রয়টার্স প্রতিবেদন: চলতি বছর ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির দর রেকর্ড পরিমাণ কমেছে। তেলের উচ্চ দাম এবং ভারতের শেয়ারবাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লাগাতার অর্থ তুলে নেওয়ার কারণে রুপির ওপর চাপ বেড়েছে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে ডলারের চাহিদা কমানো এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে ভারত সরকার ও দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
রয়টার্স জানায়, শুক্রবার রুপির দর ধরে রাখতে নতুন কিছু পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই)। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কম্পানিগুলোর ডলার কেনার ব্যবস্থা পরিবর্তন এবং মুদ্রার দরপতনের ঝুঁকি এড়াতে করা আর্থিক চুক্তির নিয়ম কঠোর করা। বর্তমানে ডলারের বিপরীতে রুপির দর রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি রয়েছে।
রুপির দরপতন ঠেকাতে ভারতের নেওয়া প্রধান পদক্ষেপগুলো হলো—
তেল কম্পানির ডলারের চাহিদা মেটাতে বিশেষ ব্যবস্থা
রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি তেল কম্পানির প্রতিদিনের ডলারের চাহিদা মেটাতে বিশেষ ব্যবস্থা চালু করবে আরবিআই। এর ফলে খোলাবাজারে ডলারের চাহিদা কমবে। এতে রুপির ওপর চাপও কমতে পারে। চলতি বছর ডলারের বিপরীতে রুপির দর ৭ শতাংশের বেশি কমেছে।
গত মে মাসে প্রতি ডলারের বিপরীতে রুপির দর নেমে ৯৬ দশমিক ৯৬-এ পৌঁছায়। এটি ছিল রুপির ইতিহাসে সর্বনিম্ন দর। মুদ্রাবাজারে সংকট দেখা দিলে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেদের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ থেকে সরাসরি তেল কম্পানিগুলোকে ডলার সরবরাহ করে। আরবিআই জানিয়েছে, ১২ অক্টোবর থেকে ইন্ডিয়ান অয়েল, হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম ও ভারত পেট্রোলিয়াম এই সুবিধা পাবে।
বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনে কঠোর নিয়ম
কম্পানিগুলোর জল্পনামূলক লেনদেন কমাতে নিয়ম আরো কঠোর করেছে আরবিআই। পাশাপাশি রুপির দরপতনের ঝুঁকি সামলানোর খরচও বাড়ানো হয়েছে। গত ১০ অক্টোবর এসব পদক্ষেপ ঘোষণা করা হয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনের ঝুঁকি সামলাতে করা নির্দিষ্ট কিছু আর্থিক চুক্তির বিপরীতে মুদ্রা ব্যবসায়ীদের ২০ শতাংশ অর্থ আলাদা করে রাখতে হবে। এ অর্থকে ‘বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি সংরক্ষণ তহবিল’ বলা হচ্ছে।
বিদেশ থেকে পণ্য বা সেবা কেনার মতো চলতি হিসাবের লেনদেনে বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি সামলাতে করা চুক্তির ক্ষেত্রে এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে। তবে বিদেশি শেয়ার বা ঋণে বিনিয়োগের ঝুঁকি সামলাতে করা চুক্তির ক্ষেত্রে এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। এ ছাড়া মূল লেনদেনের প্রমাণ ছাড়াই করা যায়, এমন আর্থিক চুক্তির সীমা কমিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগে এ ধরনের চুক্তি সর্বোচ্চ ১০ কোটি ডলার পর্যন্ত করা যেত। এখন সেই সীমা কমিয়ে ৫০ লাখ ডলার করা হয়েছে। বাতিল করা আর্থিক চুক্তি আবার নতুন করে করার সুযোগও বন্ধ করেছে আরবিআই।
সরকারি বন্ডে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে গত জুনে ভারত সরকার দেশটির বন্ডে বিনিয়োগ থেকে পাওয়া মুনাফার ওপর আরোপিত সাড়ে ১২ শতাংশ কর তুলে নেয়। একই সঙ্গে সুদ থেকে পাওয়া আয়ের ওপর ২০ শতাংশ করও বাতিল করা হয়। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টসকেও এসব কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করে। আরবিআই জানিয়েছে, আরো বেশি ধরনের সরকারি বন্ডে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো সীমা থাকবে না।
প্রবাসী ভারতীয়দের কাছ থেকে ডলার সংগ্রহ
বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় আমানত সংগ্রহে ব্যাংকগুলোকে উৎসাহ দিতে গত জুনে বিভিন্ন সুবিধা ঘোষণা করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে এই কর্মসূচি এখন বন্ধ রয়েছে। এর মাধ্যমে ১৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলার সংগ্রহ করা হয়েছিল।
বিদেশি মুদ্রায় ঋণ নেওয়ার সুযোগ বাড়ানো
রাষ্ট্রায়ত্ত কম্পানিগুলো যাতে আরো সহজে বিদেশি মুদ্রায় ঋণ নিতে পারে, সে জন্য বিশেষ সুবিধায় মুদ্রা বিনিময়ের হার দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ সুবিধা চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত চালু থাকবে।
শেয়ারবাজারে প্রবাসীদের বিনিয়োগ বাড়ানো
প্রবাসী ভারতীয়দের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সীমা বাড়ানোর ঘোষণা দেয় ভারত সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত ফেব্রুয়ারিতে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। জুন থেকে নতুন নিয়ম কার্যকর হয়েছে।
রপ্তানির আয় দ্রুত দেশে ফেরানোর উদ্যোগ
রপ্তানি থেকে পাওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার সময়সীমা কমিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত জুনে এ সময়সীমা ১৫ মাস থেকে কমিয়ে ৯ মাস করা হয়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে উত্তেজনার কারণে গত বছর রপ্তানির আয় দেশে ফেরানোর সময়সীমা বাড়িয়ে ১৫ মাস করা হয়েছিল।
সোনা ও রুপা আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো
গত মে মাসে সোনা ও রুপার আমদানি শুল্ক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করে ভারত। এর মধ্যে রয়েছে ১০ শতাংশ মৌলিক শুল্ক এবং ৫ শতাংশ কৃষি অবকাঠামো ও উন্নয়ন শুল্ক। আমদানি শুল্ক বাড়ানোর ফলে সোনা ও রুপা কেনার জন্য বিদেশে ভারতের যে অর্থ ব্যয় হয়, তা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
সোনা ও রুপা আমদানিতে কড়াকড়ি
গত মে মাসে সোনা ও রুপা আমদানির নিয়মও কঠোর করে ভারত। গয়না রপ্তানির জন্য শুল্কমুক্ত সোনা আমদানিতে নতুন সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি লাইসেন্সের বিপরীতে সর্বোচ্চ ১০০ কেজি সোনা আমদানি করা যাবে। এ ছাড়া ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ বিশুদ্ধ রুপার বার এবং রুপার অন্যান্য আধা-প্রক্রিয়াজাত পণ্যের আমদানি সীমিত শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। সিদ্ধান্তটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়।
বিদেশভ্রমণ কমানোর আহ্বান
বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে গত মে মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশভ্রমণ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান। তবে ভারত ভ্রমণের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি। জ্বালানি সাশ্রয় এবং ব্যয়বহুল তেল আমদানি কমাতে তিনি মানুষকে বাড়ি থেকে কাজ করারও আহ্বান জানান।
মুদ্রাবাজারে লেনদেন নিয়ন্ত্রণ
গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ব্যাংকগুলো বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে যতটা নিট খোলা অবস্থানে লেনদেন করতে পারবে, সেই সীমা কমিয়েছে আরবিআই। রুপির দর আরো কমিয়ে দিতে পারে, এমন লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল এ পদক্ষেপের লক্ষ্য। এসব লেনদেনের কারণে রুপির ওপর দরপতনের চাপ বাড়ছিল।
সব মিলিয়ে ডলারের চাহিদা কমানো, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর চাপ কমানোর মাধ্যমে রুপির দর স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে ভারত।