শিরোনাম
◈ তিন বছর পর ভার‌তে ফিরছে আইপিএল নিলাম, ভেন্যু গোয়া ◈ ভারতকে নিয়ে ব্রা‌জিল কোচ আনচেলত্তি, প্রীতি ম্যাচ বলতে কিছু নেই ◈ বহরে যুক্ত হচ্ছে আরও ১১ উড়োজাহাজ, বোয়িংয়ের সঙ্গে বিমানের চুক্তি সই ◈ পাকিস্তান ছেড়ে ২ বছ‌রের চু‌ক্তি‌তে নেদারল্যান্ডসের কোচ অ‌্যাশ‌লি নফকে  ◈ হাসিনা কলকাঠি নাড়ছেন, গুপ্তরা বাতাস দিচ্ছে: রিজভী ◈ নারী ত্রিদেশীয় সিরিজের বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল ঘোষণা ◈ ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটের মধ্যেও ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ২.৯%: OECD ◈ আগামী শুক্র ও শনিবার ব্যাংক খোলা ◈ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ৫ দফা প্রস্তাব: জাতিসংঘের সাইডলাইন বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর জোরালো আহ্বান ◈ হুতিদের হামলা ঠেকাতে সৌদির অনুরোধে সাড়া নেই, ট্রাম্প-সালমান সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন

প্রকাশিত : ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:১৫ দুপুর
আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৩৮ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

সর্বজনীন পেনশনে শরিয়াহভি‌ত্তিক পদ্ধতি, বিনিয়োগ হবে কোথায়

ডেস্ক রি‌পোর্ট : বাংলাদেশের সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালু করতে চায় সরকার। বিদ্যমান চারটি স্কিমের পাশাপাশি কেন এই পদ্ধতি আনা হচ্ছে, এটি কীভাবে পরিচালিত হবে এবং কতটা কার্যকর হবে—এসব নিয়ে এখন আলোচনা চলছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ বলছে, দেশের আরো বেশি মানুষকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার আওতায় আনতে প্রচলিত সুদভিত্তিক কাঠামোর পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মানুষের আগ্রহ বাড়াতে পেনশন স্কিমে মুনাফার হার বৃদ্ধি এবং পেনশনারের সুবিধাভোগীর বয়সসীমা বাড়ানোর মতো আরো কিছু উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ----- সূত্র, বি‌বি‌সি বাংলা

advertisement

পেনশন কর্তৃপক্ষের মতে, শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালু হলে বিভিন্ন ধরনের গ্রাহককে সর্বজনীন পেনশনের আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এই পদ্ধতি চালুর ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ।

তাদের মতে, শরিয়াহভিত্তিক ফান্ড কীভাবে বিনিয়োগ করা হবে এবং এতে গ্রাহক কতটা আর্থিক নিরাপত্তা পাবেন—এসব বিষয়ের ওপরই মূলত গ্রাহকের আস্থা অর্জন নির্ভর করবে।

advertisement

কেন শরিয়াহভিত্তিক উদ্যোগ?

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে চালু হওয়া সর্বজনীন পেনশনের চারটি স্কিমে এখন পর্যন্ত মোট নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার। এই কর্মসূচিতে জমা হওয়া প্রায় ৩২০ কোটি ৩০ লাখ টাকা সরকারি ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে।

advertisement

চারটি স্কিমের মধ্যে সমতা স্কিমে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৮৭ হাজার ২২৪ জন নিবন্ধন করেছেন। তবে বাকি তিনটি স্কিম—সুরক্ষা, প্রবাস ও প্রগতি—এখনও নিবন্ধনকারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম।

এমন পরিস্থিতিতে সরকারি এই উদ্যোগে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়াতে নতুন প্যাকেজ হিসেবে সর্বজনীন পেনশনে শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি যুক্ত করতে চায় জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ বৈঠকে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। নতুন এই পদ্ধতির আইনগত ভিত্তি তৈরির জন্য আইনের খসড়া প্রণয়ন করে তা জাতীয় সংসদে পাঠানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) শেখ কামরুল হাসান বলেন, শরিয়াহভিত্তিক স্কিম আলাদা কোনো পঞ্চম স্কিম নয়। এটি বিদ্যমান চারটি স্কিমেরই ইসলামিক সংস্করণ।

তিনি বলেন, ‘প্রবাস স্কিমের প্রবাস শরিয়া বলে আরেকটা পার্ট থাকবে। একইভাবে প্রগতি, সুরক্ষা এবং সমতা স্কিমের ক্ষেত্রেও থাকবে। অর্থাৎ এই চারটাতেই লোকজন ইচ্ছা করলে প্রচলিত যে মুনাফার সিস্টেম সেটাতেও ঢুকতে পারবে, অথবা শরিয়াহ পদ্ধতির ভেতরেও ঢুকতে পারবে।’

অর্থাৎ গ্রাহকের সামনে দুটি বিকল্প থাকবে। একটি প্রচলিত মুনাফা পদ্ধতি, অন্যটি শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি। কেউ যদি সুদ নিতে আগ্রহী না হন, তিনি শরিয়াহ পদ্ধতি বেছে নিতে পারবেন।

পেনশন কর্তৃপক্ষ বলছে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও স্থানীয় পরামর্শকেরা এই পদ্ধতির কাঠামো, পরিচালন পদ্ধতি, বিনিয়োগ ব্যবস্থা ও কারিগরি বিষয় নির্ধারণে কাজ করছেন। এর আর্থিক স্থায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি দায়-দায়িত্বের বিষয়টিও বিশ্লেষণ করা হবে।

এ ছাড়া শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালুর ক্ষেত্রে আলাদা কোনো শরিয়া বোর্ড গঠন করা হবে কি না, সুকুক বন্ডসহ কোন কোন খাতে বিনিয়োগ করা যাবে—এসব বিষয়ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে জানান শেখ কামরুল হাসান।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের শরিয়া বোর্ড এবং সরকারের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত শরিয়া অথরিটি আছে, তাদের কাছ থেকেই আপাতত পরামর্শ নেওয়া হবে।’

কতটা কার্যকর, চ্যালেঞ্জ যেখানে

সর্বজনীন পেনশনে শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালু হলে এই কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়তে পারে। তবে এর বাস্তবায়ন নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

প্রচলিত পেনশন তহবিল সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের মাধ্যমে নির্দিষ্ট হারে সুদ পায়। কিন্তু শরিয়াহভিত্তিক তহবিল সুদ নিতে পারবে না। ফলে প্রশ্ন হচ্ছে, এই তহবিল কোথায় বিনিয়োগ করা হবে?

অর্থাৎ শুধু নামের সঙ্গে শরিয়াহ যুক্ত করলেই হবে না। গ্রাহককে বিশ্বাস করাতে হবে যে তার টাকা সত্যিই সুদমুক্ত ও হালাল খাতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকের খারাপ অবস্থার কারণে বাংলাদেশে শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকিং নিয়ে যে ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে, সেটিও দূর করা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক মো. আহসান হাবীব বলেন, সর্বজনীন পেনশনে পণ্যের বৈচিত্র্য না আনলে সবাইকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা যাবে না।

তিনি বলেন, ‘দেশে এক শ্রেণির মানুষ সুদভিত্তিক পেনশন স্কিমের বিষয়টি গ্রহণ না করে বরং এটি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন।’

সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিসহ দেশের আর্থিক খাতে গ্রাহকদের ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা মেটাতে পণ্যের বৈচিত্র্য আনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলেও মনে করেন তিনি।

আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি কতটা কার্যকর বা সফল হবে, তা মোটাদাগে তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে।

তাদের মতে, শরিয়াহসম্মত সুকুক বন্ড, ইসলামিক ইক্যুইটি এবং হালাল ব্যবসায় মুদারাবা বা মুশারাকা মডেলে বিনিয়োগের সুযোগ থাকতে হবে। সুকুক বন্ডে সুদের হার নির্ধারিত থাকে না। ইসলামিক ইক্যুইটির ক্ষেত্রে শরিয়াহসম্মত ব্যবসা বা শেয়ারে বিনিয়োগ করা হয়।

তবে বাংলাদেশে সুকুকের বাজার এখনো ছোট। ফলে হালাল বিনিয়োগের পর্যাপ্ত উপকরণ তৈরি করা না গেলে শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতিতে মুনাফা প্রচলিত স্কিমের তুলনায় কম হতে পারে। এতে গ্রাহক নিরুৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গ্রাহকের আস্থা অর্জনে শক্তিশালী ও স্বাধীন শরিয়াহ বোর্ড, শরিয়াহ অডিট এবং স্বচ্ছ প্রতিবেদন জরুরি বলে মনে করেন অধ্যাপক আহসান হাবীব।

ইসলামী ব্যাংকগুলোর সাম্প্রতিক ক্ষতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এর কারণ ব্যাংকিং মডেল নয়, বরং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ।

তিনি বলেন, ‘পলিটিকাল পার্টির সঙ্গে ব্যাংককে ট্যাগ করা হয়েছে, রাজনৈতিকভাবে দখল হয়েছে। ফলে অনেক ইসলামী ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এগুলোর জন্য ব্যাংকিং সিস্টেম দায়ী ছিল না, এক্সটার্নাল ফোর্সেস দায়ী।’

আরো যেসব পরিবর্তন

শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতিকে বিদ্যমান পেনশন ব্যবস্থার বিনিয়োগ কাঠামো, অংশগ্রহণের পরিধি ও সুবিধার ধরন আরো বিস্তৃত করার চলমান উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) শেখ কামরুল হাসান বলেন, আইনগত কাঠামো চূড়ান্ত করে জাতীয় সংসদে পাঠানো এবং পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার ওপরই এর বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপ নির্ভর করবে।

তার মতে, সঠিক বিনিয়োগ নীতি, স্বচ্ছ শরিয়াহ ব্যবস্থাপনা ও প্রচারণা নিশ্চিত করা গেলে সুদ এড়িয়ে চলা বড় একটি জনগোষ্ঠীকে সর্বজনীন পেনশনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতির পাশাপাশি পেনশন কর্তৃপক্ষ বিদ্যমান ব্যবস্থায় আরো কিছু সুবিধা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর লক্ষ্য, মানুষের আগ্রহ বাড়ানো।

আগের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো পেনশনার মারা গেলে তার স্বামী বা স্ত্রী ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন পেতেন। এখন তা বাড়িয়ে ৮০ বছর করা হয়েছে। পেনশনার নিজে জীবদ্দশায় আজীবন পেনশন পাবেন।

পেনশন স্কিমে মুনাফার হারও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

সরকারি মালিকানাধীন যেসব প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির কর্মীরা প্রচলিত সরকারি পেনশন পান না, তাদের ‘প্রগতি’ স্কিমের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রবাস স্কিমে গ্রাহক বাড়াতে বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীদের ‘প্রবাস’ স্কিম সম্পর্কে অবহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরেই যাতে নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া যায়, সে উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে নিবন্ধনে আগে ১৫ টাকা প্রণোদনা দেওয়া হতো। এখন তা বাড়িয়ে ২৫ টাকা করা হয়েছে।

এ ছাড়া পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করা, পেনশন তহবিল থেকে ঋণ দেওয়া এবং স্বাস্থ্যবিমা যুক্ত করা যায় কি না—এসব বিষয়ও পর্যালোচনা করছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ।

  • সর্বশেষ