এল আর বাদল: হরমুজ প্রণালিতে একটি কার্গো জাহাজে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে একটি "বোকামিপূর্ণ যুদ্ধ লঙ্ঘন" করার অভিযোগ তুলেছিলেন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তারা শুক্রবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং উপকূলীয় রাডার অবস্থানে আঘাত হেনেছে।
তারা বলেছে, বৃহস্পতিবার একটি কার্গো জাহাজে ড্রোন হামলার জবাবে এই হামলা চালানো হয়েছে। এই ঘটনায় ওই অঞ্চলে আটকে পড়া হাজার হাজার নাবিককে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত হয়ে গেছে। সূত্র: বিবিসিবাংলা
তেহরান বলেছে, গুরুত্বপূর্ণ এই উপসাগরীয় নৌপথ দিয়ে পাড়ি দেওয়ার সময় জাহাজটি অনুমোদনহীন পথ ব্যবহার করছিল, তাই সেটিতে হামলা করা হয়। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম এই হামলাকে আগের দিনের ড্রোন হামলার "শক্তিশালী জবাব" হিসেবে বর্ণনা করেছে।
এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, "বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে ইরানি বাহিনীর অযৌক্তিক আগ্রাসন স্পষ্টভাবে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে।এছাড়া, ইরানের বিপজ্জনক আচরণ এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে চলাচলের স্বাধীনতাকে খর্ব করেছে, যেখানে ক্রমেই বাণিজ্যিক চলাচল বাড়ছে।
সেন্টকম বলেছে, প্রণালি অতিক্রমকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে "নিরাপদ যাতায়াতের সমন্বয় ও সহায়তা" প্রদান অব্যাহত রাখবে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এই ঘটনার জন্য "চুক্তিভঙ্গকারী মার্কিন শাসনব্যবস্থার" ওপর দোষ চাপিয়েছে।
এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, "হরমুজ প্রণালিতে একটি জাহাজ অনুমোদনহীন পথে চলাচল করার," প্রেক্ষাপট তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপকূলে বিমান হামলা চালিয়েছে।
আইআরজিসি জানিয়েছে, তাদের নৌবাহিনী মার্কিন হামলার পাল্টা জবাবে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থানগুলোতে আঘাত হেনেছে, তবে এর বিস্তারিত দেয়নি।
এ বিষয়ে মতামতের জন্য বিবিসি পেন্টাগনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আইআরজিসি আরও বলেছে, "এই আগ্রাসন পুনরাবৃত্তি হলে আমাদের প্রতিক্রিয়া এর চেয়েও বিস্তৃত হবে।" ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরু হওয়ার পর তেহরান কার্যত প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়।
তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক তেলের দাম বেড়ে যায় এবং সারসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হয়।
১৭ই জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের আওতায় বৈরিতা বন্ধে সম্মত হয়, যেখানে ইরানকে ৬০ দিনের জন্য "বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাতে" বলা হয়েছিল। এজন্য কোনো ধরনের ফি না নেওয়ার কথা উল্লেখ ছিল।
মার্কিন পাল্টা হামলার পর এক্সে পোস্ট করে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, ইরানের যদি "সমঝোতা স্মারক কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে এ নিয়ে কোনো মতবিরোধ থাকে, তারা ফোন তুলতে পারে। তিনি যোগ করেন, "কিন্তু সহিংসতার জবাব সহিংসতা দিয়েই দেওয়া হবে।"
তবে ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক মাধ্যমে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র "আবারও আলোচনার মাঝখানে ইরানে হামলা চালিয়েছে। তিনি আরও লেখেন, "যুদ্ধবিরতির এই বেপরোয়া লঙ্ঘন সবসময়কার মতোই তাদের পশ্চাদপসরণ ও অনুতাপে নিয়ে যাবে। একে অপরকে দোষারোপ করার খেলা আর কাজ করছে না।
শুক্রবার বিকেলে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময়, ড্রোন হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র কী করতে পারে বা যুদ্ধবিরতি এখনো বহাল আছে কিনা এ বিষয়ে প্রশ্ন এড়িয়ে যান ট্রাম্প। তিনি বলেন, আপনারা জানতে পারবেন। তারা গতকাল গুলি চালিয়েছে, এটা আমার ভালো লাগেনি। তাদের এভাবে করা উচিত নয়। ইরান কেন এমন অভিযান চালাতে পারে এ প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প কেবল বলেন, "তারা একটু ভিন্ন ধাঁচের।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্প ও অন্য মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ভালোই এগোচ্ছিল এবং তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর কোনো শুল্ক আরোপের প্রস্তাব থেকে সরে এসেছে।
বুধবার ট্রাম্প ট্রুথ সোশালে লেখেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে যে "কোনো টোল, কোনো বীমা খরচ এবং অন্য কোনো ধরনের চার্জ আরোপ বা আদায় করা হবে না।"
তিনি যোগ করেন, "এটি মিথ্যা তথ্য হলে আলোচনা সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাবে।"
প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী তেলবাহী জাহাজের কাছ থেকে ফি নেওয়ার খবরের নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, এবং অনেকেই মনে করেন যে এ ধরনের শুল্ক আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন লঙ্ঘন করে।
মঙ্গলবার ইরান ও ওমানের কর্মকর্তারা ওমানের রাজধানী মাসকটে "নৌচলাচলের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা" নিয়ে আলোচনা করেন, যেখানে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি বলেন, উভয় দেশই "কোনো ফি ছাড়া নিরাপদ যাতায়াত" নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ ইরানি রাষ্ট্র সমর্থিত সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, "সবার জানা উচিত যে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আর কখনোই যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যাবে না।"
বৃহস্পতিবার যে কার্গো জাহাজটিতে হামলা হয়, সেটির নাম এভার লাভলি, যা সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী একটি জাহাজ। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিওর তথ্য অনুযায়ী, ওমানের দাহিত বন্দরের দক্ষিণ-পূর্বে ৭.৫ নটিক্যাল মাইল দূরে জাহাজটিতে আঘাত হানে।
জাহাজটির মালিক এভারগ্রিন জানিয়েছে, ইউকেএমটিওর সুপারিশকৃত পথ অনুসরণ করেই প্রণালি অতিক্রম করছিল এভার লাভলি, যখন সেটিতে আঘাত করা হয়। তারা যোগ করে, "সমস্ত নাবিক নিরাপদে আছেন, জাহাজ ও পণ্যও অক্ষত রয়েছে।
এর ফলে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে আটকে পড়া ১১ হাজারের বেশি নাবিককে সরিয়ে নেওয়ার যে পরিকল্পনা নিয়েছিল, সেটি স্থগিত করেছে।