যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকিই আংশিকভাবে সত্যি হলো। গতকাল শুক্রবার ইরানে বিমানবন্দর, ট্রেন স্টেশন ও একাধিক সেতু লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের চালানো সর্বশেষ হামলায় নিহত হয়েছেন অন্তত আটজন, আহত হয়েছেন ২০ জনেরও বেশি। তেহরানও পাল্টা জবাব দিয়েছে কুয়েতে এক বিদ্যুৎ ও পানি পরিশোধন কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে। ইরানের আক্রমণের কবলে পড়েছে ওমান, কাতার, বাহরাইন ও সিরিয়াও।
এদিকে, সাম্প্রতিক সংঘাতের জেরে আগেই যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে হরমুজ প্রণালিতে। যুক্তরাষ্ট্রের মেরিনরা সম্প্রতি সেখানে এক ট্যাঙ্কারের দখল নেয় এবং ওই প্রণালিতে আরেকটি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে।
গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন ও তেহরানের যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ে। ওই সময় থেকেই দুপক্ষ একে অন্যকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে। পরিস্থিতি এমন অবস্থায় গিয়ে ঠেকেছে, আবারও একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে দুই দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে স্থল অভিযান চালানোর পরিকল্পনা থেকে এখনও সরে আসেননি। পাশাপাশি তিনি বড় মাপে হামলা চালানোর হুমকিও দিয়ে যাচ্ছেন।
পুরো বিষয়টি আরব দেশগুলোতে মার্কিন অবকাঠামোতে হামলার জন্য উস্কে দিচ্ছে ইরানকে। পরিস্থিতি নিয়ে এরই মধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে একাধিক দেশ ও মধ্যস্থতাকারীরা। তারা দুপক্ষকে সংলাপে ফেরার আহ্বানও জানিয়েছে।
হামলা-পাল্টা হামলা: ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে অন্তত পাঁচটি সেতুতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী। দক্ষিণের বন্দর খামিরে সেতুতে আক্রমণে অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া এক ট্রেন স্টেশনেও হামলা চালানো হয়েছে। আঘাত পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী ইরানি প্রদেশ ইরানশাহারের এক বিমানবন্দরেও। বন্দর আব্বাসে পৃথক এক হামলায় এক নারী নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছে তাঁর শিশুসন্তান।
এসবের জবাবে ইরান বাহরাইন, কাতার ও কুয়েতে হামলা চালিয়েছে। এসব উপসাগরীয় দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি রয়েছে। কুয়েতের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের দেশের একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ও পানি পরিশোধন অবকাঠামোতে হামলা হয়েছে। এসব হামলার জেরে সেখানে আগুন ধরে যাওয়া ও বিদ্যুৎ পরিষেবা বিঘ্নিত হওয়ার কথাও জানিয়েছে তারা।
কুয়েতের বিদ্যুৎ, পানি ও নবায়নযোগ্য শক্তিবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ফায়ার সার্ভিস ওই আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছে। কারিগরি টিম ক্ষয়ক্ষতি খতিয়ে দেখছে। তারা চেষ্টা করছে দ্রুত আবার সেবা শুরু করার।
ইরান জানিয়েছে, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিতে এবং ওমানে যুক্তরাষ্ট্রের রাডার স্টেশনে হামলা চালিয়েছে তারা। কাতারের রাজধানী দোহায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এক শিশু শার্পনেলের আঘাতে আহত হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবর বলছে, যুদ্ধে প্রথমবারের মতো সিরিয়ায়ও আঘাত হেনেছে ইরান। দেশটির তানফে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর ঘাঁটিতে হামলা চালানোর কথা জানায় তারা। তবে সিরিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়, চলতি বছরের শুরুর দিকেই ওই ঘাঁটি থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী। সিরিয়ার সামরিক বাহিনীর এক সূত্র জানায়, ঘাঁটির কাছে আঘাত হেনেছে ইরান। এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
বেড়েছে তেলের দাম: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও ২ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৮৬ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। এক মাস আগে যুদ্ধ অবসানের সমঝোতায় স্বাক্ষরের পর এবারই প্রথম এত দাম বাড়তে দেখা গেল।
ইরান আগেই হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করেছে। ওয়াশিংটনও ওই প্রণালিতে ও ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ দিয়েছে। কোনো নৌযান ওই পথে চলাচল করছে না।
গত সপ্তাহজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অন্যকে লক্ষ্য করে হামলা চালালেও তা বিস্তৃত পরিসরে ছড়ায়নি। এখন পর্যন্ত একে অন্যের অবকাঠামো লক্ষ্য করেই আঘাত হানছে দুপক্ষ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হুমকি দিয়েছেন বড় পরিসরে ইরানে আঘাত হানার। ইরানও জানিয়েছে, তেমনটি হলে তারাও মধ্যপ্রাচ্যে বেসামরিক অবকাঠামোতে আঘাত হানবে।
এদিকে, জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চাপের মুখে ফেলে দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বড় পরিসরে বিজয়ী হচ্ছে এবং মার্কিনিরা শিগগিরই এর সুফল ভোগ করবেন।