দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রেল যোগাযোগে যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন গতি। খুলনা ও মোংলা থেকে ঢাকায় নতুন আন্তঃনগর ও কমিউটার ট্রেন চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ১৮০ দিনের বিশেষ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগ। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কমবে যাত্রা সময়, বাড়বে যাত্রীসেবা, বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ।
পদ্মা রেল লিংক চালুর পর খুলনা-ঢাকা রুটে যাত্রী চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে জাহানাবাদ এক্সপ্রেস কম সময়ে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি করায় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের আগ্রহ বেড়েছে রেলপথে। জাহানাদাবাদ এক্সপ্রেসে মাত্র পৌনে চার ঘণ্টায় খুলনা থেকে রাজধানী ঢাকায় পৌঁছানো যায়। কিন্তু বাড়তি চাহিদার তুলনায় ট্রেন সংখ্যা কম থাকায় টিকিট সংকটও এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা।
বাড়তে থাকা এই চাহিদার প্রেক্ষিতে এবার দক্ষিণাঞ্চলের রেল সেবাকে আরও আধুনিক ও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সম্প্রতি নতুন ট্রেন চালুর প্রস্তাবনা তৈরি করেছে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চল। এরই মধ্যে প্রস্তাবনাগুলো পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ে। ভারতের সাথে চুক্তি অনুযায়ী নতুন ২০০টি কোচ ক্রয় করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। আগামী মাস থেকে রেলের এসব কোচ ধাপে ধাপে বাংলাদেশে আসার কথা রয়েছে।
এসব কোচ আসলে সেগুলো দিয়ে নতুন এসব ট্রেন চালানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এসব প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ।
তিনি বলেন, ভারত থেকে আমাদের ক্রয় করা কোচগুলো আগামী মাস থেকে আসা শুরু করবে। প্রতিটি ধাপে ২০টি করে কোচ আসবে, এভাবে মোট ২০০টি কোচ আসার কথা রয়েছে। এসব কোচ নিয়ে আমাদের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নতুন এই প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে। ধাপে ধাপে এসব কোচ আসতে প্রায় এক বছর সময় লেগে যাবে। পর্যায়ক্রমে আমরা আরও নতুন নতুন ট্রেন চালু করতে পারবো। নতুন এসব ট্রেন চালাতে মোংলাসহ কয়েকটি স্টেশনে ওয়াশফিট চালুসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নও করতে হবে। প্রস্তাবানায় সেসব বিষয়ও উল্লেখ আছে।
এদিকে এমন প্রস্তাবনার খবরে এ অঞ্চলে যাত্রীদের মধ্যে স্বস্তি ও উচ্ছ্বাস দেখা গেছে।
খুলনা রেলস্টেশনে ঢাকা থেকে আসা যাত্রী মো. সোহেল রানা বলেন, বর্তমানে একটি ট্রেনে টিকিট পাওয়া খুব কঠিন হয়ে গেছে। অনেক সময় তিন-চারদিন আগেই টিকিট কাটতে হয়। হঠাৎ করে জরুরি প্রয়োজনে ঢাকায় যেতে হলে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। দীর্ঘদিন ধরে আমরা নতুন ট্রেনের দাবি জানিয়ে আসছিলাম। এখন সরকার উদ্যোগ নিয়েছে দ্রুত বাস্তবায়ন হলে সাধারণ যাত্রীরা উপকৃত হবে।
বেসরকারি চাকরিজীবী তানভীর হাসান বলেন, প্রতি সপ্তাহেই অফিসের কাজে ঢাকায় যেতে হয়। কিন্তু সবসময় টিকিট পাওয়া যায় না। শুনেছি নতুন একটা ট্রেন চালু হচ্ছে। এটা চালু হলে আমাদের নিয়মিত যাতায়াত আরও সহজ হবে।
মোংলার ব্যবসায়ী আব্দুল মালেক বলেন, মোংলা থেকে সরাসরি আন্তঃনগর ট্রেন চালু হলে শুধু যাত্রীসেবাই না, ব্যবসা-বাণিজ্যেও বড় পরিবর্তন আসবে। বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে। পণ্য পরিবহন, ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও পর্যটন সব ক্ষেত্রেই নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
রেলওয়ের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, খুলনা-ঢাকা-খুলনা রুটে নতুন একটি বিরতিহীন আন্তঃনগর ট্রেন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত এই ট্রেনটির সম্ভাব্য যাত্রা সময় ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা। প্রস্তাবনা অনুযায়ী এই ট্রেনটি ভোর ৫টায় বেনাপোল থেকে ছেড়ে যশোর, নড়াইল, লোহাগড়া, কাশিয়ানি, ভাঙা হয়ে ঢাকায় পৌঁছাবে সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে। ট্রেনটি ঢাকা থেকে ৯টা ৫০ মিনিটে ছেড়ে পদ্মা সেতু হয়ে বিরতিহীনহাবে খুলনায় পৌঁছাবে দুপুর একটা ২৫ মিনিটে। এরপরপ দুপুর আড়াইটায় খুলনা থেকে ছেড়ে বিরতিহীন ভাবে ঢাকায় পৌঁছাবে সন্ধ্যা সোয়া ৬টায়।
এছাড়া মোংলা-ঢাকা রুটে নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালুর প্রস্তাবও রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ট্রেনটি মোংলা থেকে খুলনা হয়ে ঢাকায় চলাচল করবে। একই সঙ্গে মোংলা-ঢাকা-মোংলা রুটে একটি নতুন কমিউটার ট্রেন চালুর কথাও বলা হয়েছে, যা যাত্রীদের স্বল্প খরচে দ্রুত যাতায়াতে সহায়তা করবে।
রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পদ্মা রেল সংযোগ চালুর পর যাত্রী চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন আন্তঃনগর ও কমিউটার ট্রেন চালুর প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। বিশেষ করে খুলনা ও মোংলা অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিলো দ্রুত ও আধুনিক রেলসেবা বাড়ানো। এখন নতুন কোচ সংগ্রহ, ওয়াশফিট প্রস্তুত এবং অপারেশনাল সক্ষমতা নিশ্চিত করার কাজ চলছে। ভারত থেকে নতুন কোচ পাওয়া গেলে আগামী দুই মাস পর থেকে পর্যায়ক্রমে ট্রেনগুলো চালু করা সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করছি।
বর্তমানে খুলনা থেকে জাহানাবাদ এক্সপ্রেস ছাড়াও চিত্রা ও সুন্দরবন এক্সপ্রেস যমুনা সেতু হয়ে ঢাকায় চলাচল করছে। তবে যাত্রী চাহিদা বাড়তে থাকায় নতুন ট্রেন সংযোজনের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি, পর্যটন, শিল্প ও বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে। তাই দ্রুত উদ্যোগ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তারা।