শিরোনাম
◈ রাস্তায় কোরবানির পশুর বর্জ্য থাকায় দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর ◈ ডেঙ্গু প্রতিরোধে ৪৮ ঘণ্টা সময় দিলেন প্রধানমন্ত্রী, নইলে ‘ব্যবস্থা’ ◈ নদী বাঁচাতে শত শত বাঁধ ভাঙছে ইউরোপ, ফিরছে স্যামন মাছ ও জীববৈচিত্র্য ◈ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা ও বক্তব্যের ভুল উপস্থাপন প্রসঙ্গে যা বললেন প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ ◈ বাংলাদেশের জেএফ-১৭ পরিকল্পনায় নড়েচড়ে বসেছে ভারত, বাড়ছে পূর্ব সীমান্তের কৌশলগত উদ্বেগ ◈ ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গে আরও ১০ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ৭৩২ ◈ কুরবানির বর্জ্য অপসারণ দেখতে রাজধানীর সড়কে নিজেই গাড়ি চালিয়ে ঘুরছেন প্রধানমন্ত্রী ◈ পাকিস্তান-চীন ঘনিষ্ঠতায় নতুন ভারসাম্যের পথে বাংলাদেশ, উদ্বিগ্ন ভারত ◈ নেপাল হয়ে কৈলাস যাত্রায় ভারতীয় তীর্থযাত্রী সীমিত করল চীন, পর্যটক বাড়ার আশা অপারেটরদের ◈ এক‌টি চু‌ক্তি‌তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সম্মত হ‌লেও বাকি ট্রাম্পের অনুমোদন

প্রকাশিত : ২৯ মে, ২০২৬, ০৬:২০ বিকাল
আপডেট : ২৯ মে, ২০২৬, ১১:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

সময় বদলালেও হারিয়ে যায়নি গরুর মাংসের শুঁটকির ঐতিহ্য

ফেসবুকে ‘গরুর মাংসের শুঁটকি’ লিখে খোঁজ করলেই চোখে পড়ে অসংখ্য ছবি, ভিডিও ও বিজ্ঞাপন। কেউ অনলাইনে বিক্রি করছেন গরুর মাংসের শুঁটকি, কেউ তৈরি করছেন মাংসের আচার। আবার অনেক ফুড ভ্লগার ভিডিওতে দেখাচ্ছেন কীভাবে শুঁটকি দিয়ে ভুনা, ভর্তা কিংবা ঝাল তরকারি রান্না করা যায়। একসময় গ্রামীণ জীবনের সাধারণ সংরক্ষণ পদ্ধতির অংশ হিসেবে পরিচিত এই খাবার এখন ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে শহুরে খাদ্যতালিকা, অনলাইন ব্যবসা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায়।

বিশেষ করে মুসলমানদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহার সময় কুরবানির অতিরিক্ত মাংস সংরক্ষণের প্রয়োজন থেকেই বহু পরিবারে গরুর মাংসের শুঁটকি তৈরির প্রচলন গড়ে উঠেছিল। তখনকার সময়ে এখনকার মতো প্রায় প্রতিটি ঘরে রেফ্রিজারেটর ছিল না। অনেক পরিবারের পক্ষে ফ্রিজ কেনাও সম্ভব ছিল না। ফলে দীর্ঘদিন মাংস ভালো রাখার জন্য মানুষ ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করতো। মাংসে লবণ, হলুদ ও বিভিন্ন মসলা মেখে কয়েকদিন রোদে শুকিয়ে রাখা হতো, যাতে তা দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা যায় এবং পরে রান্না করে খাওয়া সম্ভব হয়।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা এবং কিছু গ্রামীণ অঞ্চলে মাছের পাশাপাশি মাংসের শুঁটকি তৈরির এই পদ্ধতি বহু বছর ধরে প্রচলিত ছিল। এখনও দেশের কিছু এলাকায় এই ঐতিহ্য টিকে আছে। যদিও প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে খাদ্য সংরক্ষণের ধরন বদলে গেছে, তবুও অনেক পরিবার এখনও স্বাদ ও ঐতিহ্যের কারণে গরুর মাংসের শুঁটকি তৈরি করে থাকে।

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন ব্যবসার প্রসারের ফলে এই খাবার নতুনভাবে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। অনেকে এটিকে শুধু খাবার নয়, বরং ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির অংশ হিসেবেও তুলে ধরছেন। শহরের মানুষদের মধ্যেও এর প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে যারা গ্রামের খাবারের স্বাদ খুঁজে ফিরেন, তাদের কাছে গরুর মাংসের শুঁটকি এখন একটি আকর্ষণীয় পদ।

গরুর মাংসের শুঁটকি তৈরির পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে সময়সাপেক্ষ। সাধারণত মাংস ছোট বা পাতলা টুকরো করে কেটে নেওয়া হয়। এরপর লবণ, মরিচ, হলুদসহ বিভিন্ন মসলা মাখিয়ে কয়েকদিন রোদে শুকানো হয়। কোথাও কোথাও ধোঁয়ার সাহায্যেও মাংস শুকানো হয়। এই পদ্ধতিতে মাংস সরাসরি আগুনে পোড়ানো হয় না; বরং আগুনের ওপরে বা পাশে ঝুলিয়ে রাখা হয়, যাতে ধোঁয়া ও তাপের প্রভাবে ধীরে ধীরে মাংসের পানি শুকিয়ে যায়। এতে মাংসে এক ধরনের বিশেষ ধোঁয়ার স্বাদ তৈরি হয়, যা অনেকের কাছে অত্যন্ত প্রিয়।

বাংলাদেশের কিছু প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চলে, বিশেষ করে যেখানে দীর্ঘদিন খাদ্য সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল, সেখানে ধোঁয়ায় শুকানোর এই পদ্ধতি বেশ পরিচিত ছিল। তবে বর্তমান ব্যস্ত জীবনে এত সময় দিয়ে শুঁটকি তৈরি করা অনেকের পক্ষেই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অনেকে এখন বাজার বা অনলাইন দোকানের ওপর নির্ভর করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গরুর মাংসের শুঁটকি এখন আর কেবল খাদ্য সংরক্ষণের উপায় নয়, বরং এটি বহু পরিবারের স্মৃতি, আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় দীর্ঘদিনের জন্য খাবার সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা থেকেই এর ব্যবহার শুরু হলেও, এখন মানুষ মূলত স্বাদ ও অভ্যাসের কারণে এটি খেয়ে থাকে।

খাদ্যসংস্কৃতি বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শুঁটকি খাওয়ার অভ্যাস ভিন্ন ভিন্ন। যেমন বরিশাল অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে শুঁটকি কম খাওয়া হলেও চরাঞ্চল এবং চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট কিংবা নেত্রকোনার মতো এলাকায় শুঁটকির জনপ্রিয়তা অনেক বেশি। বিশেষ করে চট্টগ্রামের খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে শুঁটকির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। গবেষকদের মতে, যেখানে কোনো খাদ্যসংস্কৃতি একবার গড়ে ওঠে, সেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেই খাবারের প্রচলন টিকে থাকে।

গরুর মাংসের শুঁটকির ধারণা শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেও শুকনো মাংসের জনপ্রিয়তা রয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বে ‘বিফ জার্কি’ নামে পরিচিত একটি খাবারের সঙ্গে বাংলাদেশের গরুর মাংসের শুঁটকির বেশ মিল পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বিফ জার্কি একটি পরিচিত খাবার, যা সাধারণত স্ন্যাকস হিসেবে খাওয়া হয়।

বিফ জার্কি তৈরি করতে গরুর মাংস পাতলা করে কেটে বিভিন্ন মসলা বা সসে মেরিনেট করা হয় এবং পরে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, এই খাবারের ধারণা বহু পুরোনো। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসীরা দীর্ঘ ভ্রমণ কিংবা শীতের সময় খাদ্য সংরক্ষণের জন্য মাংস শুকিয়ে রাখতো। তারা মহিষ, হরিণ বা এল্কের মাংস পাতলা করে কেটে রোদে শুকাতো, আবার কখনও ধোঁয়ার ওপর রেখে সংরক্ষণ করতো। ফ্রিজ আবিষ্কারের আগে এটাই ছিল মাংস দীর্ঘদিন ভালো রাখার কার্যকর উপায়।

‘জার্কি’ শব্দটির উৎপত্তিও বেশ পুরোনো। এটি এসেছে দক্ষিণ আমেরিকার কেচুয়া ভাষার “চ’আর্কি” শব্দ থেকে, যার অর্থ শুকনো মাংস। পরে স্প্যানিশরা এই পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারে এবং ধীরে ধীরে তা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। একসময় কাউবয় ও ভ্রমণকারীদের মধ্যেও জার্কি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, কারণ এটি সহজে বহন করা যেত এবং দ্রুত নষ্ট হতো না।

মূল ধারণার দিক থেকে বাংলাদেশের গরুর মাংসের শুঁটকি এবং পশ্চিমা বিফ জার্কি অনেকটাই একই ধরনের। দুটোর ক্ষেত্রেই মাংস শুকিয়ে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা হয়। তবে অঞ্চলভেদে মসলা, প্রস্তুত প্রণালী ও খাওয়ার ধরনে পার্থক্য দেখা যায়।

পুষ্টিবিদদের মতে, গরুর মাংসে রয়েছে উচ্চমাত্রার প্রোটিন, আয়রন, জিঙ্ক, সেলেনিয়াম, ফসফরাসসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান। এছাড়া এতে ভিটামিন বি২, বি৩, বি৬ ও বি১২ রয়েছে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, পেশি ও হাড়ের গঠনে ভূমিকা রাখতে এবং রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে সহায়তা করে। গরুর মাংসের শুঁটকি তৈরি করার সময় মাংসের পানি কমে যায়। ফলে একই পরিমাণ ওজনে সাধারণ মাংসের তুলনায় পুষ্টির ঘনত্ব কিছুটা বেড়ে যেতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্কও করেছেন। শুঁটকি তৈরির সময় অতিরিক্ত লবণ ব্যবহার করলে তাতে সোডিয়ামের পরিমাণ বেড়ে যায়, যা উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক কিংবা কিডনি জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই রান্নার সময় অতিরিক্ত লবণ ব্যবহার না করাই ভালো। এছাড়া সঠিকভাবে শুকানো বা সংরক্ষণ না হলে ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাস জন্মাতে পারে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

সব মিলিয়ে, গরুর মাংসের শুঁটকি একসময় ছিল প্রয়োজনের খাদ্য সংরক্ষণ পদ্ধতি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি এখন রূপ নিয়েছে স্বাদ, ঐতিহ্য, স্মৃতি ও সংস্কৃতির এক বিশেষ প্রতীকে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও এই খাবার এখনও মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে আছে মূলত তার স্বতন্ত্র স্বাদ এবং অতীতের সঙ্গে আবেগী সংযোগের কারণে।

সূত্র- বিবিসি বাংলা

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়