শিরোনাম
◈ নারী ত্রিদেশীয় সিরিজের বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল ঘোষণা ◈ ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটের মধ্যেও ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ২.৯%: OECD ◈ পণ্য খালাসের সময় ও ব্যয় কমাতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার তাগিদ বাণিজ্যমন্ত্রীর ◈ আগামী শুক্র ও শনিবার ব্যাংক খোলা ◈ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ৫ দফা প্রস্তাব: জাতিসংঘের সাইডলাইন বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর জোরালো আহ্বান ◈ হুতিদের হামলা ঠেকাতে সৌদির অনুরোধে সাড়া নেই, ট্রাম্প-সালমান সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন ◈ গেটস ফাউন্ডেশনের সিইওর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক, স্বাস্থ্যখাতে এআই ব্যবহারের পরিকল্পনা ◈ ১০ বছরে জ্বালানি তেল থেকে সরকারকে ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে বিপিসি ◈ লিভারপুলের অ্যানফিল্ড গুগল রেটিংয়ে এগিয়ে ◈ আফগান লিগে নাম লেখালেন তাসকিন

প্রকাশিত : ১৮ জুলাই, ২০২৬, ০১:৪৮ রাত
আপডেট : ২২ আগস্ট, ২০২৬, ০১:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ইরানে ট্রাম্পের ‘মহাপরিকল্পনা’ কি স্থল অভিযানের প্রস্তুতি?

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। টানা ষষ্ঠ রাতের মতো মার্কিন বাহিনী হামলা চালানোর পর তেহরান অভিযোগ করেছে, ওয়াশিংটন পরিকল্পিতভাবে দেশটির বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।

ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, সর্বশেষ হামলায় একটি রেলওয়ে স্টেশন এবং আবাসিক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে সেতু, পানি শোধনাগার, খাদ্যগুদামসহ (সাইলো) অন্যান্য বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের জ্বালানি খাতকে লক্ষ্যবস্তু করার ইঙ্গিত দিয়ে বলেছিলেন, ‘জৈবজ্বালানি বা শক্তির উৎসগুলোকে আমি শেষের জন্য জমিয়ে রাখছি।’ ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পরপরই হামলার তীব্রতা বৃদ্ধি পেল।

advertisement

উত্তেজনা বৃদ্ধির মুখে ইরানের সামরিক বাহিনী শুক্রবার জানিয়েছে, তারা বাহরাইনে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে কুয়েত জানিয়েছে, তারা তাদের ভূখণ্ডে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার জবাব দিচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চলতি সপ্তাহে বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং জর্ডানজুড়ে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানজুড়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার মাধ্যমে এই যুদ্ধ শুরু হয়। এর এক মাস পর, গত জুন মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্প্রসারণ এবং আলোচনা শুরুর লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। কিন্তু সেই চুক্তি স্বাক্ষরের মাস খানেকের মাথায় আবারও পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হলো। দুই দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে।

advertisement

এদিকে স্ট্রেইট অব হরমুজ বা হরমুজ প্রণালী নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। ওমান একটি নতুন নৌ-পরিবহন করিডোর ঘোষণা করার পর ইরান জানিয়েছে, তারা এই কৌশলগত জলপথে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেবে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় চলাচলকারী জাহাজের ওপর নৌ-অবরোধ পুনর্বহাল করেছে।

বেসামরিক অবকাঠামোতে মার্কিন হামলার তীব্রতা বাড়ায় ওয়াশিংটনের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এই হামলা কি ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করে তাদের আলোচনার টেবিলে বসাতে, নাকি স্থল অভিযানের পথ সুগম করতে যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস করা হচ্ছে- তা নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ। একই সঙ্গে এই হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন কি না এবং এটি কোনো সর্বাত্মক যুদ্ধের রূপ নেবে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

advertisement

দক্ষিণ ইরানের হরমোজগান প্রদেশ এবং এর আশপাশের উপকূলীয় অঞ্চলে মার্কিন হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। আহভাজ, কেশম, বুশেহর, দশ্তি, বোস্তান, সিরিক এবং বন্দর-এ লেঙ্গেহে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটেছে। ইরানের দাবি, পূর্ববর্তী হামলাগুলোর তুলনায় এবার অবকাঠামোগত ক্ষতি অনেক বেশি।

হরমুজ প্রণালীর তীরে অবস্থিত ইরানের প্রধান নৌঘাঁটি ‘বন্দর আব্বাস’ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানি গণমাধ্যমের তথ্যমতে, শহরের কাহুরেস্তান সেতু ও একটি আবাসিক এলাকায় মার্কিন হামলায় ২ জন নিহত এবং ৮ জন আহত হয়েছেন। তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, শহরের একটি যোগাযোগ টাওয়ার ধ্বংস হওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। হরমোজগান প্রদেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বন্দর আব্বাসের সঙ্গে সংযোগকারী প্রধান সড়কগুলোর ৬টি সেতু ধ্বংস করা হয়েছে।

এ ছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের ইরানশহর বিমানবন্দর এবং বুধবার রাতে সেমনান বেসামরিক বিমানবন্দরের মূল ভবন মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পশ্চিম ইলাম প্রদেশের দেহলোরানে একটি বোতলজাত পানির কারখানা এবং মারকাজি প্রদেশের খন্দাবের ভারী পানি উৎপাদন কেন্দ্রের আশপাশেও হামলা হয়েছে। আহভাজের বাঘাই স্পেশালাইজড হাসপাতালে হামলার পর সেখান থেকে ২০০ রোগীকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে হাসপাতালে কেউ হতাহত হয়নি।

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের শুরুর দিন মিনাব শহরের 'শাজারেহ তাইয়্যেবা' বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জোড়া ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৫০ জন নিহত হয়েছিল, যাদের অধিকাংশ ছিল শিশু ও শিক্ষক। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক তদন্তেও এই হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করা হয়।

এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি একে ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলে অভিহিত করেছেন। টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘বেসামরিক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশন এবং জাতিসংঘ সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন।’

তবে হাডসন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো ও মার্কিন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল জোয়েল রেবার্ন আল জাজিরাকে বলেন, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই স্থাপনাগুলোকে ‘দ্বৈত-ব্যবহার্য’ (যা সামরিক ও বেসামরিক উভয় কাজে লাগে) হিসেবে চিহ্নিত করে হামলার অনুমতি দিয়ে থাকতে পারে।

ইরানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ জুন পর্যন্ত যুদ্ধের প্রথম পর্বে ৩,৪৬৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। আর গত ২২ জুন সুইজারল্যান্ডে দুই পক্ষের বৈঠকের পর যুদ্ধ পুনরায় শুরু হলে আরও ৩৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৪০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বন্দর আব্বাস ইরানের অর্থনীতি ও সামরিক বাহিনীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটির ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই হরমুজ প্রণালী দিয়েই রপ্তানি হতো। কিংগস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা বিষয়ের শিক্ষক মার্ক হিলবোর্ন বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইরানের সামরিক রসদ সরবরাহ বন্ধ করতে এবং তাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে এই সেতু ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর হামলা চালাচ্ছে। এর মধ্যে উত্তর-পূর্ব ইরানের একটি সেতুও রয়েছে, যা চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড' প্রকল্পের বাণিজ্যিক করিডোরের অংশ।

ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাইমন মাবন সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য পরিস্থিতি আরও অন্ধকারের দিকে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে সামরিক লক্ষ্যবস্তু ছাড়িয়ে সাধারণ ইরানিদের ওপর আরও বড় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। তবে বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে ইরানের জনগণকে সরকারের মুখোমুখি দাঁড় করানো যাবে না, বরং এতে ওয়াশিংটনের প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়বে।

সূত্র: আলজাজিরা

 

  • সর্বশেষ