে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব বিষয় এবং ভবিষ্যতে এ সম্পর্ক আরও কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। বৈঠকের পর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই হবে। এরপর চীনের প্রধানমন্ত্রী আয়োজিত একটি রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় অংশ নেবেন তারেক রহমান।
সফরের শেষ দিন শুক্রবার চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাউ লেজির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সাক্ষাৎ করবেন। এরপর তারেক রহমান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে সেখানকার বীর যোদ্ধাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। এরপর বিকালে প্রধানমন্ত্রী বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সাবেক সরকারের অনিয়মের সিন্ডিকেট গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে চলতে পারে না। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের সিন্ডিকেট ভেঙে স্বচ্ছতা আনতে হবে। এসব অনিয়ম দেশের মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ করছে। নেপালসহ ১৪টি দেশ থেকে যেভাবে কর্মী নেওয়া হয়, বাংলাদেশেরও একই নিয়ম করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি প্রাধান্য না দিয়ে দেশকে প্রাধান্য দিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. এম শাহিদুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে একটা বাস্তব পরিবর্তন আসবে। বাংলাদেশের ওপর দীর্ঘদিনের ভারতীয় প্রভাব কমে যাবে। বাংলাদেশকে সামরিক ক্ষেত্রে সহায়তার পাশাপাশি চীন বঙ্গোপসাগরেও তাদের উপস্থিতি বাড়াবে। আর ইন্দো প্যাসেফিক স্ট্র্যাটেজিতে পরিবর্তনের ফলে যুক্তরাষ্ট্রও এতে আপত্তি করবে না। ফলে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। উৎস: বিডি প্রতিদিন।