জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে অতীতের সম্পর্ক নিয়ে সাক্ষা দিয়েছেন বিল গেটস। এ সময় তিনি তিনজন নারীর সঙ্গে নিজের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থাকার কথা স্বীকার করেছেন। এমনকি ওই তিন নারী নামও প্রকাশ করেছেন। এ মাসের শুরুতে হাউস ওভারসাইট কমিটিতে দেয়া সাক্ষ্যে এসব কথা বলেছেন মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। তবে তার বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়নি। গেটস বলেছেন, তিনি কোনো অবৈধ কাজ করেননি এবং দণ্ডিত যৌন অপরাধী এপস্টেইনের সঙ্গে অতীতের সম্পর্কের জন্য বারবার ক্ষমা চেয়েছেন। এ খবর দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত পিপল ম্যাগাজিন।
রুদ্ধদ্বার বৈঠকে হাউস ওভারসাইট কমিটির সামনে দেয়া সাক্ষ্যে বিল গেটস স্বীকার করেন যে, সাবেক স্ত্রী মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস-এর সঙ্গে বিবাহিত সম্পর্কে আবদ্ধ থাকাকালে তিনজন নারীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। ১০ জুন বুধবার ক্যাপিটল হিলে কমিটির সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মাইক্রোসফটের এই সহ-প্রতিষ্ঠাতা। দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনকে ঘিরে চলমান তদন্তের অংশ হিসেবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
৭০ বছর বয়সী গেটস স্বেচ্ছায় প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের সামনে উপস্থিত হয়ে এপস্টেইনের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেন। ২০১১ সালে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যবিষয়ক দাতব্য কার্যক্রমের জন্য সমর্থন খোঁজার সময় এপস্টেইনের সঙ্গে তার যোগাযোগ শুরু হয় এবং ২০১৪ সালের শেষ দিকে তা শেষ হয়ে যায়। হাউস ওভারসাইট কমিটি প্রকাশিত ১৩৮ পৃষ্ঠার সাক্ষ্য বিষয়ক নথি অনুযায়ী, উদ্বোধনী বক্তব্যে গেটস বলেন, এরপর আমি জানতে পারি যে এপস্টেইন আমার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে সংবেদনশীল তথ্য জেনে গিয়েছিলেন। এর মধ্যে ছিল আমি আমার বিবাহিত জীবনে বিশ্বস্ত ছিলাম না। এসব সম্পর্কের সঙ্গে এপস্টেইনের সঙ্গে আমার যোগাযোগের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তবে বিষয়টি আমার পরিবারের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক ছিল।
গেটস এ বছরের শুরুতে স্বীকার করেন যে বিবাহিত থাকাকালে দুই রুশ নারীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। তিনি বলেন যে, এপস্টেইন তার অবিশ্বস্ততার তথ্য এবং মিথ্যা অভিযোগ ব্যবহার করে তাকে আবার যোগাযোগ স্থাপনে চাপ দেয়ার চেষ্টা করেন। গেটস বলেন, তিনি (এপস্টেইন) এতে সফল হননি। তবে এটি দেখিয়ে দেয় যে, তিনি কীভাবে আমার সঙ্গে তার যোগাযোগকে নিজের উদ্দেশ্য পূরণে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছিলেন। শুরুতেই আমার এপস্টেইনের সঙ্গে দেখা করা উচিত হয়নি।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চলা সাক্ষ্যে গেটস জানান, তিনি পূর্বে অনলাইনে নিজের প্রস্তুত করা উদ্বোধনী বক্তব্যের কপিও প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেন, গেটস ফাউন্ডেশন-এর একজন দীর্ঘদিনের কর্মী তাকে এপস্টেইনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। পরে ওই কর্মী প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে চলে যান। গেটসের ধারণা, ওই কর্মীই এপস্টেইনের কাছে তার সম্পর্কগুলোর তথ্য পৌঁছে দিয়েছিলেন। গেটস ওই নারীদের পরিচয় প্রকাশ করে বলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন মিলা আন্তোনোভা। তিনি একজন ব্রিজ খেলোয়াড় এবং ২০২৩ সালে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে তার নাম উঠে এসেছিল। অন্য দুই নারী হলেন কারিমা নিগমাতুলিনা। তিনি একজন পারমাণবিক বিজ্ঞানী এবং অ্যালিস জ্যাকবস নেসেলরডট। তিনি একজন চিকিৎসক। তার সঙ্গে ২০১০ সালের আগে একটি সম্মেলনে তার পরিচয় হয়।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আইন মন্ত্রণালয় প্রকাশিত নথিতে এপস্টেইনের নিজের কাছে পাঠানো কয়েক বছর আগের ই-মেইল সামনে আসে। সেখানে দাবি করা হয়, রুশ নারীদের কাছ থেকে গেটস যৌনবাহিত সংক্রমণে আক্রান্ত হন এবং তৎকালীন স্ত্রী মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটসের কাছ থেকে বিষয়টি গোপন রাখতে এপস্টেইনের সহায়তা চান। এপস্টেইনের এসব দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে বারবার অস্বীকার করেছেন গেটস। তবে সাক্ষ্যে তিনি বলেন, কোনো একসময় তিনি হয়তো এমন সংক্রমণের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেছিলেন, যা পরে ‘মিথ্যায় রূপ নেয় যে আমি সত্যিই যৌনবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছিলাম।’
তিনি আরও বলেন, তিনি (এপস্টেইন) কখনও আমাকে ব্ল্যাকমেইল করেননি। কিন্তু এসব ই-মেইল দেখে মনে হয়, তিনি আমাকে ব্ল্যাকমেইল করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছিলেন। গেটস জোর দিয়ে বলেন, আমি কখনও দেখিনি কিংবা কোনো ইঙ্গিত পাইনি যে এপস্টেইন চলমান অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। তিনি আরও জানান, তিনি কখনও এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপ, র্যাঞ্চ বা ফ্লোরিডার বাড়িতে যাননি। গেটস বলেন, আমি কখনও কাউকে শিকার বানাইনি।
কমিটির সদস্যদের প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, তিনি কখনও এপস্টেইনের ভুক্তভোগীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেননি। তবে কোনো কোনো সময়ে তাদের উপস্থিতিতে থাকতে পারেন। গেটস অতীতে এপস্টেইনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একাধিকবার ক্ষমা চেয়েছেন। চলতি বছরের শুরুতে গেটস ফাউন্ডেশন-এর এক টাউন হল বৈঠকে, যেখানে তিনি দুটি সম্পর্কের বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন, সেখানে কর্মীদের কাছেও এপস্টেইনের সঙ্গে তার পূর্ববর্তী সম্পর্কের জন্য ক্ষমা চান বলে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল পর্যালোচনা করা একটি অডিও রেকর্ডিংয়ে দেখা গেছে।
এপ্রিল মাসে গেটস ফাউন্ডেশন ঘোষণা করে যে, এপস্টেইনের সঙ্গে অতীতের সম্পৃক্ততা এবং নতুন দাতব্য অংশীদারিত্ব যাচাইয়ের বর্তমান নীতিমালা মূল্যায়নের জন্য একটি স্বাধীন পর্যালোচনা কমিশন গঠন করা হয়েছে। এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য গ্রীষ্মকালে প্রকাশ করা হতে পারে।
গেটসের সাক্ষ্যের পর তার এক মুখপাত্র বলেন, কমিটির সামনে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ পেয়ে তিনি কৃতজ্ঞ। মুখপাত্র বলেন, কমিটির অনেক সদস্য যেমন উল্লেখ করেছেন, প্রায় ছয় ঘণ্টার সাক্ষাৎকারে তাকে করা প্রতিটি প্রশ্নেরই তিনি উত্তর দিয়েছেন। এখন সম্পূর্ণ ও সম্পাদনাহীন প্রতিলিপি প্রকাশিত হয়েছে, ফলে সবাই নিজে বিষয়গুলো পর্যালোচনা করতে পারবেন। তিনি আরও বলেন, এই পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে মিস্টার গেটস যেমন বলেছেন, তিনি সংশ্লিষ্ট সব নথি প্রকাশের পক্ষে এবং আশা করেন যে ওভারসাইট কমিটির তদন্ত ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। সূত্র: মানবজিমন