দোয়া ইবাদতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মুমিনের দোয়া আল্লাহ-তাআলা কবুল করেন। তবে দোয়ার কিছু আদব ও শর্ত আছে। এমন কিছু কাজ রয়েছে, যা দোয়া কবুলের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। দোয়া কবুল না হওয়ার অন্যতম ছয়টি কারণ হলো—
১. হারাম উপার্জন ও খাদ্য
দোয়া কবুলের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়গুলোর একটি হলো হারাম উপার্জন ও হারাম খাদ্য। মানুষ কী খাচ্ছে, কী পরছে ও কোন অর্থে জীবন যাপন করছে—এসবের সঙ্গে তার ইবাদতের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
নবীজি (সা.) এমন এক ব্যক্তির কথা বলেছেন, যে দীর্ঘ সফর করেছে, তার চুল এলোমেলো, শরীর ধুলোমলিন এবং সে আকাশের দিকে হাত তুলে ‘হে আমার রব, হে আমার রব’ বলে দোয়া করছে। কিন্তু তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং হারাম খাদ্য দিয়েই তার শরীর গড়ে উঠেছে। এরপর নবীজি (সা.) বলেন, ‘তাহলে তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে?’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)
দোয়ার আগে তাই উপার্জনের বৈধতা ও পবিত্রতা যাচাই করা জরুরি।
দোয়া কবুলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আদব হলো একনিষ্ঠতা। বান্দা যখন আল্লাহর কাছে কিছু চায়, তখন তার অন্তর যেন আল্লাহর ওপরই নির্ভরশীল থাকে।
২. একনিষ্ঠতার অভাব
দোয়া কবুলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আদব হলো একনিষ্ঠতা। বান্দা যখন আল্লাহর কাছে কিছু চায়, তখন তার অন্তর যেন আল্লাহর ওপরই নির্ভরশীল থাকে।
আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘অতএব, তোমরা একনিষ্ঠচিত্তে আল্লাহকে ডাকো।’ (সুরা মুমিন, আয়াত: ১৪)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তাদের তো এ ছাড়া কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি যে তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর জন্যই ধর্মকে একনিষ্ঠ রাখবে।’ (সুরা বাইয়্যিনাহ, আয়াত: ৫)
দোয়াও একটি ইবাদত। তাই এতে আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠতা অপরিহার্য।
৩. পাপের দোয়া করা
দোয়া আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনার মাধ্যম, অন্যায়ের হাতিয়ার নয়। কোনো পাপের কাজ সংঘটনের জন্য কিংবা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে দোয়া করা গ্রহণযোগ্য নয়।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কারও দোয়া কবুল হতে থাকে, যতক্ষণ না সে পাপের কাজ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য দোয়া করে।’ (বুখারি, আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৬৫৫)
অর্থাৎ আল্লাহর কাছে চাওয়ার ক্ষেত্রেও হালাল-হারামের সীমারেখা অটুট রাখতে হবে। নিজের স্বার্থে এমন কিছু কামনা করা যাবে না, যা শরিয়তে নিষিদ্ধ।
তোমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করো এ বিশ্বাস নিয়ে যে তা কবুল হবে। আর জেনে রাখো, আল্লাহ উদাসীন ও অমনোযোগী হৃদয়ের দোয়া কবুল করেন না।
সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৪৭৯
৪. উদাসীন হৃদয়ে দোয়া করা
দোয়া শুধু মুখের উচ্চারণের নাম নয়, এটি অন্তরের নিবেদন। কেউ যদি দোয়ার সময় নিজের অন্তরে বিনয় না আনে এবং রবের সামনে নিজের মুখাপেক্ষিতা প্রকাশ না করে, তবে সেই দোয়ার প্রাণশক্তি বিলুপ্ত হয়ে যায়।
আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ডাকো বিনীতভাবে ও গোপনে।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৫৫)
রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করো এ বিশ্বাস নিয়ে যে তা কবুল হবে। আর জেনে রাখো, আল্লাহ উদাসীন ও অমনোযোগী হৃদয়ের দোয়া কবুল করেন না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৪৭৯)
বান্দা যত বেশি বিনয় অবলম্বন করবে এবং হৃদয়কে রবের দিকে ফেরাবে, তার দোয়া কবুলের সম্ভাবনা তত বাড়বে। তাই নিজের চাওয়ার গভীরতা অনুভব করে আল্লাহর ক্ষমতার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে প্রার্থনা করতে হবে।
৫. তাড়াহুড়া করে হতাশ হয়ে যাওয়া
দোয়া করে সঙ্গে সঙ্গে ফল পাওয়া যাবে, এমন প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। আল্লাহ কখন, কীভাবে বান্দার আবেদন পূরণ করবেন, তা তাঁর হিকমতের বিষয়। তাই দীর্ঘদিন দোয়া করেও ফল দৃশ্যমান না হলে হতাশ হয়ে দোয়া ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কারও দোয়া কবুল হতে থাকে, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে বলে, “আমি দোয়া করেছি, কিন্তু আমার দোয়া কবুল হয়নি।”’(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩৪০)
বান্দার কাজ চাওয়া ও অপেক্ষা করা। কখনো কাঙ্ক্ষিত বস্তু পাওয়া যেমন দোয়ার ফল, তেমনি অদৃশ্য কোনো বিপদ দূর হওয়াও তার প্রাপ্তি। তাই দোয়ার জবাব বিলম্বিত হওয়াকে দোয়া প্রত্যাখ্যাত হওয়ার প্রমাণ মনে করা উচিত নয়।
অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে। তাই নিজের সংশোধনের পাশাপাশি সামর্থ্য ও প্রজ্ঞা অনুযায়ী অন্যায় প্রতিরোধ করাও জরুরি।
৬. সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ পরিত্যাগ করা
একটি সমাজ যখন অন্যায় দেখেও নীরব থাকে, তখন শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত দিয়ে সেই বিপর্যয় থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। ইসলাম তাই অন্যায় প্রতিরোধ ও সৎকাজের প্রসারকে সম্মিলিত দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত করেছে।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে, অন্যথায় অচিরেই আল্লাহ তোমাদের ওপর নিজের পক্ষ থেকে শাস্তি পাঠাবেন। এরপর তোমরা তাঁর কাছে দোয়া করবে, কিন্তু তোমাদের দোয়া কবুল করা হবে না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২১৬৯)
অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে। তাই নিজের সংশোধনের পাশাপাশি সামর্থ্য ও প্রজ্ঞা অনুযায়ী অন্যায় প্রতিরোধ করাও জরুরি।
দোয়া কবুল না হলে তাই হতাশ না হয়ে বরং নিজের জীবনে এই কারণগুলো খুঁজে দেখা ও সেগুলো সংশোধন করাই একজন মুমিনের প্রকৃত করণীয়।
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা