চীন-নেপাল সীমান্তের হিমবাহঘেরা পাহাড়ে ধস ও বন্যায় নেপালের বিদ্যুৎ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি হিসাবে, দুর্যোগে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। বন্ধ হয়ে গেছে আরও কয়েকটি প্রকল্পের উৎপাদন। এতে জাতীয় গ্রিড থেকে ৪১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কমে গেছে, যা দেশটির মোট উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশ।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে জলবিদ্যুতের ওপর নির্ভর করছে নেপাল। দেশটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৯০ শতাংশের বেশি আসে জলবিদ্যুৎ থেকে। কিন্তু আগস্টের ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ধস এই খাতের বড় ধরনের ঝুঁকি সামনে নিয়ে এসেছে।
নির্মাণাধীন আরও ছয়টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব প্রকল্পের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ৫০৮ মেগাওয়াট। দুর্যোগের কয়েক সপ্তাহ পরও ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্পের টানেলে নিখোঁজ শ্রমিক, প্রকৌশলীসহ অন্যদের উদ্ধারে কাজ চলছে।
নেপালের জ্বালানি, পানি সম্পদ ও সেচমন্ত্রী বিরাজ ভক্ত শ্রেষ্ঠ সংসদে বলেন, এই দুর্যোগ ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। শুধু ক্ষয়ক্ষতির হিসাব না করে এর শিক্ষা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
গত এক দশকে নেপালের জলবিদ্যুৎ উৎপাদন চার গুণের বেশি বেড়েছে। সরকারি হিসাবে বর্তমানে দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৪ হাজার ১২০ মেগাওয়াট। এর মাধ্যমে প্রায় ৩ কোটি মানুষের অধিকাংশই বিদ্যুৎ গ্রিডের আওতায় এসেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ার পর নেপাল অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রতিবেশী ভারত ও বাংলাদেশে রপ্তানির উদ্যোগ নেয়। হিমালয়ের নদীগুলোকে দেশের অর্থনীতির বড় আয়ের উৎসে পরিণত করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক দুর্যোগের পর বিদ্যুৎ রপ্তানি স্থগিত করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
বাড়ছে জলবায়ু ও ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি
নেপালের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর বড় অংশ হিমবাহ থেকে নেমে আসা নদীর খাড়া উপত্যকায় নির্মিত। ফলে এসব প্রকল্প বন্যা, ভূমিধস ও পাহাড়ধসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়ছে। হিমবাহ দ্রুত গলছে, স্থায়ীভাবে জমাট মাটি বা পারমাফ্রস্ট উষ্ণ হয়ে গলছে এবং পাহাড়ের স্থিতিশীলতা কমছে। ফলে আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস ও বরফ-শিলা ধসের মতো ঘটনা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন (ডব্লিউডব্লিউএ) গ্রুপের মতে, আগস্টের দুর্যোগের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়ন, হিমবাহের পশ্চাদপসরণ ও ভূতাত্ত্বিক অস্থিতিশীলতা একসঙ্গে কাজ করেছে।