মাছ পুষ্টিকর খাবার হিসেবে সুপরিচিত। এতে রয়েছে উচ্চমানের প্রোটিন, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন এ, ডি ও বি১২, পাশাপাশি আয়োডিন, ক্যালসিয়ামসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় খনিজ। নিয়মিত মাছ খাওয়া হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে, মস্তিষ্কের কার্যকারিতা উন্নত করতে এবং শরীরের সামগ্রিক পুষ্টি নিশ্চিত করতে সহায়ক।
তবে সব মাছ সব পরিস্থিতিতে সমান নিরাপদ নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাছের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেটি কীভাবে চাষ করা হয়েছে এবং কী পরিবেশে বড় হয়েছে। মাছ খাওয়ার যেমন সুফল আছে, তেমনি কিছু মাছ শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। যেমন, বাজারে প্রায়শই কম দামে দেখা মেলে তেলাপিয়া মাছের। তবে সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, কৃত্রিম উপায়ে চাষ করা তেলাপিয়া মাছ অনেক সময় টক্সিন বা বিষাক্ত উপাদানে ভরপুর থাকে, যা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এমনকি এটি হাঁপানি ও অ্যালার্জিরও অন্যতম কারণ হতে পারে।
তাই বাজারে যত কম দামেই পাওয়া যাক না কেন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চাষ করা তেলাপিয়া মাছ থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। মূলত শেওলা, উচ্ছিষ্ট খাবার কিংবা দূষিত বর্জ্য খেয়ে দ্রুত বেড়ে ওঠে এই মাছ।
‘জার্নাল অফ ইমার্জিং টেকনোলজিস অ্যান্ড ইনোভেটিভ রিসার্চ’-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দূষিত জলাশয়ে চাষ করা তেলাপিয়া মাছের শরীরে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, সিসা ও ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতু জমা হতে পারে। এর মধ্যে কিছু ধাতুর পরিমাণ মানুষের খাওয়ার জন্য নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়েও অনেক বেশি। এসব উপাদান দীর্ঘদিন ধরে শরীরে প্রবেশ করলে কিডনি, লিভার ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতির পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের গবেষকদের একাংশের দাবি, অস্বাস্থ্যকর খামারের তেলাপিয়া মাছ খেলে ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, এশিয়া থেকে আমদানি করা কিছু তেলাপিয়া মাছের শরীরে মারাত্মক বিষাক্ত উপাদান মিলেছে।
গবেষকদের দাবি, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মাছ চাষের সময় অনেক ক্ষেত্রে হাঁস, শুকর বা মুরগির বর্জ্য ও দেহাবশেষ খাবার হিসেবে দেওয়া হয়, যা মাছটিকে দ্রুত বড় করলেও বিষাক্ত করে তোলে। বিজ্ঞানীরা জানান, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তেলাপিয়া চাষের সময় অত্যধিক পরিমাণে অ্যান্টিবায়োটিক, কীটনাশক ও রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। এই অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে রোগজীবাণু শরীরে বয়ে বেড়ায় তেলাপিয়া। আর সেই মাছ খেলে মানুষের হৃদরোগ, পক্ষাঘাত (প্যারালাইসিস) ও হাঁপানির সমস্যা হতে পারে, এমনকি বেড়ে যায় হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিও।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন, উৎপাদিত তেলাপিয়া মাছে প্রাকৃতিক প্রোটিনের মাত্রা তুলনামূলক কম থাকে। উল্টো এদের শরীরে ‘ডিবুটিলিঙ্ক’ নামের এক প্রকার রাসায়নিক জমা হতে পারে, যা থেকে হাঁপানি ও অ্যালার্জি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। উল্লেখ্য, প্লাস্টিকের বিভিন্ন জিনিস তৈরির ক্ষেত্রেও এই ডিবুটিলিঙ্ক ব্যবহার করা হয়।
অপরিচ্ছন্ন খামারে উৎপাদিত তেলাপিয়া মাছের মাধ্যমে স্ট্রেপ্টোকক্কাস ও কলমনারিসের মতো ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের ঝুঁকিও থাকতে পারে। এছাড়া দীর্ঘদিন দূষিত পরিবেশে থাকা মাছের শরীরে ডাইঅক্সিনের মতো পরিবেশ দূষণজনিত রাসায়নিক জমা হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। খামারের তেলাপিয়ার শরীরে এই ডাইঅক্সিনের মাত্রা সাধারণ মাছের চেয়ে প্রায় ১১ গুণ বেশি পাওয়া গেছে।
২০০৮ সালের একটি গবেষণা পত্র অনুযায়ী, তেলাপিয়া মাছে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-সিক্স ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। অতিরিক্ত ওমেগা-সিক্স শরীরে প্রবেশ করলে হাঁপানি, বাত ও প্রদাহজনিত অসুখ বাড়তে পারে। এটি রক্তচাপ বাড়িয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি করে, যার ফলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের আশঙ্কা দেখা দেয়।
তবে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে মনে রাখা জরুরি—সব তেলাপিয়া মাছ ক্ষতিকর নয়। নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে চাষ করা তেলাপিয়া পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবেই বিবেচিত হয়। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোও তেলাপিয়া খাওয়ার বিরুদ্ধে কোনো সাধারণ নিষেধাজ্ঞা দেয়নি।
নিরাপদে তেলাপিয়া খাওয়ার জন্য যা করবেন
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা তেলাপিয়া মাছে নয় বরং অনিয়ন্ত্রিত ও অস্বাস্থ্যকর চাষপদ্ধতিতে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে নিরাপদ উৎস থেকে মাছ কিনে সঠিকভাবে রান্না করে খাওয়াই সবচেয়ে ভালো উপায়।
সূত্র : নিউজ বাংলা১৮