শখ করে ঘরে বিড়াল পুষছেন কেউ। কেউ আবার ভালোবেসে পালন করছেন রংবেরঙের পাখি। পোষা প্রাণীর প্রতি এই ভালোবাসা ঘিরে বগুড়ায় গড়ে উঠেছে নতুন বাজার। কয়েক বছর আগেও শহরে বিড়াল ও পাখির খাবারের দোকান ছিল হাতে গোনা চার-পাঁচটি। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০টির বেশি। সূত্র: জাগোনিউজ
দোকানগুলোতে মিলছে দেশ-বিদেশের নানা জাতের খাবার, পরিচর্যাসামগ্রী ও পুষ্টিপণ্য। কিন্তু বাজার দিনদিন বড় হলেও দেশি খাবারের সংকট না কমে উল্টো বাড়ছে। ব্যবহার করা বেশিরভাগ খাবারই বিদেশ থেকে আমদানি করা। ফলে শখের বিড়াল পালতে প্রতি মাসে খরচের হিসাবটাও বাড়ছে।
বগুড়া শহরের গোহাইল রোড, বকশি বাজার, কালিতলা, খান্দার, নূরানী মোড় ও মালতিনগর এলাকায় গড়ে উঠেছে পোষা প্রাণীর খাবার ও পরিচর্যাসামগ্রীর দোকান। এসব দোকানে কমবেশি ১৫টি পরিচিত ব্র্যান্ডের ২৫০টির বেশি ধরনের রেডিমেড খাবার পাওয়া যায়। গ্রাহকদের মধ্যে চীন, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও তুরস্কের খাবারের চাহিদা বেশি। অন্যদিকে এসব দোকানে দেশীয় খাবারের উপস্থিতি কম। ফলে ক্রেতাদের বড় অংশকে বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, শুধু বগুড়া শহরে প্রায় ১০ হাজার মানুষ বিড়াল পালন করেন। এই পালনকারীদের ঘিরেই কয়েক কোটি টাকার খাবারের বাজার তৈরি হয়েছে।
বিদেশি খাবারের আধিপত্য
বগুড়ার দোকানগুলোতে বিড়ালের খাবারের মধ্যে থাইল্যান্ডের স্মার্ট হার্টের চাহিদা বেশি বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। তিন কেজির প্যাকেটের সঙ্গে ৩০০ গ্রাম ফ্রি মিলিয়ে দাম ১ হাজার ৬০০ টাকা। ১ কেজি ৪৫০ গ্রামের প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ৬৮০ টাকায়। থাইল্যান্ডের স্মার্ট ক্যাট ফুড প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, ইন্দোনেশিয়ার কিলিও এক কেজি ৬৮০ টাকা, চীনের মিস্টার প্যাক ৪৫০ টাকা এবং মিস্টার পেট এক কেজি ৪৫০ টাকা ও তিন কেজি ১ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে মিস্টার পেটের সরবরাহে সাময়িক সংকট রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। এছাড়া পিওর ক্যাট ও জই ক্যাট এক কেজি ৪০০ টাকা, টাইপেড ক্লাসিক আধা কেজি ১৮০ টাকা এবং টাইপেড প্রিমিয়াম ৪০০ গ্রামের প্যাকেট ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তুলনামূলক বেশি দামের খাবারের মধ্যে রয়েছে রয়েল ক্যানিন। দুই কেজির প্যাকেটের দাম ৩ হাজার ৬০০ টাকা। খোলা অল এজ ক্যাট ফুড প্রতি কেজি ২৬০ থেকে ২৮০ টাকা। কিছু উন্নত মানের খোলা খাবারের দাম কেজিতে ৫০০ টাকা পর্যন্ত।
বাজারে তুরস্কের লিডার পেট ফুডের রিফ্লেক্স, চীনের ব্যালেন্স ও হারভেস্ট এবং বেলজিয়ামের ভার্সেল-লাগারের লারা ব্র্যান্ডের খাবারও রয়েছে। পণ্যের ধরন ও দামের এই বৈচিত্র্য থাকলেও কোন খাবার কতটা পুষ্টিকর, তার তুলনামূলক তথ্য সহজে পাওয়া যায় না। ব্র্যান্ড ও ফ্লেভারের পাশাপাশি খাবারের উপাদান, পুষ্টিমান এবং প্রাণীর বয়স অনুযায়ী উপযোগিতা যাচাইয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
মূল খাবারের বাইরে বিড়ালের জন্য টোনা জেলি ক্যান বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকায়, ছোট পাইচ প্রতি পিস ৮০ টাকা এবং ক্যাট ট্রিট ২০ টাকা পিস। মলমূত্র ত্যাগের জন্য ব্যবহৃত ক্যাট লিটারের ১০ লিটারের প্যাকেট ৪৫০ টাকা। পার্ল শ্যাম্পেলের দাম ৩৫০ টাকা এবং বিড়াল-কুকুরের কৃমির ওষুধ বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা পিস।
দেশি খাবার সীমিত
বাজারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দেশীয় উৎপাদন নিয়ে। ব্যবসায়ী ও বিড়ালপ্রেমীদের ভাষ্য, বিদেশি রেডিমেড খাবারের তুলনায় দেশি বিকল্প খুবই সীমিত। দেশে পোষা প্রাণীর জন্য কিছু খাবার বাজারজাত হলেও সেগুলোর উৎপাদন, কাঁচামালের উৎস ও ফর্মুলেশন সম্পর্কে ক্রেতাদের মধ্যে স্পষ্ট ধারণা নেই। কোনো পণ্য দেশীয় ব্র্যান্ডের হলেই তার সব কাঁচামাল বা উপাদান দেশীয়, বিষয়টি এমন নয়। আবার বিদেশি উপাদান ব্যবহার করলেই কোনো পণ্য নিম্নমানের, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানোর সুযোগ নেই। এসব ক্ষেত্রে উৎপাদন প্রক্রিয়া, উপাদানের তালিকা ও পুষ্টিমান যাচাই জরুরি।
বগুড়ার বাজারে দেশি খাবার হিসেবে ওসকিস পাওয়া যায়। এক কেজির প্যাকেটের দাম ৩২০ টাকা। বিক্রেতারা বলছেন, ব্র্যান্ডটি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অনুমোদিত। যুক্তরাজ্যের ফর্মুলেশন অনুসরণ করে পুষ্টিমান বজায় রেখে খাবারটি তৈরি করা হয়।
চঙ্ককেও দেশীয় ক্যাট ফুড ব্র্যান্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, জার্মানির একটি পেট নিউট্রিশন ল্যাবের রেসিপি ও ফর্মুলেশন অনুসরণ করে তারা বিড়ালের খাবার তৈরি করে। দেশীয় ব্র্যান্ডের এমন উদ্যোগ বাজারে বিকল্প তৈরির সম্ভাবনা দেখালেও আমদানি করা খাবারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে উৎপাদন সক্ষমতা, দাম, সরবরাহ ও ক্রেতার আস্থা অর্জনে তারা প্রতিযোগিতা করছে।
গোহাইল রোডের পাখি ঘরের স্বত্বাধিকারী জাহেদ বলেন, ওসকিস এক কেজি ৩২০ টাকা এবং স্মার্ট হার্ট ৪৫০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। তার দোকানে এসিআইয়ের কিছু খাবারও রয়েছে, তবে সেগুলোর দাম বেশি। ক্রেতাদের অনেকে মুরগি, মাছ ও মাংসের ফ্লেভারের খাবার পছন্দ করেন।
উপশহর এলাকার বাসিন্দা রনির অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের দেশীয় পণ্য বলে পরিচয় দিলেও খাবার বা কাঁচামাল বিদেশ থেকে এনে দেশে প্যাকেটজাত করে বাজারজাত করে। কারণ কোন প্রতিষ্ঠান কী পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করে এবং কোন পণ্য দেশে উৎপাদিত হয়, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নথি ও আমদানি তথ্য কেউ যাচাই করে না। এই প্রক্রিয়াটির প্রতি নজর দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
আমদানিকারক নির্ভরতায় বাড়তি খরচ
বগুড়ার ব্যবসায়ীদের বড় অংশ ঢাকার আমদানিকারক ও সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরশীল। কালিতলা হাটের শিহাব স্টোরের স্বত্বাধিকারী শিহাব জানান, তারা সরাসরি আমদানিকারকের কাছ থেকে খাবার সংগ্রহ করেন। প্রয়োজন হলে ঢাকায় ফোন করে কুরিয়ারে পণ্য আনতে হয়। পরিবহন ও কুরিয়ার খরচ ব্যবসায়ীদের বহন করতে হওয়ায় তাদের হিসাবে প্রতি কেজিতে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১৫ টাকা ব্যয় যুক্ত হয়।
তিনি বলেন, আগে বগুড়ায় চার-পাঁচটি দোকান ছিল, এখন ৪০টির বেশি। বগুড়ায় প্রায় ১০ হাজার মানুষ বিড়াল পালন করেন বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। এই ক্রেতাদের ঘিরে কয়েক কোটি টাকার বাজার তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
কালিতলার শুভো হ্যাভেন পেট হাউসের স্বত্বাধিকারী সজল বলেন, আগে বিড়াল বিক্রির ব্যবসা ভালো ছিল, এখন আগের মতো নেই। আগে যেসব বিড়াল ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হতো, সেগুলোর কিছু এখন দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকায়ও পাওয়া যায়। পারশিয়ান, ব্লু আই, অড আই, ট্রিপল কোট ও ডাবল কোট জাতের বিড়াল বিক্রি হয়। ট্রিপল কোটের সাদা, বাদামি ও ক্যালিকো রঙের বিড়ালের দাম তুলনামূলক বেশি। বেঙ্গল ক্যাটের দাম ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। তার প্রতিষ্ঠানেও মাসে লক্ষাধিক টাকার ক্যাট ফুড বিক্রি হয়।
মাসে খরচের অংশ বাড়ছে
বগুড়ার দত্তবাড়ি এলাকার বাসিন্দা অদিতি ছয় বছর ধরে ২১টি বিদেশি জাতের বিড়াল পালন করছেন। খাবার, পরিচর্যা ও অন্যান্য প্রয়োজন মিলিয়ে তার মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার টাকার বেশি।
তিনি বলেন, বিড়ালগুলোকে বাড়িতে তৈরি খাবার বেশি খাওয়াই। বিশেষ করে ব্রয়লার মুরগি ও মৃগেল মাছ দিই। পাশাপাশি রেডিমেড খাবার হিসেবে স্মার্ট হার্টও খাওয়াই।
একটি বিড়াল পালনের খরচ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব দিয়েছেন মালিকরা। সজীব বার্ড হাউসের স্বত্বাধিকারী জীবন হাসান বলেন, বাড়িতে তৈরি খাবার দিলে মাসে প্রায় এক হাজার টাকায় একটি বিড়াল পালন সম্ভব হতে পারে। মুরগির মাংস, গাজর ও আলুর মতো খাবার ব্যবহার করেন অনেকে। অন্যদিকে বিদেশি রেডিমেড খাবারসহ অন্যান্য ব্যয় ধরলে মাসে তিন থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
গোহাইল রোডের ব্যবসায়ী জাহেদের হিসাবে, একটি বিড়াল পালনে মাসে দেড় হাজার টাকার বেশি লাগে। মধ্যবিত্ত পরিবারের কেউ কেউ সেদ্ধ পেঁপে, তেলাপিয়া ও সিলভার কার্প মাছ খাওয়ান। তবে বিড়ালের খাবার নির্ধারণে শুধু দাম নয়, পুষ্টির ভারসাম্যও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শেরপুরের অনসূয়া ভট্টাচার্য জানান, দুই বছর ধরে শখ করে বিড়াল পালন করছি। ছোট দুটি পারশিয়ান বিড়াল কিনেছিলাম ১৫ হাজার টাকায়। সম্প্রতি আরেকটি কিনেছি পাঁচ হাজার টাকায়। আমি রেডিমেড খাবার কম দিয়ে মাছ, মাংস ও ভাত খাওয়াই। পাশাপাশি মিষ্টিকুমড়া, গাজর, আলু, পেঁপে ও কাঁচকলা সেদ্ধ করে দিই। খাবার বাবদ মাসে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা খরচ হয়। এছাড়া ফ্লু ভ্যাকসিন দিতে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং র্যাবিস ভ্যাকসিন দিতে ৩০০ টাকা খরচ হয়।
বিড়ালপ্রেমী জারিফা সুলতানা তাম্মি তার পারশিয়ান বিড়াল লিনোকে মুরগি, মিষ্টিকুমড়া, গাজর, আলু ও সেদ্ধ ব্রয়লার খাওয়ান। সকালে অল্প পরিমাণে ক্যাট ফুড দেন এবং দিনে দুই বেলা খাবার খাওয়ান। তার মাসিক ব্যয় প্রায় তিন হাজার টাকা।
অন্যদিকে ইশরাত জাহান এশা জানান, তার বিড়ালের পেছনে মাসে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা খরচ হয়। পাঁচ কেজির ক্যাট লিটার কেনেন ২৫০ টাকায়, যা তিনদিন ব্যবহার করা যায়। শুধু লিটারেই মাসে প্রায় আড়াই হাজার টাকা ব্যয় হয়। এর বাইরে টিকা, কৃমির ওষুধ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার খরচ রয়েছে।
বগুড়ার বিড়ালপ্রেমী মাহমুদুল হাসানের মতে, বাড়িতে তৈরি খাবার স্বাস্থ্যসম্মত হতে পারে। তবে শুধু বিদেশি রেডিমেড খাবার খাওয়ালেই সমস্যা হবে, এমন নয়। আবার বাড়ির খাবার মানেই সব পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে, সেটিও নিশ্চিত নয়। তবে হতাশার কথা বাজারে বিদেশি পণ্যের বাইরে ভালো মানের দেশীয় খাবারের বিকল্প খুব বেশি নেই।
তার মতে, খাবারের পাশাপাশি পরিচর্যা, লিটার, টিকা ও চিকিৎসা ব্যয়ও পোষা প্রাণী পালনের খরচ বাড়ায়। ফলে বাজারে কম দামের খাবার থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হয়ে উঠছে।
পাখির খাবারেও দুই ধরনের বাজার
বিড়ালের পাশাপাশি পোষা পাখির খাবারের বাজারেও বিদেশি ও দেশি পণ্যের আলাদা চাহিদা রয়েছে। ক্যানারি, মিলেট ও সূর্যমুখী ফুলের বীজের বিদেশি জাত বিক্রি হয় দোকানগুলোতে। অন্যদিকে গম, সূর্যমুখী, কুসুম ফুলের বীজ, খেসারি, আতপ ধান, ভুট্টা, ডিমের কুসুম ও পিঁপড়ার ডিম দেশি খাবারের তালিকায় রয়েছে। তবে পাখির প্রজাতি অনুযায়ী খাবারের চাহিদা ও পুষ্টির প্রয়োজন আলাদা। তাই সব পাখির জন্য একই খাবার উপযোগী নয়।
বগুড়া জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম বলেন, পোষা প্রাণীর খাবার তৈরিতে পুষ্টিমান ও গুণগত মান নিশ্চিত করা জরুরি। দেশে এ ধরনের খাবারের উৎপাদন বাড়াতে হলে প্রয়োজন মানসম্মত কাঁচামাল, সঠিক ফর্মুলা ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি। দেশীয় উৎপাদন বাড়লে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি ক্রেতারাও তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে খাবার কেনার সুযোগ পেতে পারেন।