শিরোনাম
◈ নদী বাঁচাতে শত শত বাঁধ ভাঙছে ইউরোপ, ফিরছে স্যামন মাছ ও জীববৈচিত্র্য ◈ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা ও বক্তব্যের ভুল উপস্থাপন প্রসঙ্গে যা বললেন প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ ◈ বাংলাদেশের জেএফ-১৭ পরিকল্পনায় নড়েচড়ে বসেছে ভারত, বাড়ছে পূর্ব সীমান্তের কৌশলগত উদ্বেগ ◈ ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গে আরও ১০ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ৭৩২ ◈ কুরবানির বর্জ্য অপসারণ দেখতে রাজধানীর সড়কে নিজেই গাড়ি চালিয়ে ঘুরছেন প্রধানমন্ত্রী ◈ পাকিস্তান-চীন ঘনিষ্ঠতায় নতুন ভারসাম্যের পথে বাংলাদেশ, উদ্বিগ্ন ভারত ◈ নেপাল হয়ে কৈলাস যাত্রায় ভারতীয় তীর্থযাত্রী সীমিত করল চীন, পর্যটক বাড়ার আশা অপারেটরদের ◈ এক‌টি চু‌ক্তি‌তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সম্মত হ‌লেও বাকি ট্রাম্পের অনুমোদন ◈ ওমানকে উড়ি‌য়ে দেয়ার হুম‌কি আমেরিকার, নিন্দা জানালো ইরান ◈ গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনের ওপর চলে না, বরং বিতর্ক, ভিন্নমত এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের ওপর চলে

প্রকাশিত : ২৯ মে, ২০২৬, ০৮:০৬ রাত
আপডেট : ২৯ মে, ২০২৬, ১১:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

মোবাইলে শুরু হওয়া জুয়ার ফাঁদে নিঃস্ব পরিবার

রাতে মোবাইল হাতে শুরু হয়েছিল ‘মজা করে’ একটি খেলা। প্রথমে জিতলেন কয়েকশ টাকা। বিকাশে টাকা ঢুকতেই বাড়লো আত্মবিশ্বাস। এরপর আরও বড় বাজি, আরও বড় স্বপ্ন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই শেষ হয়ে গেলো সঞ্চয়, ঋণ হলো, ভাঙলো পরিবার। এমন গল্প এখন শুধু শহরের নয়, গ্রামগঞ্জের চায়ের দোকান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, রিকশার গ্যারেজ থেকে অভিজাত ড্রয়িংরুম— সবখানেই ছড়িয়ে পড়েছে অনলাইন জুয়ার অদৃশ্য জাল।

ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে বেড়ানো আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন আর সহজ মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে অবৈধ জুয়া ও বাজি ধরার আন্তর্জাতিক সংঘবদ্ধ গ্যাং বা নেটওয়ার্ক (বেটিং চক্র) বাংলাদেশে তৈরি করেছে হাজার কোটি টাকার এক ভয়ংকর অর্থনীতি। এই নেশায় জড়িয়ে পড়ছে কিশোর-তরুণরা, বাড়ছে ঋণ, প্রতারণা, খুন, আত্মহত্যা ও অর্থপাচারের ঘটনা। পরিস্থিতিকে ‘সমাজ ও অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি’ হিসেবে দেখছে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাই ১৮৬৭ সালের পুরানো আইন বাতিল করে অনলাইন জুয়া দমনে আনতে যাচ্ছে কঠোর ও আধুনিক নতুন আইন।

ফুটপাত থেকে ড্রয়িংরুম: সর্বত্র অনলাইন জুয়ার থাবা

একসময় জুয়া নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা পৌঁছে গেছে হাতের মুঠোয়। স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় সমাজের প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ জড়িয়ে পড়ছেন অনলাইন বেটিংয়ে।

ফুটপাতের চা-দোকানি, সেলুন কর্মী, হকার, সিকিউরিটি গার্ড, বিক্রয়কর্মী, গৃহপরিচারিকা, রিকশাচালক ও দিনমজুরের মতো নিম্ন আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে বাস-ট্রাকের চালক-হেলপার, সিএনজিচালক, এমনকি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও দিনের বড় একটি সময় কাটাচ্ছেন অনলাইনে বাজি ধরে।

শুরুতে 'ফ্রি বোনাস', 'গ্যারান্টি জয়' কিংবা ‘প্রথম ডিপোজিটে দ্বিগুণ টাকা’র মতো অফারে আকৃষ্ট করা হয় ব্যবহারকারীদের। প্রথম দিকে ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু টাকা জিতিয়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। এতে দ্রুতই তৈরি হয় আসক্তি। পরে বড় অঙ্কের টাকা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন অনেকেই।

অর্থ পাচার প্রতিরোধে অ্যাকশনে সিআইডি

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিয়মিত জুয়াড়ি ও স্থানীয় এজেন্ট গ্রেফতার হলেও আন্তর্জাতিক চক্রগুলোর মূলহোতারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে অনলাইন জুয়ার বিস্তার ঠেকাতে সক্রিয় রয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

সিআইডি সূত্র জানায়, তাদের সাইবার ইউনিট ইতোমধ্যে প্রায় দেড় শতাধিক জুয়ার ওয়েবসাইট শনাক্ত করে বন্ধের জন্য বিটিআরসিতে তালিকা পাঠিয়েছে। এছাড়া অবৈধ লেনদেনে জড়িত ৮৭৯টি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট এবং ৪৩টি ব্যাংক হিসাবের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বিএফআইইউতে পাঠানো হয়েছে।

তদন্তে উঠে এসেছে, কয়েক স্তরে পরিচালিত এই চক্রগুলো প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা লেনদেন করছে। সিআইডির তথ্যমতে, একটি চক্রই গত কয়েক মাসে দৈনিক গড়ে প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকা অবৈধভাবে লেনদেন করেছে, যার বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় অনলাইন জুয়ার সাইট পরিচালনাকারী একটি চক্রের মূলহোতাসহ আট সদস্যকে গ্রেফতার করেছে সিআইডি। পরে আরও তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। তারা বিকাশ, নগদ, রকেট, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ও ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে বেটিং পরিচালনা করছিল বলে জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

জুয়ার নেশায় বাড়ছে খুন, আত্মহত্যা ও অপরাধ

অনলাইন জুয়ার ভয়াবহতা এখন শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ নেই; বাড়ছে খুন, আত্মহত্যা ও সহিংস অপরাধও। গত ২৫ এপ্রিল ঢাকার ধামরাইয়ে জুয়ার ঋণ শোধ করতে গিয়ে এক এসএসসি পরীক্ষার্থীকে হত্যা করে তার স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে প্রতিবেশী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে।

এর আগে ময়মনসিংহের ত্রিশালে জুয়ার টাকা জোগাড় করতে না পেরে এক যুবক নিজের বাবা-মাকে হত্যা করে ঘরের মেঝেতে পুঁতে রাখেন বলে অভিযোগ উঠে। রাজধানীর কলাবাগানে জুয়ার টাকার জন্য পরিবারের সঙ্গে বিরোধের জেরে এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনাও আলোড়ন তোলে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অনলাইন জুয়ার সঙ্গে প্রতারণা, সাইবার অপরাধ, চুরি, ছিনতাই ও পারিবারিক সহিংসতার মতো অপরাধের সম্পর্ক ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

পুলিশের বক্তব্য

ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের ডিসি এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, পুলিশের সাইবার টিমগুলো সর্বদা সতর্ক রয়েছে এবং জুয়ার সাইটগুলো বন্ধে কাজ করছে। তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কেউ গোপনে আসক্ত হয়ে পড়লে পুলিশের পক্ষে তা জানা কঠিন হয়ে পড়ে।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান বলেন, অনলাইন জুয়া বন্ধে আমাদের সাইবার মনিটরিং ও বিশেষ অভিযান চলছে। নিয়মিত জুয়ার সাইট শনাক্ত করে বিটিআরসিতে পাঠানো হচ্ছে।

পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বিষয়টিকে সমাজ ও অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি উল্লেখ করে বলেন, অনলাইন জুয়ায় অংশ নেওয়া, প্রচারণা চালানো বা এজেন্ট হওয়া— তিনটিই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেটের সহজলভ্যতাকে পুঁজি করে কেউ যেন একে ডিজিটাল আসক্তিতে রূপ দিতে না পারে, সেজন্য পুলিশের সাইবার মনিটরিং টিম সক্রিয় রয়েছে।

আসছে কঠোর ও আধুনিক আইন

১৮৬৭ সালের পুরোনো আমলের পুরনো জুয়া আইন দিয়ে বর্তমানের আধুনিক ডিজিটাল অপরাধ দমন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি সম্পূর্ণ নতুন ও যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার।

সম্প্রতি সচিবালয়ে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) আয়োজিত মতবিনিময় সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ১৮৬৭ সালের জুয়া আইন বাতিল করে জুয়া, বেটিং ও অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে একটি সম্পূর্ণ নতুন, আধুনিক আইন প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আগামী সংসদ অধিবেশনেই এই আইনটি পাসের জন্য বিল আকারে উত্থাপন করা হতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন এই আইন কার্যকর হলে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত অপরাধী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়