ইংল্যান্ডের লিডসে একটি বহুতল ভবনের ১০ম তলার খোলা জানালা থেকে নিচে পড়ে এক গর্ভবতী নারীর মৃত্যু হয়েছে। তবে হৃদয়বিদারক এই ঘটনার মধ্যেও অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছে তার গর্ভের অনাগত কন্যাশিশু। সম্প্রতি এক বিচার বিভাগীয় তদন্ত (ইনকোয়েস্ট) শুনানিতে এ তথ্য উঠে এসেছে।
নিহত ওই নারীর নাম এমা অ্যাটকিনসন (৩৮)। গত বছরের ২২ অক্টোবর তিনি লিডসের শেকসপিয়ার টাওয়ারে তার বাবার বাসায় গিয়েছিলেন। সেখানেই দুর্ঘটনাটি ঘটে।
তদন্ত শুনানিতে এমার বাবা ডেভিড অ্যাটকিনসন বলেন, সেদিন সকালে মেয়ে তার কাছে একটি সিগারেট চেয়েছিল। এমা জানালার পাশে রাখা একটি চেয়ারে বসে জানালার একটি কাচের প্যানেল সম্পূর্ণ অনুভূমিক অবস্থায় খুলে দেন।
ডেভিড আদালতকে জানান, ঠান্ডা বাতাস ঢুকছিল বলে তিনি মেয়েকে জানালা বন্ধ করতে বলেছিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি এমার মুখে ‘আমি যাচ্ছি’ ধরনের একটি কথা শুনতে পান।
তিনি বলেন, “আমি ঘুরে তাকিয়ে দেখি তার পা জানালার বাইরে চলে যাচ্ছে। তখন আমার মনে হয়েছিল আমি যেন দুঃস্বপ্ন দেখছি।”
ঘটনাস্থলেই মায়ের মৃত্যু, হাসপাতালে জন্ম শিশুর
মেয়েকে পড়ে যেতে দেখে ডেভিড দ্রুত নিচতলায় ছুটে যান। ভবনটিরই একজন অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক ঘটনাস্থলে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
গুরুতর আহতাবস্থায় এমাকে লিডস জেনারেল ইনফার্মারিতে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা জানান, তার আঘাত ছিল ‘বিপর্যয়কর এবং বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনা ছিল না’। পরে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
তবে জরুরি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসকেরা তার গর্ভের শিশুটিকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হন। শিশুকন্যাটি নির্ধারিত সময়ের প্রায় পাঁচ সপ্তাহ আগে জন্ম নেয় এবং পরে তার নাম রাখা হয় পোসি।
মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য
ইনকোয়েস্টে জানানো হয়, এমা এর আগে দু’বার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন এবং তার মধ্যে ইমোশনালি আনস্টেবল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার বা আবেগগতভাবে অস্থিতিশীল ব্যক্তিত্বজনিত মানসিক সমস্যা শনাক্ত হয়েছিল।
মৃত্যুর কিছুদিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি নিজের গর্ভাবস্থার একটি ছবি প্রকাশ করেছিলেন, যেখানে একটি শিশু তার পা জড়িয়ে ধরে ছিল। ওই পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, আর মাত্র ১০ সপ্তাহ পর তার সন্তানের জন্ম হওয়ার কথা এবং একটি কন্যাশিশুর মা হতে পেরে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত।
পরিবারের আবেগঘন বিদায়
এমার মৃত্যুর পরদিন তার বন্ধু ও স্বজনেরা টাওয়ার ভবনের সামনে বেলুন উড়িয়ে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
তার মেয়ে ডেমি মায়ের উদ্দেশে লিখেছিল, “শান্তিতে ঘুমাও মা। তুমি ছিলে একেবারে অনন্য। এই পৃথিবীর জন্য তুমি যেন অতিরিক্ত ভালো ছিলে। তোমাকে আমি ভীষণভাবে মিস করছি।”
ফুফুর কাছে বড় হচ্ছে পোসি
প্রায় এক মাস নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকার পর পোসিকে প্রথমে তার জৈবিক বাবা মাইকেল সোয়ানসনের পরিবারের কাছে অস্থায়ীভাবে দেওয়া হয়। পরে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে মাইকেলের বোন লরেন মিচেল শিশুটির দায়িত্ব নেন।
বর্তমানে লিডসে নিজের বাড়িতে ছয় বছর বয়সী মেয়ে লিলিয়ার সঙ্গে পোসিকে বড় করছেন লরেন। তিনি বলেন, “পোসি একটি অসাধারণ সুন্দর ও প্রাণবন্ত শিশু। আশ্চর্যের বিষয়, ওই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কোনও স্থায়ী শারীরিক প্রভাব তার মধ্যে দেখা যায়নি।”
লরেন আরও বলেন, “এমার মৃত্যু আমাদের পরিবারের জন্য ছিল অকল্পনীয় এক ট্র্যাজেডি। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা ভাবছিলাম, পোসির কী হবে। শুরু থেকেই আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল, তাকে পরিবারের মধ্যেই বড় করা হবে।”
তিনি জানান, ভবিষ্যতে পোসি যখন বড় হবে এবং মাকে নিয়ে প্রশ্ন করবে, তখন তিনি তাকে সবকিছু জানাবেন।
“এখনও আমি এমার ছবি দেখিয়ে বলি, ‘ওই যে, ও তোমার মা।’ যদিও সে এখনও খুব ছোট। কিন্তু একদিন আমি তাকে জানাব, তার মা তাকে ভীষণ ভালোবাসতেন,” বলেন লরেন।
চিকিৎসকদের মতে, এত উঁচু থেকে মায়ের পড়ে যাওয়ার পরও শিশুটির বেঁচে যাওয়া অত্যন্ত বিরল ঘটনা। বর্তমানে পোসি সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে এবং চিকিৎসকদের ভাষায় তার বিকাশ স্বাভাবিক রয়েছে। সূত্র: ডেইলি মেইল